তুরস্কে একে পার্টির জয়

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২ এপ্রিল ২০১৯ ইংরেজী, মঙ্গলবার: তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের দল একে পার্টি টানা ১৫ বারের মত জয় পেয়েছে। আর এ জন্য তুর্কিদের বিশেষ অভিনন্দন জানিয়েছেন এরদোগান। তুরস্কের স্থানীয় নির্বাচনে ১৯৯৪ সালে ইসলামপন্থীদের যে বিজয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানের ক্ষমতাসীন দল একেপি। রোববার অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে জয়ী হয়েছে দলটি। মেয়র নির্বাচনে তারা ৫৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। বেসরকারি ফল অনুযায়ী এরদোগানের দল ১৫টি মেট্রোপলিটন ও ২৪টি শহরে জয় পেয়েছে। আনাদোলু ও হুররিয়াত ডেইলি নিউজ।
তবে রাজধানী আঙ্কারায় সামান্য ব্যবধানে এবং ইজমিরে বড় ব্যবধানে বিরোধী জোটের কাছে হেরেছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা। অবশ্য তুরস্কের সবচেয়ে বড় শহর ইস্তাম্বুলে মেয়র পদে জয়ের দাবি করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী একে পার্টির বিনালি ইলদিরিম ও বিরোধী দলের ইকরাম ইমামোগলু উভয়ে।
প্রাথমিক বেসরকারি ফলাফলে ইমামোগলু ২৫ হাজার ভোটে এগিয়ে রয়েছেন। তবে তিন লাখের বেশি ভোট বাতিল করা হয়েছে। একেপি এই ভোট বাতিলের চ্যালেঞ্জ করবে বলে জানিয়েছে। একেপির প্রার্থী ইলদিরিম বলেছেন, বাতিল ভোট পুনর্গণনা করলে তিনি বড় ব্যবধানে জয়ী হবেন। বিষয়টি নির্ভর করছে সুপ্রিম নির্বাচন কমিশনের ওপর।
রাজধানী আঙ্কারায় বিরোধী জোটের সিএইচপির প্রার্থী মানসুর ইয়াবাস বিজয়ী হয়েছেন। গুরুত্বের দিক দিয়ে রাজধানী আঙ্কারার অবস্থান ইস্তাম্বুল সিটির পরেই। অতীতে ইজমির ছাড়া ইস্তাম্বুল, আঙ্কারা, কোনিয়া, বুরসা, কায়সেরি, আনতালিয়া, গাজি আনতেপের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে নাজমুদ্দিন আরবাকানের রেফাহ পার্টির সফলতার ধারাবাহিকতায় একে পার্টিও তা অক্ষুন্ন রেখেছিল।
এ দিন সর্বমোট ৩০টি সিটি করপোরেশন, ৫১টি জেলা পৌরসভা, ৩৩৪টি সিটি করপোরেশন অধীনস্থ পৌরসভা এবং ৯৭৩টি উপজেলা পৌরসভায় (বাংলাদেশের ইউনিয়নের মতো) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি সিটিতে জয়ী হয়ে এরদোগানের একে পার্টি। বিজয়ী সিটিগুলো হলো: কোনিয়া, বুরসা, কায়সেরি, উরফা গাজি আনতেপ, ট্রাবজন, এরজুরুম,বালিকসেহির, দেনিজলি, কাহরামান মারাশ, খোজায়েলি, মালাতিয়া, ওর্দু, সাকারিয়া ও সামসুন।
এ ছাড়া সিএইচপি (আতার্তুক) জয়ী হয় ১০টি সিটিতে। তাদের জয়ী হওয়া সিটিগুলো হলো- আঙ্কারা, ইজমির, আনাতোলিয়া, এসকেসেহির, আদানা, মার্সিন, মুলা, আইদিন, হাতায় ও টেকিরদাগ। এমএইচপি (জাতীয়তাবাদী) জয় পায় মানিসা সিটিতে। এ ছাড়া এইচডিপি (কুর্দি): ৩টি (কুর্দি অধ্যুষিত ভান, দিয়ারবাকির ও মার্দিন)
সামগ্রিক ফলাফলে একে পার্টি সিটি নির্বাচনে আঙ্কারা এবং আনাতোলিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিটিতে পরাজিত হলেও দেশের সামগ্রিক ফলাফলে তারা অতীতের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে। যেমন আঙ্কারায় একে পার্টি সিটি নির্বাচনে পরাজিত হলেও আঙ্কারা সিটির অধীনস্থ ২৫টি পৌরসভার মধ্য একে পার্টি ১৯টি, জাতীয়তাবাদী এমএইচপি ৩টি এবং আতার্তুকের সিএইচপি মাত্র ৩টিতে বিজয়ী হয়েছে। সিএইচপি আঙ্কারা সিটি নির্বাচনে ৫০.৬২% ভোট পেলেও পৌরসভাগুলোতে মাত্র ৩৬.৭৯% ভোট পেয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে শুধুমাত্র আঙ্কারার বহিরাগত প্রার্থীকে দাঁড় করানোর কারণেই আঙ্কারায় একে পার্টি পরাজিত হয়েছে। এই নির্বাচনে কুর্দিশ দল এইচডিপির ভোট অনেক বেশি কমে গেছে, সে তুলনায় সাদাত পার্টির ভোট কিছুটা বেড়েছে। কুর্দিশ জাতীয়তাবাদী দল এইচডিপি আঙ্কারায় ও ইস্তাম্বুলে তাদের প্রার্থী না দিয়ে আতার্তুকের সিএইচপিকে সমর্থন দেয়ায় এরদোগানের একে পার্টিকে অনেক বেশি সমস্যা মোকাবেলা করতে হলো। সাদাত পার্টির ভোট বাড়ার অন্যতম কারণ হলো কুর্দি এইচডিপির ৮২ জনপ্রার্থী কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় পৌরসভা ও কাউন্সিলর হিসেবে সাদাত পার্টি থেকে নির্বাচন করেছে।
