ত্রিলগন

ঊর্মি ব ুড়য়া: চৈত্রের খরতাপ শেষে ঈশান কোণে জড়ো হয় কালোমেঘ। হালকা মৃদুমন্দ বাতাস পরিণত হয় দমকা বাতাসে। আমের মুকুলগুলো আঁটি বেঁধে সুগন্ধ ছড়ায় বাতাসে। বুঝি এসেছে বৈশাখ। এসেছে সে পুণ্য লগ্ন পবিত্র সে মহিমান্বিত দিন বৈশাখী পূর্ণিমার দিন। মোহিত হওয়া চাঁদের আলোয় ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বভুবনে মহামানবের আগমনী বারতা। দেবতা-মনুষ্য পূজিত সর্বজ্ঞতার মুক্তির পথ উন্মোচন, আবার বিশ্বভুবন আঁধারে নিমজ্জিত হওয়ার করুন জ্যোৎøাধারা। বিশ্ব বৌদ্ধবাসীর জন্য ত্রি-সৃত্মি বিজড়িত এই মহান দিনের তাৎপর্য অপরিসীম। লুম্বিনী উদ্যানের মাঝপথে শিশু সিদ্ধার্থের জন্ম হয় ৬২৩ খ্রি. পূর্বাব্দে। এক বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে। জগৎ জ্যোতি সে মহামানবের বীজ লুকায়িত সেইcxloudy ছোট্ট শাক্যসিংহের মাঝে। পরিবার আলোকিত করে বেড়ে উঠা সে শিশুটিকে বিষাদ আর চিন্তামগ্ন দেখে রাজা শুদ্ধোধন আনন্দ আর বিলাসী তার সকল ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু জগতের কল্যাণে মুক্তির জন্য যার ধরাধামে আগমন সে কি করে সুখ আর ভোগে আবদ্ধ থাকে। ক্রমান্বয়ে বড় হতে লাগলেন। রাজার দুঃচিন্তাও বাড়তে লাগল। সন্তানের উদাসীনতা দূর করার মানসে রাজা শুদ্ধোধন ১৯ বছর বয়সে রাজকুমারী গোপাদেবী’র সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করান। সংসারের সকল মোহ বন্ধন তুচ্ছ করে পা বাড়ান দুঃখমুক্তির পথে সকল ভোগবিলাসিতাকে পরাজিত করে একমাত্র সদ্যজাত সন্তান রাহুলের মায়াও হার মেনেছে পারমীর কাছে। প্রতিকূল পরিবেশ আর ধৈর্য-ধ্যানের অকল্পনীয় ধৈর্য পরীক্ষার পর নৈরঞ্জনা নদীর তীরে দীর্ঘ ছয় বছর পর এমনি এক বৈশাখী পূর্ণিমার রাত্রির শেষ যামে জগত আলোক করে বুদ্ধত্ব লাভ করেন কুমার শাক্যসিংহ।
দীর্ঘ ৪৫ বছর জগতে মানবের মুক্তির পথ দেখিয়ে মানব জগতকে মুক্ত করার আলোকবর্তিকাটি ও নিভিয়ে নিভিয়ে দিলেন এমনি এক বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে মল্লদের জোড়াশাল গাছ তলে। ক্রমে ক্রমে দিন যায়, বৈশাখী পূর্ণিমার তিথিও গত হয়। এভাবে গত হলো ২৫৫৯ বুদ্ধাব্দ। বুদ্ধের অনুশাসনের প্রজ্জ্বলিত শিখা’র আলায় বৌদ্ধগণ মুক্তি সন্ধানী। গৌতম বুদ্ধের ধর্মীয় অনুশাসনের আজ আড়াই হাজার বছর পরে এসে বিশ্ব মানবতার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্যও শক্তিময় বাণীটি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে এ যুগের মনীষীদের কাছে, “অহিংসা পরম ধর্ম”। হানাহানি ঘাত-সংঘাতময় এ বিশ্বমাঝারে সিদ্ধার্থ গৌতমের মুক্তির বাণী আজ প্রচণ্ড খরতাপের মাঝে এক পশলার বৃষ্টির ন্যায় আকাক্সিক্ষত। জীবের মাঝে প্রাণ সঞ্চারণ করে যে বায়ু, সে বায়ুতে আজ অবিশ্বাস, আত্মহনন, প্ররোচনা, হিংসা, হত্যা লুণ্ঠন, রাহাজানি মিশে গেছে। বা®েপর ন্যায় উড়ে যাচ্ছে সকল মানবতা, ভালোবাসা, বিশ্বাস, সহানুভূতি। আকাশের মেঘের ন্যায় ভেসে বেড়ায় কেবল সৎচিন্তা, সৎ উদ্দেশ্যের অভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেই কবে বুদ্ধ আমাদের শিক্ষা দিয়ে গেছেন “পঞ্চনীতির”। অন্যের প্রাণ নেবো না, অন্যের