তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন মানা হচ্ছে না

কামরুল হুদা, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮ ইংরেজী, বৃহস্পতিবার: তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন থাকা সত্ত্বেও তা মানা হচ্ছে না। সেখানেই যান দিব্যি ধূমপান চলছে। আপনি গাড়ী করে কোথাও যাচ্ছেন, সেই গাড়ীর ড্রাইভার ধূমপান করছে, যারা ধূমপান করেন না তাদের বিরক্তির কারণ হচ্ছে। আবার অনেক যাত্রীও ধূমপান করছেন গাড়ীতে। এভাবে ধূমপান বেড়েই চলছে। সরকার ধূমপান কমিয়ে আনার যে পরিকল্পনা তা এ ধূমপায়ীদের কারণে নেমে আসবে না। ধূমপান যে একটি মারাত্মক ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক অভ্যাস। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এ সম্পর্কে জানে না এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ সিগারেটের প্যাকেটের গায়েই লেখা থাকে ‘সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর’। তারপরও অনেকেই দেদারছে ধূমপান করছে। অধিকাংশ ধূমপায়ী ধূমপানের মারাত্মক ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে অবহিত নন। সারাদেশে ধূমপান দেবী ছবির বিরুদ্ধে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন না মানা হচ্ছে না। ব্যাপকভাবে ধূমপানের দৃশ্য ব্যবহারের কারণে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা চলচ্চিত্র ‘দেবী’ এরই মধ্যে দেশের তামাকবিরোধীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আইন অনুযায়ী ধূমপানের দৃশ্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ হলেও, রাষ্ট্রীয় অনুদানপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রে বারবার আনা হয়েছে ধূমপানের দৃশ্য। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে সিনেমাটির ফার্স্টলুক পোস্টারে ধূমপানের দৃশ্য ব্যবহার করা হয়। ধূমপান ও তামাকজাতদ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩)-এর ৫(ঙ) ধারায় সিনেমা, নাটক এবং প্রামাণ্যচিত্রে ধূমপান ও অন্যান্য তামাকজাতদ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোন ব্যক্তি এই ধারার বিধান লংঘন করলে অনূর্ধ্ব তিন মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডণীয় হবে এবং একই ব্যক্তি পুনরায় এই ধরনের অপরাধ সংঘটন করলে ওই দণ্ডের দ্বিগুণ হারে দণ্ডণীয় হবেন। আইন অনুসারে, ২০১৩ সালের ২ মে পরবর্তী যে কোনো সময়ে বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত সিনেমায় তামাকজাতদ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য প্রদর্শন দণ্ডণীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অথচ গত ১৯ অক্টোবর ২০১৮ থেকে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে দেবী সিনেমাটির প্রদর্শন শুরু হলেও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের এই সুস্পষ্ট নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। শুধু তাই নয়, সিনেমাটির পরিবেশক জাজ মাল্টিমিডিয়ার অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে গত ১১ অক্টোবর যে ট্রেইলার মুক্তি দেয়া হয়, তাতেও আইন মানা হয়নি। সিনেমা, টেলিভিশন এবং অন্যান্য গণমাধ্যম ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে ধূমপান ও অন্যান্য তামাকপণ্য ব্যবহারের অভ্যাসকে উৎসাহিত করার নজির বিশ্বে কম নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সিগারেটকে পৌরুষ, গ্ল্যামার, তীক্ষè বুদ্ধি ইত্যাদি কাঙ্ক্ষিত গুণাবলীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে দেখানো হয়। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের সৃষ্ট ‘মিসির আলি’ বাংলাদেশে কিশোর ও তরুণ পাঠকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই এক জনপ্রিয় চরিত্র। একাধারে নিষ্ঠাবান পাঠক, বিজ্ঞানমনস্ক পরিশ্রমী গবেষক, নিখুঁত পর্যবেক্ষক এবং অনন্য রসবোধের অধিকারী এই মিসির আলি। দেবী সিনেমায় মিসির আলির যেমন চিত্রায়ন হয়েছে, তেমনটা চালু থাকলে মিসির আলির চরিত্র অনুসরণ করা অসংখ্য কিশোর ও তরুণভক্তরা ধূমপানকেও উপরিল্লিখিত গুণাবলীর একটি অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হিসেবে ধরে নিতে পারেন, যা সন্দেহাতীতভাবে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিতে ফেলবে। ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত জাতি গড়ার সুস্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগোতে থাকা বাংলাদেশের এখনই দরকার এই বিষয়ে সচেতন হওয়া।

দেবী, জয়া আহসান, হুমায়ূন আহমেদ, চঞ্চল চৌধুরী, Cinema, Dhallywood, Rtvonline,

চট্টগ্রামসহ সারাদেশে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রন আইন বহাল থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। আইন অমান্য করে ব্যবসায়ীরা অবাধে ক্ষতিকর তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকার ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রন আইন-২০০৫’ প্রণয়ন করলেও সরকারীভাবে তা বাস্তবায়নে কোন কার্যক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। দুই একটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে এ আইন বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণে কার্যকর ভূমিকা পালনে সরকারীভাবে তেমন কোন সহযোগিতা না পেয়ে তেমন কোন পালন করতে পারছে না। বিভিন্ন এনজিও সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন মেনে চলুন অন্যকে মেনে চলতে অনুপ্রনিত করুন লেখা লিফলেট বিতরণসহ র‌্যালী, মানববন্ধন, পথসভা করে আসছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা তা আমলে নিচ্ছেন না। ব্যবসায়ীরা তামাকজাত দ্রব্য বিকি-কিনি প্রসারে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে। ২০০৫ সালে সরকার কর্তৃক প্রণীত ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইনে আইন অমান্যে জরিমানা ১ লক্ষ টাকা তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন, প্রচারণা এবং পৃষ্ঠপোষকতা নিষিদ্ধ। ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫ জনস্বাস্থ্য রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এ আইন তামাক কোম্পানীর অপতৎপরতা ও কূটকৌশল রোধে ও তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে অনেক বিধানসংযুক্ত করা হয়েছে। এ আইনে “তামাকজাত দ্রব্য” অর্থ তামাক, তামাক পাতা বা এর নির্যাস হতে প্রস্তুত যে কোন দ্রব্য, যা চোষণ বা চিবানোর মাধ্যমে গ্রহণ করা যায় বা ধূমপানের মাধ্যমে শ্বাসের সাথে টেনে নেয়া যায় এবং বিড়ি, সিগারেট, চুরুট, গুল, জর্দ্দা, খৈনী, সাদাপাতা, সিগার এবং হুক্কা বা পাইপের ব্যবহার্য মিশ্রণও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। আইনে তামাকজাত দ্রব্যেও বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা নিষিদ্ধ এবং পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত বিধানে বলা হয়েছে কোন ব্যক্তি ধারা ঃ ৫ (১) (ক) প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়, বাংলাদেশে প্রকাশিত কো বই, লিফলেট, হ্যান্ডবিল, পোস্টার, ছাপানো কাগজ, বিলবোর্ড বা সাইনবোর্ড বা অন্য কোনভাবে তামাকজাত দ্রব্যেও বিজ্ঞাপন প্রচার করবে না বা করাবে না। (খ) তামাকজাত দ্রব্য ক্রয়ে প্রলুব্ধ করার উদ্দেশ্যে, এর কোন নমুনা, বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে, জনসাধরাণকে প্রদান বা প্রদানের প্রস্তাব করবে না বা করাবে না। (গ) তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার বা এর ব্যবহার উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোন দান, পুরস্কার, বৃত্তি প্রদান বা কোন অনুষ্ঠানের ব্যয়ভার বহন করবে না বা করাবে না। (ঘ) কোন প্রক্ষাগৃহে, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় বা ওয়েব পেজে তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য সম্পর্কিত কোন বিজ্ঞাপন প্রচার করবে না বা করাবে না। (ঙ) বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত বা লভ্য ও প্রচারিত, বিদেশে প্রস্তুতকৃত কোন সিনেমা, নাটক বা প্রমাণ্যে চিত্রে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য টেলিভিশন, রেডিও, ইন্টারনেট, মঞ্চ অনুষ্ঠান বা অন্য কোন গণমাধ্যমে প্রচার, প্রদর্শন বা বর্ণনা করবে না বা করাবে না। (চ) তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রয়স্থলে যে কোন উপায়ে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করবে না বা করবে না। (ছ) তামাকজাত দ্রব্যের মোড়ক, প্যাকেট বা কৌটার অনুরুপ বা সাদৃশ্য অন্য কোন দ্রব্য বা পণ্যের মোড়ক, প্যাকেট বা কৌটার উৎপাদন বিক্রয় বা বিতরণ করবে না করাবে না। ধারাঃ ৫ (৩) কোন ব্যক্তি সামাজিক দায়বদ্ধতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে সামাজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করলে বা উক্ত কর্মকান্ড বাবদ ব্যয়িত অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে কোন তামাক বা তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, সাইন, ট্রেডমার্ক, প্রতীক ব্যবহার করবে না বা করাবে না অথবা উহা ব্যবহার অন্য কোন ব্যক্তিকে উৎসাহিত করবে না। তামাকজাত দ্রব্যেও বিজ্ঞাপন ও প্রচারনা নিষিদ্ধ এবং পৃষ্ঠপোষকতা সংক্রান্ত ধারা ভঙ্গের শাস্তিঃ কোন ব্যক্তি এই ধারার বিধান লঙ্ঘন করলে তিনি অনুর্ধ্ব তিন মাস বিনাশ্রম কারাদন্ড বা অনাধিক এক লক্ষ টাকা অর্থ দন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হবেন এবং উক্ত ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা পুনঃ পুনঃ একই ধরনের অপরাধ করলে তিনি পর্যায়ক্রমিকভাবে উক্ত দন্ডের দ্বিগুণ হাওে দন্ডনীয় হবেন। সকল ধরনের তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা নিষিদ্ধঃ অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির নিকট তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিষিদ্ধ সংক্রান্ত বিধানঃ (১) কোন ব্যক্তি অনাধিক আঠারো বছর বয়সের কোন ব্যক্তির নিকট তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় করবে না অথবা উক্ত ব্যক্তিকে তামাক বা তামাকজাত দ্রব্য বিপণন বা বিতরণ কাজে নিয়োজিত করবে না বা করাবে না। (২) কোন ব্যক্তি উক্ত বিধান লঙ্ঘন করলে তিনি অনাধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থ দন্ডে দন্ডিত হবেন এবং উক্ত ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা পুনঃ পুনঃ একই ধরনের অপরাধ করলে তিনি পর্যায়ক্রমিকভাবে উক্ত দন্ডের দ্বিগুণ হারে দন্ডনীয় হবেন। ২০০৫ সনের প্রণীত তামাকজাতদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে রয়েছে ১৮ বছরের কম বয়সের কোন ব্যক্তির নিকট বিড়ি, সিগারেট, জর্দ্দা, গুল ইত্যাদি তামাকজাত দ্রব্য বিক্রয় নিষিদ্ধ। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন মেনে চলুন অন্যকে মেনে চলতে অনুপ্রাণিত করুন। জনস্বাস্থ্য রক্ষায়, তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইন বাস্তবায়নে জনসচেতনা সৃষ্টির লক্ষ্যে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা আবশ্যক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*