দুই নেত্রীর সম্পর্কের অবনতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : দুই নেত্রীর মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। নিজেদের প্রতিবেদনে এমনটাই প্রকাশ করেছে বিশ্বের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউ ইhkয়র্ক টাইমস। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অশান্তি সম্পর্কে খুব দ্রুত ধারণা পাওয়ার সবচেয়ে সহজ ও গ্রহণযোগ্য উপায় হল দেশটির ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাওয়া। এখানে একটি ওয়ার্ড আছে যার নাম বার্ন ইউনিট। দেশটির প্রধান দুই রজনৈতিক দলের দ্বন্দ্বে বাস ও সড়কে পেট্রলবোমা হামলার শিকার হওয়া দগ্ধরা চিকিৎসা নিচ্ছে সেখানে। ‘টারময়েল বিটুইন পলিটিক্যাল লিডারস হ্যাজ হার্মড বাংলাদেশি পিপল’ শীর্ষক শিরোনাম করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকাটি। সাম্প্রতিক এক সকালে মোহাম্মাদ নাজুমল হাসান নামে এক লোকের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রিপোর্টে বলা হয়েছে, পেট্রলবোমার কারণে অগ্নিদগ্ধ হয়ে পাঁচ জন মারা গেছে। বাকি ৩ জন দগ্ধ হয়েছে। এঘটনায় তার পা ও হাটু পুড়ে গেছে। তার ভাষায় রাজনৈতিক কর্মীরা এখন তাদের দেশের ভাইদের ওপরই হামলা করছে, হত্যা করছে। বাংলাদেশের খুব কমসংখ্যক মানুষই আছে, যারা এ অবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলেনি। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যখন প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ও হরতালের ডাক দিয়েছেন। এখনও এ বিষয়ে খালেদা জিয়া সমঝোতার জন্য রাজি হলেও তা বাস্তবে হয়নি। সাম্প্রতিক গত কয়েক সপ্তাহে রাজনৈতিক অস্থিরতা কমেছে, জীবন যাত্রা আগের স্বাভাবিক নিয়মে ফিরতে শুরু করেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী কোন সমাধান দৃশ্যত দেখা মেলেনি। রাজনৈতিক নেতারা পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের একটি রির্পোটের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকাটি বলছে, বাংলাদেশে ৬২ দিনের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। যা দেশটির মোট জিডিপির এক শতাংশের সমান। ফলে দেশটির জিডিপির প্রবৃদ্ধি বছর শেষে ৫.৬ শতাংশ হতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার পূর্বে ৬.৬ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বলে বিশ্বব্যাংক ধারণা করেছিল। বিশ্ব ব্যাংকের ঢকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হাসান বলেছেন, রাজনৈতিক এ অস্থিরতা যদি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস থেকে পার হয়ে বছর গড়িয়ে অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়, তাহলে অর্থনীতি আগের অবস্থায় কিভাবে ফিরে আসবে। এমনকি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সক্ষমতা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য ২০১৪ সালের নির্বাচনকে দায়ী করে রির্পোটে বলা হয়, এরপর থেকেই দুই নেত্রীর মধ্যে এই লড়াই চলছে। বিএনপি নেতৃত্বধীন ২০ দলীয় জোট ঐ নির্বাচনকে তামাশার নির্বাচন ও সবাই সরকারের পক্ষে সহযোগিতা করবে বলে অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন করেছিল। শেখ হাসিনা প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক জোটকে বাইরে রেখে নির্বাচন করে। তখন শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, শীঘ্রই আরো একটি নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। এক বছর অপেক্ষার পরে চলতি বছরের জানুয়ারিতে খালেদা জিয়া অনির্দিষ্টকালের প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করে। এই অস্থিরতায় পেট্রলবোমার আঘাতে একশরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে তারও বেশি। অবরোধের ফলে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ লাইন ভেঙে যায়। মাঝে মধ্যে নাশকতা হয়। সরকারি দল এর বিপরীতে ধীরে-ধীরে তার তৎপরতা বাড়ায়। ফলে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করে সরকার। অনেকে আত্মগোপনে রয়েছে। কিন্তু নাশকতার অভিযোগের দায় কখনই শিকার করেনি বিএনপি। তারা বলেছে, অবরোধ ও হরতাল ছাড়া তাদের কাছে বিকল্প কিছু নেই। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেছেন, সরকার আমাদের কথা বলতে দিচ্ছে না। সভা, সমাবেশ ও আমাদের মত প্রকাশ করার কোন সুযোগ দিচ্ছে না। এই অবস্থায় গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো দিচ্ছে না সরকার। বিরোধীদলের এই কর্মসূচি সমগ্র দেশের ক্ষতি করছে পরীক্ষার আগেই স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে, কৃষক তার ক্ষেতের ফসল পচে যেতে দেখেছে, পর্যটন মোটেলগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের রফতানির ৮০ শতাংশ পূরণকারী গার্মেন্টস খাত এখন কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। ৮২০ জন শ্রমিকের কারখানার মালিক সাব্বির মাহমুদের দুটি কারখানাই শীঘ্রই ক্ষতির মুখে পড়বে বলে জানান তিনি। চারটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তাকে কাজ দিত। কিন্তু জানুয়ারিতে দুটি প্রতিষ্ঠান অর্ডার বাতিল করে দেয়। ফেব্রুয়ারি এবং মার্চে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। তবুও তার করার কিছু নেই বলে জানান তিনি। তিনি আরো জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য সড়ক পথ বাদ দিয়ে দুটি শিপমেন্ট বিমানের মাধ্যমে বেশি খরচ দিয়ে পাঠাতে হয়েছে। মাহমুদ বলেন, এখনো একটি কারখানা নতুন করে চালু করার কথা রয়েছে। যেখানে ২ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু রাজনৈতিক সমস্যার কারণে তা চালু করা হয়নি। ফলে উদ্বোধন আরো পিছিয়ে দিতে হয়েছে। মাহমুদ প্রশ্ন করেন, এর দায় কে নেবে? সরকার এর দায় নেবে না। গার্মেন্টসখাত সংশ্লিষ্টরা সবসময়ই সরকারকে এ বিষয়ে বলে আসছে, কিন্তু কেউ তোয়াক্কা করে না। পত্রিকাটি বলছে, সরকার ও দেশটির বেশ কিছু অর্থনীতিবিদ জানিয়েছে, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নিরসন করে অর্থনীতিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার এখনই সময়। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে কঠোর ব্যবস্থায় রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দরে পোশাক রফতানির কাজ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনায় ১,১০০ মানুষের নিহতের পর দেশের পোশাকখাত সেই ক্ষত পুষিয়ে উঠতে পারেনি। বিজিএমইএর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দ্বিতীয় দফায় যদি আবার রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা যায়, তাহলে মে মাসের মধ্যে এ খাতের রফতানি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে যাবে। ঢাকার সিমকো ড্রেসেস লিমিটেডের পরিচালক খুররম সিদ্দিকি বলেন, এটা একটা মানুষের তৈরি দুর্যোগ। ভারত ও পাকিস্তানের মত আমাদের দেশে জাতিগত, ভাষাগত বা সাম্প্রদায়িক বৈষম্য বা দঙ্গা নেই। রাজনৈতিক এই সমস্যা চায়ের টেবিলেই সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। মিরপুরের গার্মেন্টস এলাকায় কর্মীদের ওভারটাইম নেই। আগে যেখানে কাজ শেষে বাড়ি ফিরত রাত ৯টা থেকে ১০ দিকে। এখন বিকেল ৪টা থেকে ৫টা দিকের মধ্যে বাসায় ফিরতে হয়। যা মোটেও ছোটখাট ব্যাপার না, যেখানে বাসা-ভাড়া ও খাওয়া বাবদ মাসে ৬ হাজার টাকার মত খরচ হয়। মোমেনা আক্তার (৩০) নামে এক গার্মেন্টস কর্মী জানান, যদি খালি হাতে আমি বাড়ি ফিরে যাই, তা হবে আমার জন্য জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিন। মোমেনার প্রতিবেশি আরেক গার্মেন্টস কর্মী মাহমুদা খাতুন বলেন, যদি এঅবস্থায় গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে কে দায়িত্ব নেবে। এর জন্য সরকারই দায়ি। আমি বলবো, ‘ সরকার দায়ী, তাদেরকেই আমি দোষ দেব। তার কারণেই সবকিছু ঘটছে।’ সূত্র : শীর্ষ নিউজ ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*