তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন দেয়া বন্ধ করা হোক

মোঃ দিদারুল আলম: বাংলাদেশে তামাকের ব্যাপক বিজ্ঞাপন হতো। ২০১৩ সালের এপ্রিলে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধীতে বিক্রয় কেন্দ্রের ঘিরে বিজ্ঞাপন ও টিভি – ফিল্ম অনলাইনে বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হয়। আইন অনুযায়ী তারপর থেকে তামাক কোম্পানির এ সকল মাধ্যমে কোন ধরনের প্রচারণা চালানোর সুযোগ নেই। কিন্তু তামাক কোম্পানি অত্যন্ত সুকৌশলে নিত্য নতুন তামাকের বিজ্ঞাপন আরো ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে এবং দিনের পর দিন তাদের প্রচারণার ধরণেও পরিবর্তন আসছে। তারা বিভিন্ন মাধ্যমকে ব্যবহার করে ভোক্তাদের কাছে হাজির হচ্ছে।তামাক কোম্পানি তাদের বিক্রি বাড়াতে এবং ব্রান্ডের প্রচারণা বাড়ানোর জন্য খালি মোড়কে ফ্রি সিগারেটের পাশাপাশি আকর্ষণীয় লিফলেট, দিয়াশলাই বক্স, লাইটার, দৃষ্টিনন্দন কৌটা বাজারে ছেড়েছে ও ভোক্তাদের উপহার দিচ্ছে।z
নামকরা সিগারেট কোম্পানিগুলো লোকজন যেখানে বেশি যাতায়াত করে, যেমন – রাস্তার ধারে, ফুটপাতের সিগারেট বক্সসহ বিভিন্ন দোকানের সাইন বোর্ড, শোকেজ ইত্যাদি তাদের ব্রান্ডের রঙে ডেকোরেশন করে দিচ্ছে। ডেকোরেশন আকর্ষণীয়ভাবে লাইটিংসহ সিগারেটের খালি প্যাকেট প্রদর্শিত হচ্ছে। দোকানে সাইনবোর্ড, শোকেজ ইত্যাদি তাদেও ব্রান্ডের রঙে ডেকোরেশন কওে দিচ্ছে। মোবাইল কোর্ট কর্তৃক জরিমানার অর্থ তামাক কোম্পানি দোকানদারকে ফেরৎ দিয়ে দেয় বলে জানা গেছে। এছাড়া বেশ কিছু সুপারশপ তাদের সুসজ্জিত সেলফে সিগারেটের প্যাকেট সাজিয়ে তামাক কোম্পানির বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করে।
ইদানিং টিভি নাটকে ধূমপানের দৃশ্য প্রদর্শনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের টিভি নাটকে ধূমপানের দৃশ্য কিংবা তামাকজাত পণ্যের ছবি প্রদর্শন করা নিষিদ্ধ। এ ধরনের প্রদর্শনী তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলসমূহ ও বিটিভি আইনকে আগ্রাহ্য করে প্রায়শই নাটকে সুকৌশলে ধূমপানের দৃশ্য প্রদর্শন করছে। টিভি নাটকে ধূমপানের দৃশ্য প্রদর্শনের ফলে দর্শকদেরমধ্যে তামাকজাত দ্রব্য সেবনের আগ্রহ তৈরি হয়। এর মাধ্যমে মূলত তামাক কোম্পানির উদ্দেশ্য হাসিল হচ্ছে। এক গবেষণায় দেখা গেছে – বাংলাদেশের টিভি নাটকের ৬০.৭১ শতাংশ নাটকে ধূমপানের দৃশ্য দেখা গেছে এবং ৩৯. ২৯ শতাংশ নাটকে কোন ধূমপানের কোন দৃশ্য দেখা যায়নি।নারী ও শিশুর সম্মূখে ধূমপান করার দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়েছে। সার্ভেকৃত নাটকের মধ্যে ৩. ৫৭ শতাংশ নারীর ধূমপান করার দৃশ্য দেখা গেছে।
বর্তমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী টিভি নাটকে ধূমপানের দৃশ্য দেখানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই সে সময় স্বাস্থ্য সতর্কবাণী প্রদর্শনের বিষয়টি অবান্তর। তথাপি মোট সার্ভেকৃত নাটকের মধ্যে ১৪ .২৯ শতাংশ টিভি নাটকে ধূমপানের দৃশ্যে স্বাস্থ্য সতর্কবাণী স্ক্রল করে দেখানো হয়। তবে তা অল্প সময়ের জন্যে এবং ফন্টের আকৃতি ছিল ছোট। ৩.৫৭ শতাংশ নাটকে ধূমপানের দৃশ্য ঝাপসা করে দেখানো হয়।
যেহেতু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৫৬তম সম্মেলনে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার জন্য Framework Convention on Tobacco Control (FCTC) নামীয় কনভেনশনে বাংলাদেশ ১৬ জুন, ২০০৩ ইং তারিখে স্বাক্ষর এবং ১০ মে, ২০০৪ ইং তারিখে অনুস্বাক্ষর করেছে এবং উক্ত কনভেনশনের বিধানাবলী বাংলাদেশে কার্যকর করার লক্ষ্যে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের উৎপাদন, ব্যবহার, ক্রয় – বিক্রয় ও বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করা সমীচীন ও প্রয়োজন।
দেশজুড়ে তামাক কোম্পানিগুলো তামাকবিরোধী আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলেছে। দেশি – বিদেশী বিভিন্ন তামাক কোম্পানি তাদের ব্যান্ডের সিগারেটের খালি প্যাকেটগুলোকে একত্রিত কওে দৃষ্টিনন্দনভাবে সাজিয়ে রাখছে। এক কথায় বলতে গেলে এগুলো চলছে বিজ্ঞাপনের মত। বাংলাদেশে এখন তামাকজাত দ্রব্যের প্রত্যক্ষ বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ হলেও তামাক কোম্পানিগুলো বিভিন্ন উপায়ে খুচরা বিক্রয় কেন্দ্রগুলোতে বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করে তাদের প্রচারণা চালিয়ে আসছে।
গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০০৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধা হওয়ার পরও তামাক কোম্পানির অবৈধ বিজ্ঞাপনের কারণে প্রায় শতকরা ৩৮.৪ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি তামাকপণ্যের বিক্রয়স্থলে বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা দেখে। শতকরা ৩৮ শতাংশ দোকানে (পয়েন্ট অব সেল) তামাক কোম্পানির শোকেজ বা বক্স বিদ্যমান, বিভিন্ন তামাক কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা শতকরা ৬৮. ৮ শতাংশ খুচরা দোকানদারকে বিভিন্ন রকম উপহার দিয়ে থাকেন, শতকরা ২৭.৯ শতাংশ দোকান তামাক কোম্পানি আসবাব বা বিলবোর্ড কিংবা সাইনবোর্ডের মাধ্যমে সাজিয়ে দিয়েছে। এর মাধ্যমে তামাক কোম্পানির ব্রান্ডগুলোর পরিচিতি আকর্ষণীয়ভাবে ফুটে উঠে। শতকরা ১৫ শতাংশ বিক্রয়কর্মী বলেছেন, তাদের দোকানে ভিডিও শো বা ল্যাপটপের মাধ্যমে তামাকের প্রচারণার আয়োজন করা হয়েছে – যার মধ্যে ৮৭ ভাগ আয়োজন করেছে দেশের সবচেয়ে বড় বহুজাতিক তামাক কোম্পানি। শতকরা ৬০ শতাংশ দোকান লিফলেট, শতকরা ৪৮. ৫ শতাংশ দোকানে পোস্টার, শতকরা ৭৭.২ শতাংশ দোকানে সিগারেটের একাধিক খালি প্যাকেট একত্র করে সাজিয়ে রাখা হয়। এছাড়া শককরা ৩২.৩ শতাংশ দোকানে সিগারেটের ডামি প্যাকেট ঝুলানো থাকে।
এখন তামাক কোম্পানিগুলো ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া ও যেভাবে অন্যান্য উপায়ে তামাকজাত দ্রব্যের প্রচারণা চালাচ্ছে তা আইনত দ-নীয়। ২০০৫ সালের আগে তামাক কোম্পানিগুলোকে সরাসরি শাস্তি দেওয়ার কোন সুযোগ ছিল না, কিন্তু বর্তমান আইনে তা সম্ভব। আইনে তামাক ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যে ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধন) ২৯ এপ্রিল ২০১৩ পাশ হয়ে ২ মে কার্যকর আছে। কিন্তু তারপরও আইনের লংঘন ঘটেই চলেছে, যেন কেউ দেখার নেই।
ধূমপান শুধু ধূমপায়ীর ক্ষতি করে না অধূমপায়ীদেরও সমান ক্ষতি করে। বিষয়টি অনুধাবন করে সরকারের সংশ্লিষ্টদের এখনই উচিৎ পরোক্ষভাবে ধূমপানের বিজ্ঞাপন বন্ধ করা। লেখক: বেসরকারি সমাজ উন্নয়ন সংস্থা ইপসা’য় কর্মরত। didarsharaf@yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*