তির্যক নাট্যগোষ্ঠী নাটকের মুকুরে স্বরূপ দর্শনের ৪২ বছর

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৩ মে: চট্টগ্রামে অফিসপাড়ার প্রম্পটিং করে উঁচুতে বাঁধা অভিনয়, দর্শকের মনোরঞ্জনের জন্যে একটু নাচগান, একটু ভাঁড়ামি পূর্ণ গতানুগতিক নাটকে আর মন ভরছিল না রবিউল আলমের। পূরবী সংসদ তখন গানবাজনা, সমাজসেবা, 1বার্ষিক নাটক করে চট্টগ্রাম শহরে বেশ আলোচিত। কামরুল ইসলাম খোকা একদিন কাজির দেউড়ির চায়ের দোকানে পূরবীর বার্ষিক নাটকের পরিচালক আলী আনোয়ারের মোল্লার সাথে রবিউল আলমের পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি উৎপল দত্তের সাথে গণনাট্য সংস্থায় কাজ করতেন। আলী আনোয়ার সোজাসুজিই বললেন, মজা পেতে হলে নিজেরাই একটা দল করতে হবে। অতঃপর শুরু হল আলোচনা। আলী আনোয়ার একদিন তার দূর সম্পর্কের ভাগ্নী খালেদা ফেরদৌসকে আনলেন। তিনি শিক্ষকতা করেন বাওয়া স্কুলে আবার বেতারে খবরও পড়েন। রবিউল আলম আনলেন তার সহকর্মী প্রকৌশলী কামাল উদ্দিনকে। এই পাঁচ জনের প্রথম আনুষ্ঠানিক সভাটি হল কামরুল ইসলাম খোকার দামপাড়ার বাসায়। সিদ্ধান্ত হলÑ নাটকের দল করা হবে। সাত দিনের মাথায় ১৬ই মে, ১৯৭৪ আবার যখন বসা হল তখন আলী আনোয়ার দলের জন্যে নাম আনলেন তির্যক নাট্যগোষ্ঠী, আর রবিউল আলম লিখে নিয়ে গিয়েছিলেন জননীর মৃত্যু চাই নাটকের পান্ডুলিপি।2 পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হল আলী আনোয়ারকেই। একে একে এসে গেল সব তরুণ তুর্কিরাÑ এদের নিয়ে জননীর মৃত্যু চাইয়ের প্রথম মঞ্চায়নটি হল সি এন্ড বি মঞ্চে, ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪ সালে। চট্টগ্রামের দ্বিতীয় দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করল তির্যক নাট্যগোষ্ঠী।
শুরুতে চারুকলা কলেজের পুরোনা বাড়ির একটা ঘরেই বেশির ভাগ মহড়া করতো তির্যক। সেখানকার ফুলকি মঞ্চে আকাক্সিক্ষত একজন নাটকের প্রথম মঞ্চায়নও হয়েছিল। সেন্ট প্লাসিডস, সেন্ট মেরিজ স্কুলের মিলনায়তনগুলিই ছিল ভরসা। মুসলিম হলের আয়তন ও খরচ মেটানোর সামর্থ ছিল না বেশির ভাগ দলের। শিল্পকলার ছোট মঞ্চটি তৈরি হয় ৮০ দশকের শেষদিকে।
চুয়াত্তরের জন্ম লগ্নে তির্যকের শপথ ছিল ”নাটক চাই, নিয়মিত পাদ প্রদীপের সামনে এসে দাঁড়াতে চাই, অবক্ষয় হতাশা থেকে মুক্তি চাই, নাট্যকার এবং নাট্যকর্মী সৃষ্টি করতে চাই, প্রগতিশীল নাটক মঞ্চস্থ করতে চাই, নাটকের দর্শক সৃষ্টি করতে চাই।”
১৯৭৪ সালে যাত্রা শুরু করে আজ পর্যন্ত তির্যক নাট্য গোষ্ঠী ৩২ টি নাটকের সহ¯্রাধিক মঞ্চায়ন সম্পন্ন করেছে। নাট্যকার সৃষ্টির অঙ্গীকারে তির্যক প্রযোজিত নাটকের অধিকাংশ (৩২ টি নাটকের মধ্যে ১৫ টি) নাটকই দলের নিজস্ব নাট্যকার- রবিউল আলম, আলী আনোয়ার মোল্লা, আবু নাসের ফেরদৌস, রফিউল কাদের রুবেল এর মৌলিক, অনুদিত ও গল্পের নাট্যরূপ। নাট্য প্রযোজনায় বৈচিত্র্যে বিশ্বাসী বলেই তির্যক নাটক নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় নাট্যকার ছাড়াও দেশ বিদেশের নন্দিত নাট্যকারের নাটককে প্রাধান্য দিয়েছে। এ পর্যন্ত প্রযোজিত নাটকের নাট্যকার – হাসনাত আবদুল হাই, আবু রুশদ, মিখাইল শ্চেদ্রিন, মুনীর চৌধুরী, কাজী জাকির হাসান, সেলিম আল দীন, বার্টোল্ট ব্রেখট, বাদল সরকার, আন্তন চেখভ, সফদর হাশমী, ওলে সোইঙ্কা, সাইদ মাহমুদ, উইলিয়াম শেকসপীয়ার, শেখর সমাদ্দার, দারিয়ো ফো, অসীম দাশ।4
সত্তর দশকে তির্যকের তথা চট্টগ্রাম গ্রুপ থিয়েটারের প্রথম পঁচিশতম প্রদর্শনী সম্পন্ন করা মঞ্চ নাটক সমাপ্তি অন্যরকম (’৭৫)। ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘৮২ তে শিল্পকলা একাডেমী মঞ্চে এই উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান করে তির্যক। চট্টগ্রাম শিল্প ও সাহিত্য পরিষদ ৫Ñ১১ ফেব্রুয়ারি ‘৭৭ সপ্তাহব্যাপী সাহিত্য-সঙ্গীত-নাট্য উৎসব করে পরিষদের খোলা মাঠে। উৎসবের শেষ পাঁচ দিনে পাঁচটি দল এখানে নাটক পরিবেশন করে। এটিকে তাই চট্টগ্রামের প্রথম গ্রুপ থিয়েটার উৎসবও বলা যায়। তির্যক পরিবেশন করে দুটি নাটক জননীর মৃত্যু চাই (’৭৪)ও সিসিফিাসের একদিন (’৭৬)। দ্বিতীয়টির রচয়িতা হাসনাত আবদুল হাই। এই উৎসব ও পরবর্তীতে এখানে মঞ্চ নির্মাণে চট্টগ্রামের তদানীন্তন ডিসি সুসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই বিশেষ অবদান রাখেন। তির্যকের প্রথম ঢাকা সফর ছিল ’৭৯ সালে। ২২ জুন ’৭৯ বাংলা একাডেমীর বর্ধমান হাউজ মঞ্চে দুটি নাটক জননীর মৃত্যু চাই (’৭৪) ও এক যে ছিল দুই হুজুর (’৭৭) পরিবেশন করে তির্যক। তির্যক নাট্যগোষ্ঠীর আলোচিত নাটকের মধ্যে “আততায়ী” (’৮৩) অন্যতম। জামিল আহমেদ নির্দেশিত এই নাটকের মাধ্যমে চট্টগ্রামের নাট্য আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা সংযোজিত হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্তৃক সরাসরি মঞ্চনাটক সম্প্রচার অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী দিন ১৩ জুলাই ’৮৪ এই নাটকটি সম্প্রচারিত হয় এবং ১৯৯৭ সালে আবার নতুর করে মঞ্চ নাটক সম্প্রচারের অনুষ্ঠান শুরু হলে চট্টগ্রাম থেকে প্রথম নাট্যদল হিসাবে তির্যক নাট্যগোষ্ঠীর রবিউল আলম রচিত এবং খালেদ হেলাল নির্দেশিত নাটক “বিপক্ষে বন্দুক” (’৯৬) প্রচারিত হয় ২৪ অক্টোবর ১৯৯৭। জামিল আহমেদ নির্দেশিত তির্যকের অন্যান্য নাটক হলো-সমাধান (’৮৫), ভোমা (’৮৭), সহজ সরল পথ (’৯০)। ’৯২ এ রবিউল আলমের অনুবাদ ও নির্দেশনায় শেকসপীয়ারের অ্যাজ ইউ লাইক ইট মঞ্চায়ন করে তির্যক। তৎকালীন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যলয়ে নাট্যকলার শিক্ষক কামাল উদ্দিন নীলু নাটকটির সেট, লাইট, পোশাকের ডিজাইন করেন। চট্টগ্রামে উদ্বোধনী মঞ্চায়ন করেই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী ও গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন আয়োজিত জাতীয় নাট্য উৎসব ’৯২ তে তির্যক নাটকটি পরিবেশনের করে ও বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা কর্তৃক শ্রেষ্ঠ প্রযোজনার মতামত লাভ করে। সালাউদ্দীন ভুইয়া নির্দেশিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে নির্মিত নাটক ”তীর্থযাত্রা” (’৯৭) দর্শকের মনোযোগ আকর্ষন করতে সক্ষম হয়েছে ও প্রশংসিত হয়েছে। তির্যক সদস্যদের সহযোগিতায় রফিউল কাদের রুবেলের লিখা ও সাঈদ হিরোর নির্দেশনায় চলমান ঘটনাবলী নিয়ে নির্মিত ইম্প্রেভাইজ প্রজোযনা ”সত্তান্ধ” (২০০২) চট্টগ্রামের মঞ্চে নতুন সম্ভাবনার আলো দেখিয়েছে। অসীম দাশ নির্দেশিত নোবেলজয়ী নাট্যকার দারিওফোর ”স্বপ্নবৎ” (’৯৯) তির্যকের অন্যতম প্রযোজনা। মুক্তিযুদ্ধের মহান বিজয়ের শিল্প শষ্য গ্রুপ থিয়েটার চর্চা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ঘটনা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য তির্যক ১৯৯১ সালে প্রযোজনা করে মুক্ত নাটক “সোয়াত জাহাজ’৭১”, ২০০৭ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে রফিউল কাদেরের রচনায় নাসির উদ্দীন খান নির্মান করে পথ নাটক ”লজ্জা”, শামীম হাসানের নির্দেশনায় মুক্তিযুদ্ধের অনন্য দৃশ্যকাব্য ”নননপুরের মেলায় একজন কমলাসুন্দরী ও একটি বাঘ আসে”(২০১১) দর্শককে মুগ্ধ করেছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত ”মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় নাট্য উৎসব” এ তির্যক এ প্রযোজনাটি পরিবেশন করে ও প্রশংসিত হয়।
শিশু কিশোরদের নাটকের মাধ্যমে সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তোলার প্রয়াসে ১৯৭৭ সালে ‘তির্যক লিটল থিয়েটার’ নামে চট্টগ্রামে প্রথম শিশু নাট্য কার্যক্রম শুরু করে। তির্যক লিটল থিয়েটার নামে ক্ষুদেদের দলটি খালেদা ফেরদৌসের নির্দেশনায় ও তার সুযোগ্য স্বামী আবু নাসের ফেরদৌসের রচনায় তিনটি কিশোর নাটকÑ কাঠের ঘোড়া ও আলীবাবা (মে ‘৭৭) এবং শাহাজাদীর ঘুম ভাঙল না (ফেব্রুয়ারি ‘৭৮) এর এগারটি সফল মঞ্চায়ন হয়।5
চট্টগ্রামের নাট্য চর্চাকে আরো বেগবান করতে তির্যক নাট্যগোষ্ঠী তার প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে নাট্য উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে আজ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে সচেষ্ট। চট্টগ্রামের নাট্যকর্মী ও দর্শকের কাছে উপস্থাপনের জন্য বিভিন্ন সময় আমন্ত্রন করেছে দেশ বিদেশের উল্লেখযোগ্য নাট্যদলের সফল প্রযোজনা। ১০ ও ১১ জুন ‘৭৮ তির্যক-নাগরিক যৌথ আয়োজনে মুসলিম হলে নাগরিক পরিবেশন করে দেওয়ান গাজীর কিসসা ও বিদগ্ধ রমনীকূল আর তির্যক করে এক যে ছিল দুই হুজুর। ১৯৮৯ সালের ৩০ ও ৩১ শে জানুয়ারী শিল্পকলা একাডেমী মঞ্চে পশ্চিম বঙ্গের অন্য থিয়েটার বিভাষ চক্রবর্তী নির্দেশিত নাটক “মাধব মালঞ্চী কইন্যা” পরিবেশন করে। ১৯৯০ সালের ১ ও ২ ফেব্র“য়ারী দিল্লীর “নয়া থিয়েটার” লোকজ নাটকের সফল নির্মাতা হাবিব তানভীরের নাটক “চরণ দাশ চোর” ও “আগ্রাবাজার” প্রদর্শন করে মুসলিম হল মঞ্চে। বিশ্ব নাট্য জগতের কালজয়ী নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেখট এর ৯২ তম জন্ম জয়ন্তী উপলক্ষে তির্যকের আয়োজনে ৮-১০ ফেব্র“য়ারী ’৯০ চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম ব্রেখট উৎসব। এতে ব্রেখটের নাটক সৎ মানুষের খোঁজে, ধূর্ত উই ও সমাধান পরিবেশন করে যথাক্রমে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ঢাকা থিয়েটার এবং তির্যক নাট্য গোষ্ঠী। এতে নাট্যজন জামিল আহমেদকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। এছাড়াও ছিল প্রদর্শনী এবং আলোচনা সভা। ১৬-২১ মে ২০১৪ পর্যন্ত চার দশক পূর্তি উপলক্ষে চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে ছয়দিন ব্যাপী নাট্য উৎসব আয়োজন করা হয়। এতে তির্যক সহ চট্টগ্রামের ৫ টি ও ঢাকার ১ টি (লোক নাট্যদল-সিদ্ধেশ^রী) নাট্যদল নাটক পরিবেশন করে।
প্রকৃত নাট্যকর্মী সৃষ্টির প্রচেষ্টায় বিগত বছরগুলোতে তির্যক নাট্য গোষ্ঠী বিভিন্ন নাট্য কর্মশালা, সেমিনার এবং আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। বাংলা নাটকের ঐতিহ্য অনুসন্ধানে ২৫-২৭ মে ১৯৮৯ আয়োজিত “বাংলা নাটকে লোক আঙ্গিকের প্রয়োগ ভাবনা” এবং “লোক সংস্কৃতি ও নাট্য আঙ্গিক” শীর্ষক সেমিনার ও আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভারতের অরুন মুখোপাধ্যায় এবং বাংলাদেশের সাজেদুল আউয়াল। নাট্যকর্মীদের রাজনীতি সচেতন করার লক্ষ্যে ২৮ সেপ্টেম্বর’ ৯৩ শিল্পকলা একাডেমীর মঞ্চে আয়োজিত হয় “বাংলা নাটকে রাজনীতি” শীর্ষক একটি সেমিনার এতে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন নাট্যজন শান্তনু কায়সার এবং ২৯শে সেপ্টেম্বর’ ৯৩ ইং উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্য ও চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব উৎপল দত্ত স্মরণে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৭৬ সালে তির্যক নাট্যগোষ্ঠী কর্তৃক রবিউল আলমের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় চট্টগ্রামের প্রথম (এবং দেশের দ্বিতীয়) নাট্য ত্রৈমাসিক তির্যক। যা ছিল একটি প্রশংসনীয় এবং সময়োপযোগী উদ্যোগ। তিন বছরে পত্রিকাটির বারটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়, যেখানে পত্রস্থ হয় ত্রিশটি নাটক। তির্যকে প্রকাশিতনিবন্ধ ও নাটকগুলি সেই সময় সারা দেশের গ্রুপ থিয়েটারের প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করেছিল।
তির্যক নাট্য গোষ্ঠী চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে- ঢাকা, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, মাইজদী, চাঁদপুর, কক্সবাজার- এ নাটক প্রদর্শন করে দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছে এবং প্রশংসিত হয়েছে।
দেশের স্বাধীনতা উত্তর সময়কাল থেকে তির্যক নাট্য গোষ্ঠী আজও নাটকের মুকুরে স্বরূপ দর্শনে নিষ্ঠাবান। নাটকের দর্শকের শুভাশীষ তির্যকের চলার পথের পাথেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*