তবে তাদের ভোট বাড়লেও পৌরসভা ও ইউনিয়ন সমমানের পৌরসভায় তাদের বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যা যেখানে ২০১৪ সালে ছিল ২৬ জন, এই নির্বাচনে সেটা কমে ১৩ জন হয়েছে।
জাতীয়তাবাদী দল এমএইচপির ভোট কমলেও একে পার্টির সাথে জোট থাকায় তারা আগের চেয়ে জেলা পৌরসভা ও প্রচুর পরিমাণে উপজেলা পৌরসভায় বিজয়ী হয়েছে। তবে নবগঠিত ইয়ি পার্টির তুলনামূলক ভরাডুবি হয়েছে। যেখানে পার্লামেন্টে তাদের ৫০ জন এমপি রয়েছেন সেখানে তারা মাত্র ২২টি পৌরসভায় বিজয়ী হয়েছে।
নির্বাচনের আগে জরিপগুলো আঙ্কারায় পরাজয়ের পাশাপাশি সারা দেশে এরদোগানের একে পার্টির যে সম্ভাব্য ধসের কথা বলেছিল বাস্তবে তুরস্কের সাধারণ জনগণ সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে এরদোগানকে অনেক বেশি ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছে। আঙ্কারায় নিয়ে এরদোগানের আক্ষেপ থাকলেও ভোট বৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে সামনের দিনগুলোর জন্য একে পার্টি কিছুটা হলেও স্বস্তিতে থাকবে। তবে সামনের দিনগুলোতে সব বিরোধী দলের ঐক্যবদ্ধ জোটকে যে একে পার্টিকে অনেক সাবধানে মোকাবেলা করতে হবে সে সঙ্কেত এই নির্বাচনে ইতোমধ্যে তারা পেয়ে গেছে।
নির্বাচনে একে পার্টিকে জয়ী করায় তুর্কিদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট এরদোগান। আঙ্কারায় একে পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বারান্দা থেকে হাত নেড়ে উপস্থিত নেতাকর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে এরদোগান বলেন, নির্বাচনে একে পার্টি ৫৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এ জন্য আমার নাগরিকদের ধন্যবাদ। আমাদের দলকে সমর্থন জানানোর জন্য বিশেষ করে কুর্দি ভাইদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
দেশটির স্থানীয় নির্বাচনে মেয়র, সিটি কাউন্সিল, মুখতার ও সদস্য নির্বাচিত করতে লাখো তুর্কি তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। বেশ কয়েকটি স্থানে হেরে যাওয়ার কারণ খুঁজবেন জানিয়ে এরদোগান বলেন, আগামীকাল সকাল থেকেই আমরা আমাদের ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।
এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। পার্লামেন্টের পাঁচ দলের বাইরে আরো সাত দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবারের নির্বাচনে। ভোটে জেতার লড়াইয়ে টিকে থাকতে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দলগুলো জোট করে নির্বাচন করেছে। নির্বাচনের মাঠ মূলত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। ক্ষমতাসীন জোট ও বিরোধী জোট। ক্ষমতাসীন জোটে সরকারি দল একে পার্টি এবং কট্টর জাতীয়তাবাদী দল এমএইচপি।
অন্য দিকে প্রধান বিরোধী দল সেক্যুলারিস্ট সিএইচপি জোট করেছে ডানপন্থী আইপি বা সু পার্টির সাথে। বড় সিটি করপোরেশন ও গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে পার্টিগুলো জোটবদ্ধ হয়ে প্রার্থী দিয়েছিল। কোথাও আবার জোটের শরিকদের প্রার্থীর সমর্থনে নিজের প্রার্থীকে তুলে নিয়েছে। লড়াইটা সিটি মেয়র, পৌর কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান, গ্রাম মেম্বার ইত্যাদি পদের প্রার্থী নির্বাচনের জন্য হলেও রাজনৈতিক দলগুলো পার্লামেন্ট নির্বাচনের আদলে প্রচার চালিয়েছে এবার।
সিএইচপি নেতা কেমাল কিলিচদারোগলু বলেছেন, গণতন্ত্রের পক্ষে জনগণ ভোট দিয়েছেন, জনগণ গণতন্ত্রকে বেছে নিয়েছেন। অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় এই নির্বাচনকে এরদোগানের প্রতি জনগণের গণভোট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। প্রখ্যাত সাংবাদিক রুজেন চাকির জানান, ১৯৯৪ সালের মতোই এবারের ভোট ঐতিহাসিক। ওই সময় এরদোগান ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এরদোগানকে অভিনন্দন বিশ্বনেতাদের : স্থানীয় নির্বাচনে একে পার্টি জয়ী হওয়ায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমিরি পুতিন, আজারবাইজান প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ, সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান প্রমুখ।

Leave a Reply

%d bloggers like this: