তিন সিটি নির্বাচনে নাগরিকের ভোটধিকার হরণ!

আ ব ম খোরশিদ আলম খান : গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভোট দেওয়া প্রত্যেকের নাগরিক অধিকার। ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করার সুযোগ গ্রহণ করা রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের কর্তব্য। কিন্তু গত ২৮ এপ্রিল ঢাকা-চট্টগ্রামের তিন সিটিতে যে পদ্ধতিতে ভোট নেওয়া হলো, নির্বাচন কমিশন ও সরকার মিলে যে ধরনের নির্বাচনী তামাশা দেখালো তা দেখে-জেনে নগরবাসী হয়েছে স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ। দেশবাসী হয়েছেন চরম হতাশ ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যত নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন। দেশে লাগাতার তিন মাস ধরে চলা বিরোধী জোটের আন্দোলন, জ্বালাও-পোড়াও, সহিংসতা ও পেট্রোল বোমার বীভৎসতা থেকে দেশবাসী মুক্তি পেয়েছে মনে করা হলেও তিন সিটিতে জোর করে নাগরিক অধিকার হরণ করার ফলে দেশ অগ্নিগর্ভ পূর্বাবস্থায় ফিরে যাচ্ছে কীÑএই শংকা ও উদ্বেগ আজ দেশবাসীর। আমি পেশায় একজন সাংবাদিক। চট্টগ্রামে একটি পত্রিকায় এক যুগ ধরে সাংবাদিকতায় আছি। লেখালেখি করছি দু’ দশক ধরে। বাস্তবতার কথা অসংকোচে বলা ও নির্মোহভাবে সত্য তুলে ধরাই একজন লেখক ও সংবাদকর্মীর মূল দায়িত্ব। তাই এ দায়বোধের বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারি না। চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রস্থল ২১ নং জামালখান ওয়ার্ডের বাসিন্দা হিসেবে স্থানীয় ন্যাশনাল প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুপুর ১টায় নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাই। ভোট কেন্দ্র নয়, যেন রণক্ষেত্রই দেখতে পেলাম। cityসরকার সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর ভোট গ্রহণ এর আগেই শেষ হয়ে গেছে বলে পরস্পর বলাবলি করতে শোনা যায়। আওয়ামী লীগ সমর্থিত তিন কাউন্সিলর সমর্থক-কর্মী-ক্যাডারদের মারমুখী ভূমিকা, থেমে থেমে উত্তেজনা, বিবাদ-হট্টগোলের মুখে বেলা ১২টা বাজার আগে থেকেই ওই কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে বলে জানলাম। অথচ তখনো নারী পুরুষ মিলে শ’ দেড়শ ভোটার ভোট দেওয়ার প্রতীক্ষায় ছিলেন। ওই কেন্দ্রে দুপুর ১টা থেকে সোয়া ২টা পর্যন্ত প্রায় সোয়া ১ ঘণ্টা ভোট দেওয়ার প্রণান্তকর চেষ্টা করে অবশেষে ভোট না দিয়ে সন্ত্রস্ত্র হয়ে দলীয় ক্যাডারদের ধাওয়ার মুখে ভোট কেন্দ্র হতে পালিয়ে আসার বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা জানাতেই এই লেখা। স্বচক্ষে যা দেখেছি তাই নির্দ্বিধায় এখানে প্রকাশ করছি। বলাবাহুল্য, আমি আওয়ামী লীগ ঘরানার লোক না হলেও আওয়ামী লীগ বিরোধী বা এ সরকারের কট্টর সমালোচক নই। বরং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতা পেয়েছি বলে আওয়ামী লীগের প্রতি স্বাভাবিক দুর্বলতা আছে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা দেশ শাসনে আছেন তা আমার কাছে মোটেও অপ্রীতিকর ঠেকে না। দলটির অকল্যাণ কখনো কামনা করি না। তবে তিন সিটিতে ভোট দিতে গিয়ে কেন্দ্র দখল-হট্টগোলের কারণে কীভাবে আমার মতো লক্ষ লক্ষ নগরবাসী ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তা ঝুঁকি নিয়ে বিবেকের দংশন থেকে লিখতে বাধ্য হলাম। প্রকৃতপক্ষে চট্টগ্রামে বেলা ১২টার পর কোনো ভোটই হয় নি। তো এর আগেই ভোট বাক্সে হাজার হাজার ভোট পড়েছে। বহু কেন্দ্রে ভোটাররা ভোট দিতে গেলে জানানো হয় ব্যালট পেপার শেষ। দুপুর ঠিক ১ টায় আমি জামালখানের উক্ত স্কুল কেন্দ্রে গিয়ে দেখি তুমুল গন্ডগোল, হৈচৈ ও উত্তেজনা। আমার ভোটার নম্বার ১২৪৩। কেন্দ্রের সামনের রাস্তায় এবং কেন্দ্রের ভিতরে দেখা গেল শত শত নারী-পুরুষ ভোটার। ভোট দেওয়ার জন্য সবাই প্রতীক্ষায় আছেন। গন্ডগোলের অজুহাত দেখিয়ে নারী-পুরুষ উভয় বুথে ভোট নেওয়া স্থগিত করা হয়েছে বারোটা বাজার আগে থেকেই। জামালখান ঝাউতলার বাসিন্দা একটি প্রাচীন প্রেসে কর্মরত পলাশ দত্ত রুগ্ন শরীর নিয়ে বেলা ১১ টা থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন ভোট দিতে। তাঁর ভোটার নাম্বার ১০৯৯। তিনি তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ভোট দিতে পারেন নি। অনুরূপভাবে ফরিদুল আলম নামে আগ্রাবাদ জীবনবীমা কর্পোরেশনে কর্মরত একজন ভোটারও প্রতীক্ষায় ছিলেন ভোট দিতে। যার ভোটার নং-০৭১৯। তিনি ভোট দিতে আসেন দুপুর দেড়টায়। এসে দেখেন ভোট গ্রহণ স্থগিত। মনসুরাবাদ এলাকা থেকে ভোট দিতে এসেছিলেন মুহাম্মদ মোস্তাফিজ নামে একটি প্রাইভেট এক্সেসরিজ কোম্পানীর জি.এম। যিনি আগে লাভলেইন এলাকায় ছিলেন বলে তখন এ কেন্দ্রের ভোটার হন। কয়েক মাইল দূর থেকে ছুটে আসা এই ভদ্রলোকও ভোট দিতে পারেন নি। জামালখান সলিমা সিরাজ মহিলা মাদ্রাসা কেন্দ্রের ভোটার সাংবাদিক বন্ধু মো: রেজাউল করিমও জানালেন, দুপুর ২টায় তিনি কেন্দ্রে গিয়ে ভোট না দিয়ে ফিরে এসেছেন। তাঁকে জানানো হয়েছে, তাঁর ভোট এর আগেই গৃহীত হয়েছে। এরকম অসংখ্য দৃষ্টান্ত দেয়া যায়। লক্ষ লক্ষ নগরবাসী নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পেরে ক্ষোভে ফুঁসছেন। চট্টগ্রাম সিটির ৪১টি ওয়ার্ডের বাস্তব ভোট দৃশ্য যারাই দেখেছেন অবাক হয়েছেন। গণতান্ত্রিক সরকার আমলে এমন বলপ্রয়োগে ভোট গ্রহণ তথা জনগণের ভোট কেড়ে নেওয়ার দৃষ্টান্ত দেখে শুধু দেশবাসী ক্ষুব্ধ হয়েছেন তা নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। আমার ঐ কেন্দ্রে বেলা ১১টা থেকেই ধাওয়া, তুমুল উত্তেজনা চলছিল। ভোট শুরুর তিন ঘণ্টা পর থেকেই ভোট চিত্র পাল্টে যায়। চলে ভয় ভীতি ও পেশি শক্তির দাপট। দুপুর দেড়টার দিকে ২০/৩০ জন নারী ভোটার ভোট দিতে চাচ্ছিলেন। ২১নং জামাল খান ওয়ার্ডের তিন কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকরা এই নারী ভোটারদের নিয়ে টানা হেঁচড়া শুরু করেন। তখন শুরু হয় চেঁচামেচি ও ত্রিপক্ষীয় তীব্র বাদানুবাদ। এতে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত ভোটারদের মধ্যে। কৌতূহলের বিষয় যে, কাউন্সিলরদের তিন জনই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী। ডা. সুধীর দাশ নামে এক ভোটার দুই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করে ভোট দিতে না পেরে ক্ষোভ ঝাড়লেন প্রিসাইডিং অফিসার ও দায়িত্বরত আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর। লাইন ধরে থাকা অন্য ভোটারদের মাঝেও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেল। ভোটারদের দাবি ও ক্ষোভ প্রকাশ সত্ত্বেও ভোট গ্রহণে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারের কোনো আগ্রহ বা পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এমনকি ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখেও প্রিসাইডিং অফিসার ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে দরজা জানালা বন্ধ করে ভোট স্থগিত ঘোষণা করায় শত শত ভোটারকে ভোট না দিয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। এসময় কেন্দ্রের ভিতরে থাকা কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, ভোট তো আগেই শেষ। ব্যালট পেপারে সিল মারা শেষ। আপনারা ভোট দেবেন কোথায়-কীভাবে? শেষ পর্যন্ত দুপুর পৌনে ২ টায় কেন্দ্রে দায়িত্বরত সাব ইন্সপেক্টর আকতার হোসেন ভোট শেষ এবং স্থগিত বলে ভোটারদের জানান। এরপর কেন্দ্রে দায়িত্বরত ইন্সপেক্টর কবিরও গন্ডগোলের কারণে আর ভোট নেওয়া সম্ভব নয় বলে ভোটারদের সামনে একথা জানালে ভোটাররা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এই ছিল নগরীর কেন্দ্রস্থলে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভোট কেন্দ্রের চিত্র। চট্টগ্রাম-ঢাকার প্রায় সব কেন্দ্রের অবস্থাও ছিল এমন। মেয়র প্রার্থীদের পাশাপাশি সরকারি দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা ত্রাস, ভয়-ভীতি, প্রভাব ও কেন্দ্র দখল করে জালভোট মেরে কথিত বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। যা গণমাধ্যম কর্মীদের চোখ এড়িয়ে যায়নি। উল্লেখ্য, আমার ওই কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ হাজার। কিন্তু বেলা ১২ টার মধ্যে বিশ শতাংশের বেশি ভোট গ্রহণ হয়নি বলে ধারণা করা যায়। এরপরইতো ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। তবুও দিন শেষে ভোট গণনা শুরু হলে দেখা যায় হাজার হাজার ভোটার ঐকেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন। কীভাবে এত ভোট এত অল্পসময়ে গৃহীত হল তা নিয়ে কৌতূহলই থেকে গেল। দুপুর দেড়টার দিকে গোলযোগ চলাকালে কেন্দ্রে আসেন জামাল খান থেকে সদ্য বিজয়ী কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন। তাঁর সমর্থকরা ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মীরা তাঁকে দেখে জটলা ও হৈ চৈ শুরু করে। তাঁকে বেশ ব্যতিব্যস্ত দেখা যায়। প্রতিপক্ষের বাধা ও তীব্র বাদানুবাদের মুখে তিনি মহিলা বুথে ভোট গ্রহণ শুরু করতে চেয়েও ব্যর্থ হন। দুপুর ২টার সময়ও শতাধিক নারী-পুরুষ ভোটার স্কুল প্রাঙ্গণে ভোট দেওয়ার প্রতীক্ষায় ছিলেন। বিশেষ করে নারী ভোটাররা ভোট দেবেন কি না এ নিয়ে কাউন্সিলর প্রার্থী শৈবাল, এম এ নাসের ও বিজয় কুমার কিষানের সমর্থকদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়। তিন প্রার্থীর কর্মীরাই তখন হিসাব কষছিলেন ভোট গ্রহণ যথারীতি আবার শুরু হলে কার লাভ-কার ক্ষতি। এর আগে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত ওই কেন্দ্রে কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে যাদের পক্ষে বেশি ভোট সংগৃহীত হয় তারা প্রাণপণ চেয়েছে ভোট গ্রহণ যেন আর না হয়। আর যাদের পক্ষে ভোট কম পড়েছে তারা ছিলেন বিরোধী পক্ষের প্রতি মারমুখী ও চরম উত্তেজিত। তারা চেয়েছে জোর করে প্রভাব খাটিয়ে পুনরায় ভোট গ্রহণে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বাধ্য করতে। জামালখান ঝাউতলা মেথর পট্টি এলাকার বাসিন্দা চট্টগ্রাম ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ১৪ দলীয় জোট নেতা এডভোকেট আবু হানিফ ও জামালখান মোমিন রোডের ডেকোরেটার্স ব্যবসায়ী আলহাজ্ব মোহাম্মদ সাহাব উদ্দীনও দুপুর দেড়টায় কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট শুরু করার প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসারের সঙ্গে দেখা করে ভোট শুরুর দাবি জানালে প্রিসাইডিং অফিসার নিরাপত্তার কারণে এবং বাইরে গণ্ডগোলের অজুহাত দেখিয়ে ভোট স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছেন বলে আবু হানিফকে জানান। দুপুর ১২টার পর থেকেই ভোট গ্রহণ স্থগিত দেখে আবু হানিফকে এসময় বেশ উত্তেজিত দেখা যায়। অন্যদিকে আমি নিজেও সোয়া ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করে ভোট দিতে না পেরে কর্তব্যরত সাব ইন্সপেক্টর আকতার হোসেনকে জানালাম বহু ভোটার ভোট দেওয়ার প্রতীক্ষায় আছেন। নির্বিঘেœ ভোট গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করাই তো আপনাদের দায়িত্ব। চট্টগ্রামের রিটার্নিং অফিসারও নির্ভয়ে ভোট দিতে নগরবাসীর প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। অথচ আপনারা দলীয় মাস্তানদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন। আপনারা কেন গোলযোগ থামিয়ে বাদানুবাদে লিপ্তদের তাড়িয়ে দিয়ে পুনরায় ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। আমার কথা শুনে উক্ত পুলিশ কর্মকর্তা নিরাপত্তা সংকট ও কাউন্সিলর সমর্থকদের মধ্যে হট্টগোলের কারণে প্রিসাইডিং অফিসার ভোট গ্রহণ স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছেন বলে আমাকে কৈফিয়ত দেন। যদিও বা তাঁর এই জবাব ধোপে টেকে না। ভোট কেন্দ্রের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদেরকে বিবদমান প্রার্থীদের কর্মী সমর্থকদের পেশি শক্তির প্রদর্শন রুখতে কোনো তৎপরতাই দেখা গেল না। বিপুল সংখ্যক আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের কড়া পাহারা সত্ত্বেও কেন্দ্রের ভিতরে বিশেষ দল ও প্রার্থীদের কর্মী সমর্থকরা কীভাবে ভোট গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারল এর সদুত্তর পাওয়া গেল না। তবে অবাক হয়েছি এত গোলযোগ সৃষ্টি করা সত্ত্বেও ত্রাস সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া এবং ভোট গ্রহণ ভণ্ডুল ও বাধাগ্রস্ত হওয়ার পরেও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নিস্পৃহ-নির্বিকার ভূমিকা দেখে। এই অবস্থা দেখে বলা চলে, তারা ছিলেন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে চরম অসহায় ও সরকার দলীয় নেতা কর্মীদের চাপে জিম্মি। সরকার দলীয় নানা পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি, মারামারি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে অবশেষে দুপুর ১ টা থেকে সোয়া ২ টা পর্যন্ত প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা নির্বাচনী নাটক স্বচক্ষে দেখে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কর্মী ও পুলিশের ধাওয়া খেয়ে কোনো রকমে পালিয়ে কেন্দ্র থেকে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে নিকটস্থ বাসায় ফিরে এলাম। ভোটের দিন চট্টগ্রামে সকাল ১১ টায় সংবাদ সম্মেলন ডেকে নজিরবিহীন কারচুপির অভিযোগ তুলে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে সরে দাঁড়ান অন্যতম মেয়র প্রার্থী এম মনজুর আলম। এর এক ঘণ্টা পরে সুন্নি নাগরিক ঐক্য পরিষদের প্রার্থী বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট মহাসচিব মাওলানা এম এ মতিনও একযোগে সবকেন্দ্র থেকে তাঁর এজেন্টদের জোর করে ভয়ভীতি দেখিয়ে বের করে দিয়ে একতরফা ভোট গ্রহণের প্রতিবাদে ভোট বয়কটের ঘোষণা দেন দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। এম.এ. মতিন, এনায়েত বাজার মহিলা কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে গেলে তাকে বাধা দেওয়া হয় এবং সরকারদলীয় কিছু কর্মী তাঁকে লাঞ্ছিত করায় তিনি নিজের ভোটটিও নির্বিঘেœ দিতে পারেন নি বলে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে অভিযোগ করেন। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রের ভোট চিত্রধারণকালে আরটিভির ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। অনেক কেন্দ্রে ক্যামেরাপার্সন ও সাংবাদিকদের সঙ্গেও অসদাচরণ করেন দলীয় দুর্বৃত্তরা। এমনকি কর্তব্যরত সাংবাদিকদের গাড়ি পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘৃণ্য ঘটনার জন্ম দেওয়া হয়েছে। এনায়েত বাজার মহিলা কলেজের পাশে এম এ মতিনের বাসা। শতাধিক ফ্ল্যাটের শুধু ঐ অভিজাত কলোনিতেই এম এ মতিনের আত্মীয়স্বজনসহ শ দেড়শো লোক তাঁর চরকা প্রতীকে ভোট দিয়েছেন বলে তাঁকে জানিয়েছেন। অথচ ঐ কেন্দ্রে মেয়র প্রার্থী এম এ মতিনের পক্ষে একটি ভোটও পড়েনি বলে নির্বাচন কেন্দ্র থেকে রাতে ঘোষণা করা হয়। তাহলে প্রদত্ত এতো ভোট গেলো কোথায়? সুষ্ঠু পক্ষপাতমুক্ত ভোট হলে এম এ মতিন বেশ চমক দেখাতে পারতেন বলে অনেকের ধারণা। মাত্র দেড় ঘণ্টায় ভোট চলাকালে প্রায় বারো হাজারের কাছাকাছি ভোট পেয়ে এম এ মতিন মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে তৃতীয় হয়েছেন। যদিও বা সঠিকভাবে ভোট গৃহীত ও গণনা হলে ভোটের পরিমাণ কয়েকগুণ বেশি হতো বলে অনুমান করা যায়। কারণ, নগরীতে অসংখ্য সুন্নি মতাদর্শী নীরব ভোটার ছিল তাঁর বড় শক্তি। জাতীয় পার্টি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী সোলায়মান আলম শেঠও সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার অভিযোগ তুলে এবং বহু কেন্দ্র দখলের কথা বলে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনিও মাত্র ছয়হাজারের চেয়ে কিছু বেশি ভোট পেয়েছেন। অথচ এরশাদকে ভালোবাসেন এমন লোককি চট্টগ্রাম শহরে মাত্র ৬ হাজার? ১২ জনের মধ্যে ১১ জন মেয়রই ভোট প্রত্যাখ্যান করায় সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। ঢাকার দুই সিটির অবস্থাও একই। সেখানেও জোর করে সরকারি দল সমর্থিত দুই প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করা হয় বলে অভিযোগ করেন বিএনপি নেতৃবৃন্দ। ভোট শুরুর দুই তিন ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকা-চট্টগ্রামে বিরোধী পক্ষের সকল মেয়র প্রার্থী একযোগে ভোট প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবুও ঢাকা-চট্টগ্রামে বিএনপি সমর্থিত মেয়রপ্রার্থীরা লাখ লাখ ভোট কীভাবে পেলেন তা রহস্যই থেকে গেল। নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করতেই কি সরকার ও নির্বাচন কমিশনের এটি বিশেষ কোনো কৌশল? ভীতিজনক পরিবেশ সৃষ্টি করে একতরফা ভোট আয়োজন করায় এবং বিরোধী পক্ষের প্রার্থীদের কোনো অভিযোগই আমলে না আনায় নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতমূলক এই আচরণ দেখে দেশবাসী আজ হতাশ ও ক্ষুব্ধ। আগেই বলেছি, চট্টগ্রাম-ঢাকায় তিন সিটিতে নির্বাচন দেশে স্বস্তি এনে দিয়েছিল। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে হয়তো দেশে বিরাজিত সহিংস পরিস্থিতির অবসান ঘটতে পারতো। দেশের প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে নির্বাচনী ট্রাম্পকার্ড ছেড়ে সরকার প্রশংসাও কুড়ায়। কিন্তু নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে সরকার এখন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। তিন সিটিতেই যেভাবে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগে নানা কৌশলে বাধা দেওয়া হয়, বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থী, এজেন্ট ও সমর্থকদের প্রতি সরকারি দলের যে আচরণ দেখা গেছে এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একতরফাভাবে সরকার সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব দেখিয়েছে তা দেখে দেশবাসীর শংকা ও দুর্ভাবনা আরো প্রকট হয়েছে। গত বছরের ৫ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন বয়কট করে ২০ দলীয় জোট। দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে তারা বারবার অভিযোগ করে এলেও সরকারি তরফে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার কথা বলে তখন নির্বাচন দেয় সরকার। কিন্তু সেই নির্বাচন সবার অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য করতে সরকার ব্যর্থ হয়। অত্যন্ত কম ভোটারের উপস্থিতি এবং অর্ধেকেরও বেশি প্রার্র্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবার ফলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেই কালিমা দূর করার এবার সুযোগ এসেছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সামনে। কিন্তু তিন সিটির নির্বাচনে সরকারি দল ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা দেখে দেশবাসী আবারও হতাশ হলো। আওয়ামী লীগের অধীনে পক্ষপাতমুক্ত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে যারা বলে আসছিল, তারা এখন আরো জোর গলায় একথা বলার সুযোগ পেয়ে গেল। সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থী ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রামের প্রায় সকল মেয়র প্রার্থী ও বহু কাউন্সিলর প্রার্থী নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করার ফলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে বলা যায়। আমাদের প্রশ্ন, তিন সিটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয় খুব জরুরি ছিল? ওরা বিজয়ী না হলে সরকারের কী বড় ক্ষতি হয়ে যেতো? সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তিনটির মধ্যে দু’একটিতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের জেতার সম্ভাবনা হয়তো ছিল। বিশেষত, চট্টগ্রামে ব্যাপক প্রচারণা, প্রার্থীর প্রভাব, বিশাল কর্মীবাহিনী ও ব্যক্তি ইমেজের কারণে বলপ্রয়োগ ছাড়াই আ.জ.ম নাছিরের বিজয়ের সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সরকার নগরবাসীর ওপর আস্থা রাখতে ও নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ নিতে কেন অপারগ হল তা বোঝা গেল না। অতি কৌশল ও অতি উৎসাহ দেখিয়ে প্রার্থীদের জেতাতে নানা বাহানার আশ্রয় নিয়ে আওয়ামী লীগ মারাত্মক ভুল করলো। তাদের প্রতি যে আস্থা ও বিশ্বাস এতদিন যাদের অটুট ছিল এই সিটি নির্বাচন একতরফাভাবে অনুষ্ঠানের ফলে তা অংকুরেই বিনষ্ট করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্টতর হয়েছে দলীয় সরকার এবং এর আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের অধীনে কখনো বিশ্বাসযোগ্য পক্ষপাতমুক্ত নির্বাচন উপহার দেওয়া সম্ভব নয়। স্বাধীন শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের পক্ষেই সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন সম্ভবÑ এই সত্যটি আরো জোরালো হল। সিটি নির্বাচনকালে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে নির্বাচন কমিশন যখন আবার এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে তখনই বোঝা গিয়েছিলো, আসলেই সিটি নির্বাচনে কী হতে যাচ্ছে। সেনাবাহিনী মাঠে থাকলে নির্বিঘেœ ভোট ডাকাতি কী সম্ভব হতো? এতো কম ভোটারের উপস্থিতি সত্ত্বেও ৪৫/ ৪৭ শতাংশ ভোট গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া যেতো? জনগণ একমাস শান্তিতে ছিল। সিটি নির্বাচন রাজনৈতিক সহিংসতার অবসানের সুযোগ এনে দিলেও সরকার তা কাজে লাগাতে পারল না। সিটি নির্বাচন ইস্যু ও বর্জনের প্রেক্ষাপটে উত্তাল ভয়ার্ত পরিবেশ তৈরির জন্য সরকার বিরোধী জোট এখন নিশ্চয়ই মুখিয়ে আছে। তাহলে এখন দেশের অবস্থা কী হবে। আবারও অস্থিতিশীল নৈরাজ্যপূর্ণ অবস্থার দিকে দেশ ধাবিত হচ্ছে? তিন সিটি নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি, ইসির পক্ষপাতিত্ব ও সরকারি দলের আচরণে বিএনপি জোট ইতিমধ্যে আন্দোলনের হুংকার দিয়েছে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, দেশে আগামী দিনে কি হবে। আবারও আন্দোলন, হরতাল, অবরোধ, সহিংসতা, পেট্রোল বোমার বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দেশবাসী? সরকার কেন বিরোধী জোটের হাতে আন্দোলনের অস্ত্র তুলে দিল! সিটি নির্বাচনে আমার মতো শত শত মানুষকে কেন্দ্রে গিয়ে দীর্ঘ সময় প্রতীক্ষার পরও ভোট না দিয়ে কেন ফিরতে হলো? কী জবাব দেবেন সরকার ও নির্বাচন কমিশন? ভোট দেওয়া প্রত্যেক মানুষের অধিকার। আমাদের ভোটাধিকার কেন এভাবে হরণ করা হল? যেভাবেই নির্বাচন হোক, তিন সিটিতে বিজয়ী তিন মেয়রপ্রার্থীর ব্যক্তি ইমেজ মোটামুটি ভালো। কেউ কেউ এও বলছেন সরকার তুলনামূলক বিচারে হেভিওয়েট প্রার্থীদের জিতিয়ে এনেছে। প্রার্থীরা বহু প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন। এখন প্রতিশ্র“তি পূরণের পালা। সরকার সমর্থিত মেয়ররা নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি পূরণে নিশ্চয়ই সরকারি আনুকূল্য-সহযোগিতা পাবেন। খারাপ নির্বাচন সত্ত্বেও বিজয়ী প্রভাবশালী মেয়রগণ নগরবাসীর সমস্যা-দুর্ভোগ নিরসনে এবং শতমুখী প্রত্যাশা পূরণে কতটা মনোযোগী হবেন এটাই এখন দেখার অপেক্ষা। তাঁদের কাজ ভালো হলে নির্বাচনী প্রশ্নবিদ্ধতার বিষয়টি হয়তো একদিন আড়ালে চলে যাবে। লেখক. সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*