ধনে লোভ-চুরি করব না, অনৈতিক আচরণ করবো না, মিথ্যা ভাষণ করব না, নেশারদ্রব্য গ্রহণ করবো না। নিত্যদিনের গৃহীজীবনে চলতে গিয়ে হরহামেশাই লিপ্ত হই পঞ্চনীতির বিপরীত কর্মে। প্রতিদিন চোখ খুলেই দেখি আর কান ভরে শুনি মৃত্যুর খবর। অকালমৃত্যু! কত ভাবে মৃত্যু! গাড়ি চাপায়, গাছ চাপায়, ভবন চাপায়, বিনা চিকিৎসায়, ছুরির আঘাতে, অপচিকিৎসায় আরো কত না মৃত্যুর মিছিল। বিজ্ঞান ও চিকিৎসা শাস্ত্র আমাদের রোগ নিরাময় করে দীর্ঘায়ু দান করেছে ঠিকই, আমাদের কর্মের গতিকে রোধ করবে কি করে, প্রাণীহত্যার কুফল সম্পর্কে অজ্ঞানতার কাছে হার, মানে চিকিৎসা বিজ্ঞান। বিশেষতঃ আমরা বৌদ্ধরা যতই দাবি করি একটি বিজ্ঞানসম্মত ও আধুনিক ধর্মের অধিকারী, আমাদের মাঝেই ধর্মজ্ঞানের দারুণ অভাব। আমাদের ধর্মীয় শিক্ষার কোনো আয়োজন নেই। যতটুকু আছে তাও পুঁথিগত বিদ্যা। পাশ করা কিংবা সার্টিফিকেট অর্জনই এ শিক্ষাগ্রহণের মূল উদ্দেশ্য। ধর্মকে জানা, শেখার জন্য নয়। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় বৃত্তি পরীক্ষার আয়োজন করলেও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, চর্চা কতটুকু হয়। বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার আগে চাই যথাযথ চর্চা। পাশবিক মানসিকতার কাছে হার মানে মানবতা। প্রতিনিয়ত খুন দুর্ঘটনা আর মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় আমাদের সমাজ জীবনের সামাজিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব দেখে বেড়ে উঠছে আমাদের কোমলমতি সন্তানেরা। অপসংস্কৃতি আর অপপ্রচারের ঢামাঢোলে উঠতি বয়সের কিশোর, যুবকেরা স্বকীয়তা আর স্বধর্ম। স্পর্শকাতর মনমানসিকতায় চুল পরিমাণ ভুল হলেই বেঁচে নেয় আত্মহত্যার মতো ঘৃণ্য পথ। এর সবকিছুই মিথ্যাদৃষ্টি আর ধর্মের প্রতি অজ্ঞানতার ফল। আমরা এখনই যদি সচেতন না হই, আমাদের সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বার্থে ধর্মজ্ঞান দিতে সক্ষম না হই তাহলে শত ধন-সম্পদ আর ডিগ্রী দিয়ে ও প্রকৃত মানুষ রূপে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। কুমার সিদ্ধার্থের ন্যায় রাজা সিংহাসন ত্যাগ করতে হবে না, বিশ্বহিতের জন্য আপন সুখ স্বাচ্ছন্দ বিসর্জন দিতে হবে না- অত পরমীবান হয়তো আমরা নই, আমরা আমাদের সুখের জন্য, সমাজের মঙ্গলের জন্য, দেশ ও জাতির কল্যাণের জন্য কেবল মনটাকে সুন্দর করি, ভালো চিন্তা করি। প্রাণীর প্রাণকে ভালোবাসি, পাশের মানুষকে সম্মান দিই। নিজেদের সন্তানকে সুশিক্ষিত, করার পাশাপাশি ধার্মিক করার প্রত্যয়ে অধিষ্ঠিত হই। তবেই হয়তো ভালো থাকার পাশাপাশি ভালো রাখতে পারবো। তপ্ত দহনে এক পশলা বৃষ্টি যেমন প্রাণের রস সঞ্চার করে, অশান্তময় হানাহানি আর অরাজতায় এই চলমান বিশ্বে মহামানব গৌতম বুদ্ধের ধর্মবাণী, ধর্মনীতি সকলের মাঝে প্রাণের সঞ্চরণ করুক। প্রকৃত মানবতার উত্তরণ ঘটাক এই প্রার্থনা করি। সকলকে ত্রিলগণ জড়িত এই বৈশাখী পূর্ণিমার মৈত্রীময় শুভেচ্ছা।
“জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক”
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও শিক্ষিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*