দেশের প্রত্যেক জেলায় আলাদাভাবে শিশু আদালত প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ: বিচারপতি ইমান আলী

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২২ জুলাই ২০১৭, শনিবার: শিশু আইন ২০১৩- বাস্তবায়ন বিষয়ে বিভাগীয় পরামর্শ সভা আজ ২২ জুলাই ২০১৭ ইং শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। সুপ্রিম কোর্ট স্পেশাল কমিটি ফর চাইন্ড রাইটস (এসসিএসসিসিআর), বিভাগীয় কমিশনার অফিস ও ইউনিসেফ বাংলাদেশ যৌথভাবে এ পরামর্শ সভার আয়োজন করে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. রুহুল আমীনের সভাপতিত্বে ও বিভাগীয় উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত শিশু আইন ২০১৩ বিষয়ক বিভাগীয় পরামর্শ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন এসসিএসসিসিআর-এর চেয়ারম্যান সুপ্রিম কোর্ট আপীল বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী। বিশেষ অতিথি ছিলেন এসসিএসসিসিআর-এর সদস্য হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ, জেলা ও দায়রা জজ মো. হেলাল চৌধুরী, মহানগর দায়রা জজ মো. শাহেনুর। বক্তব্য রাখেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি কুসুম দেওয়ান, সিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশন) সালেহ মোহাম্মদ তানভীন, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. জিল্লুর রহমান চৌধুরী। সভায় মূল সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন বিভাগীয় পরিচালক (স্থানীয় সরকার) দীপক চক্রবর্ত্তী (অতিরিক্ত সচিব)। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের ফিল্ড প্রধান মাধুরী ব্যানার্জী। শিশু আইন-২০১৩, বিষয়ে প্রতিবেদন পেশ করেন ইউনিসেফ’র চাইল্ড প্রোটেকশন স্পেশালিষ্ট শাবনাজ জাহেরীন ও চাইল্ড প্রোটেকশন অফিসার শায়লা পারভীন লুনা। মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকাস্থ সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ইনস্টিটিউশন-২) এম.এম মাহমুদুল্লাহ। বিভাগীয় পরিচালক (স্থানীয় সরকার) দীপক চক্রবর্ত্তীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত শিশু আইন বিষয়ক উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) একিউএম নাছির উদ্দিন, চট্টগ্রাম চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুন্সী মো. মশিয়ার রহমান, রাঙামাটির সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ কাউছার, কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মো. শফিকুল ইসলাম, বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বনিক, চট্টগ্রাম অতিরিক্ত জেলা জজ মো. সিরাজুদ্দৌলা কুতুবী, কক্সবাজার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ওসমান গনি, খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশ সুপার আলী আহমেদ, বান্দরবান জেলা পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায়, চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মমিনুর রশিদ, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ইকবাল কবির চৌধুরী, আইন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব তৈয়বুল হাসান, সমাজসেবা অধিদপ্তরাধীন প্রতিবন্ধী প্রতিষ্ঠানের উপ-পরিচালক মো. শহীদুল ইসলাম, কক্সবাজার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পিপি এডভোকেট আইয়ুব খান, প্রবেশন অফিসার পারুমা বেগম, সমাজ সেবা কর্মকর্তা হাসান মাসুদ, রাঙামাটি কোতোয়ালী থানার এসআই নির্মল বোস প্রমুখ। সভায় চট্টগ্রাম বিভাগের অধীন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার বিচারকগণ, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার, সিনিয়র জেল সুপার, সমাজসেবা কর্মকর্তা ও আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি ইমান আলী বলেন, দেশে কোন শিশু ক্রিমিনাল হিসেবে জন্ম গ্রহণ করে না। নিজের শিশুর যা চাহিদা অন্যের শিশুরও তা চাহিদা থাকতে পারে। তাদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। বস্তি এলাকা ও ছিন্ন মূলসহ কোন কোন এলাকায় পিতা-মাতার অসুস্থতা এবং পরিবারের অভাব অনটনের কারণে একটি শিশু চুরি করতে বাধ্য হয়। তাই বলে তাকে ক্রিমিনাল বলা যাবে না। শিশুরা যেভাবে বেড়ে উঠতে চাই ঠিক সেভাবেই সুযোগ করে দিতে হবে। এখানে সকল শিশুর সমান অধিকার রয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরে শিশুদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গেছে। কথিত বড় ভাইয়েরা (সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী) টাকার বিনিময়ে অসহায় শিশুদের দিয়ে ব্যাগে করে অস্ত্র ও মাদক সরবরাহের কাজে ব্যবহার করাচ্ছে। ব্যাগে কি আছে তা এসব শিশুরা জানে না। পেটের তাগিদে বড় ভাইদের কথায় টাকার বিনিময়ে তারা এ কাজগুলো করে যাচ্ছে। এ ধরনের শিশুরা কখনো অপরাধী হতে পারে না। অস্ত্র, বোমা ও মাদক সরবরাহের মূল অপরাধী কে তা যাচাই না করে শিশুদের বিনাদোষে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। থানা কিংবা আদালতে শিশুদেরকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। আসল অপরাধীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ জন্য আমাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। শিশু অপরাধ সংক্রান্ত যে সকল মামলা আদালতে যায় সেগুলোর মধ্যে প্রায় ৯৩ শতাংশ মামলার আসামী নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পায়। এসব কিছু বিবেচনায় এনে সরকার শিশু আইন-২০১৩ প্রণয়ন করেছে। সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিকতায় এ আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশের প্রত্যেক জেলায় আলাদাভাবে শিশু আদালত প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আদালতে অন্যান্য আসামীদের সাথে শিশুদের রাখা যাবে না। শিশু আইনে দায়ের করা মামলাগুলোর মধ্যে ৭৫ শতাংশ মামলা থানায় বসে নিষ্পতি করা যেতে পারে। ৫০ শতাংশ মামলা নিষ্পতি করতে পারলেও শিশু আদালতে মামলার জট কমে আসবে। বিনা অপরাধে কোন শিশুকে শাস্তি দেয়া যাবে না। তাদের প্রতি কোন ধরনের বিরূপ আচরণ করা যাবে না। ১৮ বছর কিংবা আরো কম বয়সের শিশুরা যে কোন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে কিংবা অপরাধীরা তাদেরকে অপরাধে জড়াতে পারে। অপরাধের কারণে শিশুদের বিরুদ্ধে মামলা হলে তাদেরকে হয়রানি কিংবা ভয়-ভীতি না দেখিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ বলেন, শিশু আইনে দায়েরকৃত মামলাগুলো সর্বোচ্চ ৪২০ দিনের মধ্যে নিষ্পতি করতে হবে। মামলার স্বার্থে শিশুদেরকে আদালতে প্রেরণকালে কোমরে কোন ধরনের রশি বা লোহার বেরি পরানো যাবে না। শিশুদের যারা অপরাধী নয় তাদেরকে অব্যাহতি দিতে হবে। আদালতে শিশু আসামীদেরকে অন্যান্য মামলার আসামীদের সাথে রাখা যাবে না। আদালতে পিতা-মাতা, আইনজীবী, আত্মীয়-স্বজনের সাথে শিশুকে রাখতে হবে। সেখানে সংশ্লিষ্ট থানার শিশু বিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তা ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের একজন প্রবেশন অফিসার থাকবে। কোন কারণে শিশুর জামিন না মঞ্জুর করলে তার কারণ স্পষ্ট করে উল্লেখ করবেন আদালত। বিনা কারণে দেশের কোন শিশুকে মামলা জড়ানো যাবে না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ মো. হেলাল চৌধুরী বলেন, শিশুরা যাতে কোন ধরনের অপরাধ কর্মকা- জড়িয়ে না পরে সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। শিশুদেরকে স্বাভাবিকভাবে গড়ে তুলতে প্রত্যেক পিতা-মাতাকে মূখ্য ভূমিকা রাখতে হবে। শিশু আইনের সঠিক বাস্তবায়ন হলে অনেক নিরপরাধ শিশু মিথ্যা মামলা থেকে রেহায় পাবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিজ্ঞ মহানগর দায়রা জজ মো. শাহেনূর বলেন, শিশুদের বিষয়টি বিবেচনায় এনে সরকার শিশু আইনটি প্রণয়ন করেছেন। এ আইনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা রয়েছে। এসব ধারাগুলো যথাযথ ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আন্তরিক হলে শিশু আইন ২০১৩ বাস্তবায়ন হবে।
সভাপতির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার মো. রুহুল আমীন বলেন, আইন দিয়ে সব কিছু হয় না। আমাদের সকলের মনমানসিকতা পরিবর্তন দরকার। দেশের কোন শিশু যাতে বিনা অপরাধে মামলার এজাহারভুক্ত হয়ে শাস্তি ভোগ না করে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: