তরুণদের অবদান সবখানে হতাশার সূচক কর্মসংস্থানে

মো. আবুল হাসান ও খন রঞ্জন, ৭ ডিসেম্বর, বুধবার: রায়তারুণ্য মানে নতুন সৃষ্টি। সৃষ্টিশীল ভালোবাসায় ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়া। দেশে দেশে, সময়ের বাঁকে বাঁকে বহু তরুণের অবদানে পাল্টে গেছে যুগ, এগিয়েছে সভ্যতা, দিগন্ত বেড়েছে কল্পনার। এঁদের অনেকের জীবনও ছিল স্বল্পায়ু। অম্লান আলো জ্বালানো এই চিরতরুণদের জন্য আমাদের বুকভরা ভালোবাসা। 1
তরুণদের স্বপ্নের কোনো নির্ধারিত গণ্ডি থাকে না। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের সময় ইত্তেফাক-এর শিরোনাম ছিল কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার পঙ্ক্তি এ ‘যৌবন জলরঙ্গ রুধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ’। সত্যিই তারুণ্যের সম্মিলিত তরঙ্গ কোনো বাঁধই আটকাতে পারে না। ‘এ যৌবন তলতরঙ্গ রুধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ/ রুধিবি কি দিয়া সাগর জোয়ার আকাশে যখন উঠেছে চাঁদ?
রবীন্দ্রনাথের কবিতাতে যে কথাটা বলা আছে, ‘ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’। তরুণেরা যখনই নতুন কিছু করতে চায়, প্রবীণেরা বাধা দেয়। তরুণ বলতে কিংবা ‘আঠারো’ বলতে যেন আমরা বয়স না বুঝি। যিনি নতুন কিছু করেন, নতুন কিছু ভাবেন, নতুন কিছু বলেন, তিনিই তরুণ। আর যিনি কায়েম হয়ে থাকা ব্যবস্থা কিংবা চিন্তা কিংবা স্থিতিকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চান, পরিবর্তনকে স্বাগত জানাতে চান না, তিনিই প্রবীণ। আবার শারীরিক বয়স কম কিন্তু পরিবর্তনকে স্বাগত জানাতে চান না এমন নবীনও দেখতে পাওয়া যায়। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘যৌবনের গান’ প্রবন্ধে ব্যাপারটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ‘বাধর্ক্য তাহাই যাহা পুরাতনকে, মিথ্যাকে, মৃত্যুকে আঁকড়িয়া পড়িয়া থাকে, বৃদ্ধ তাহারাই যাহারা মায়াচ্ছন্ন নব মানবের অভিনব জয়যাত্রার শুধু বোঝা নয়, বিঘœ, শতাব্দীর নব যাত্রীর চলার ছন্দে ছন্দ মিলাইয়া যাহারা কুচকাওয়াজ করিতে জানে না, পারে না. যাহারা জীব হইয়াও জড়, যাহারা অটল সংস্কারের পাষাণস্তূপ আঁকড়িয়া পড়িয়া আছে। বৃদ্ধ তাহারাই যাহারা নব অরুণোদয় দেখিয়া নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে দ্বার রুদ্ধ করিয়া পড়িয়া থাকে। আলোক-পিয়াসী প্রাণ চঞ্চল শিশুদের কল কোলাহলে যাহারা বিরক্ত হইয়া অভিসম্পাত করিতে থাকে”।
তরুণরা কখনো তারুণ্য চেতনায় আপাস করেনি। যেমন আপস করেনি ১৯৫২ সালে তরুণদের পথ ধরে আমরা পেলাম আত্মপরিচয়, ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধিকার আন্দোলনে। এবং অবশেষে মুক্তিযুদ্ধে। আমরা যদি মাহবুব আলমের লেখা ‘গেরিলা থেকে সম্মুখযুদ্ধে’ বইটা পড়ি, দেখব, গ্রামের রাখাল চাষি, লেখাপড়া না জানা কিশোর তরুণেরা কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। কী অসমসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিল তারা। নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘টিটোর স্বাধীনতা’ বইয়ে পড়ব কীভাবে এক কিশোর টিটো মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিল। মেজর কামরুল হাসান ভূঁইয়ার ‘জনযুদ্ধের গণযোদ্ধা’ দেখি, গণযোদ্ধারা সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে আসা সাধারণ মানুষ-নিয়মিত বা প্রচলিত সৈনিক নয়, এরা অষ্টম শ্রেণির ছাত্র নৌকার মাঝি, গেরস্ত ঘরের কামলা, ট্রাক ড্রাইভার, মোটরসাইকেল মেকানিক, কদাচিৎ কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
এরাই আমাদের চিরকালের আঠারো। আজকের তারুণ্যও জাগ্রত আছে। সক্রেটিস যেমনটা বলেছিলেন সর্বোচ্চ দেশপ্রেম হলো সবচেয়ে সুন্দরভাবে নিজের কাজটুকু করা। বর্তমান বৈশ্বিক যুব উন্নয়ন সূচক বা ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে (ওয়াইডিএ) বাংলাদেশে তরুণদের কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য বিষয়ে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তা সত্যিই হতাশার। সম্প্রতি কমলওয়েলথ প্রকাশিত এই সূচকে বলা হয়েছে, তরুণ বা যুবকদের কর্মসংস্থানে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বের ১৮৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৭ তম। আর রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নাগরিক কর্মকাণ্ডসহ সব বিষয় যুক্ত করে ১৪৬ তম অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের স্থান সূচকের নিচের সারিতে। শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ভূটান, নেপাল ও ভারতের চেয়ে পিছিয়ে।
সূচকে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া ও স্বাস্থ্যসেবামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের তরুণেরা পিছিয়ে আছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২ তম। শিক্ষা পাওয়া ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও এ দেশের তরুণেরা পিছিয়ে। বাংলাদেশের অবস্থান ১৪০ তম। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই অবস্থান মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী দেশে কর্মক্ষম ২ কোটি ২৬ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বেকার। এর মধ্যে পুরুষ ১ কোটি ১২ লাখ ১৮ হাজার। নারী ১ কোটি ১৪ লক্ষ ১২ হাজার। বোঝা যায়, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যথাযথ ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। পরিকল্পনা থাকলে এবং ধারাবাহিকভাবে তা বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতি এই পর্যায়ে এসে পৌঁছত না। অথচ তরুণ জনশক্তিই তাদের উদ্যম ও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে শ্রমবাজারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বেকারত্ব নিরসন, কর্মক্ষম জনশক্তির জন্য কাজ সৃষ্টি বা সম্ভাবনাময় তরুণসমাজকে কাজে লাগানোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।
কর্মসংস্থানে উদ্যোগী হওয়ার পাশাপাশি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেও এর সঙ্গে মিলিয়ে ঢেলে সাজাতে হবে। কারণ, এত সংখ্যক বেকার থাকার পরও দেশে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি রয়েছে এবং সে জন্য বিদেশি জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হচ্ছে। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। ১৮ বছর গুরুত্বপূর্ণ সময় এই প্রেক্ষাপটে এদেশে প্রতিবছর প্রায় ১৪ লক্ষ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হয়। কিন্তু যথাযথ কর্মসংস্থানমুখী ডিপ্লোমা শিক্ষার অভাবে মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ছাত্রসমাজ হচ্ছে আমাদের দেশের বিশাল শক্তি। সেই বিশাল শক্তির অপব্যবহার মোটেই কাম্য নয়। প্রতিটি তরুণ কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষায় শিক্ষিত হউক এটাই জাতির প্রত্যাশা।
জাতীয় উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন ও টেকসই সমাজ সৃষ্টিতে দক্ষ মানবসম্পদের বিকল্প নেই। আর উন্নয়নের মাধ্যম হচ্ছে ডিপ্লোমা শিক্ষা। বিশেষত ডিপ্লোমা শিক্ষাই হচ্ছে সব শিক্ষার ভিত্তি। বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডিপ্লোমা শিক্ষা ব্যবস্থাকে গতিশীল ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। মানসম্পত ডিপ্লোমা শিক্ষা ও তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক জ্ঞানই মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার রুপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে দক্ষ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এগুতে হবে।
এক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে বাধা উপনিবেশিক আমলে গড়া ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী ৭টি প্রতিষ্ঠান। যথা কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, আয়ুর্বেদীয় বোর্ড, হোমিওপ্যাথিক বোর্ড, নার্সিং কাউন্সিল, ফার্মেসি কাউন্সিল, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ, প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি এই ৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে ডিপ্লোমা শিক্ষা কার্যক্রম পৃথক করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকা ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, চট্টগ্রাম ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, খুলনা ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, রাজশাহী ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, সিলেট ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, বরিশাল ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, রংপুর ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড, ময়মনসিংহ ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বোর্ড সেখানে হাইস্কুল আছে তারই পার্শ্বে নির্মাণ করবে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসএসসি পাশ তরুণরা নিজ বাড়ীতে বসে ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণ করবে। অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষম হবে এবং বিশ্ব নাগরিকে পরিণত হবে।
প্রাতিষ্ঠানাকি ডিপ্লোমা শিক্ষার শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ উচ্চ বেতন বিদেশ গমন করবে। তরুণদের হাত ধরেই স্বাধীনতার যুদ্ধে নিহত শহিদের স্বপ্ন ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে। বাংলাদেশের তরুণরা কর্মের গণ্ডি অতিক্রম করে বিশ্ব শ্রমবাজার দখল করবে। আর তাতেই বৈশ্বিক যুব উন্নয়ন সূচক অগ্রগামী হবে। কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌছাবে দেশের সার্বিক উন্নয়ন গতিধারা।
লেখক: ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ, Khanaranjanroy@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*