ঢাকা উত্তরের বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : অবশেষে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পTabitদে বিএনপি নেতৃত্বাধী ২০ দলীয় জোটের সমর্থন পেলেন তাবিথ আউয়াল। বৃহস্পতিবার রাতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাবিথকে মেয়র পদে সমর্থন দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন ‘আর্দশ ঢাকা আন্দোলন’ এর আহবায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ। এই আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের ব্যানারেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টুর বড় ছেলে হিসেবে পরিচিত হলেও তাবিথ উচ্চশিক্ষা ও দক্ষ ব্যবসায়িক নেতৃত্ব দিয়ে ব্যক্তি জীবনে একজন সফল মানুষ হিসেবে পরিচিত। ঢাকা উত্তর সিটিতে যে সকল প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে নবীন তাবিথের বয়স ৩৬ বছর। তবে সবার মধ্যে তিনিই বেশি উচ্চ শিক্ষিত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে (বিবিএ) স্নাতক এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞানে স্নাতোকত্তর (এমএসসি) ডিগ্রী অর্জন করেন। ঢাকার গুলশানে বেড়ে ওঠা তাবিথ স্থানীয় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে ‘ও’ লেভেল (অর্ডিনারি লেভেল) ও ‘এ’ লেভেল (অ্যাডভান্স লেভেল) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হন। পড়াশোনা শেষে গত তিন বছর ধরে বাবার মালিকানাধীন মাল্টিমোড গ্রুপেই কর্মরত আছেন তাবিথ। তিনি গ্রুপটির উপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ডিসিইউ)। মাল্টিমোড গ্রুপ বাবার প্রতিষ্ঠিত হলেও এর ১৭টি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার পরিচালনা হয় তাবিথের হাতেই গত তিন বছরে তার নেতৃত্বে সবগুলো প্রতিষ্ঠান শতভাগ লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে ব্যবসায়ের বাইরে তাবিথের সামাজিক জীবনের কথা জানা যায়। তাবিথের শ্বশুর জামায়াত দলীয় ব্যবসায়ী নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইস্কান্দার আলী। তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডের অডিট কমিটির চেয়ারম্যান এবং দৈনিক নয়া দিগন্ত ও দিগন্ত টেলিভিশনের পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান। আবদুল আউয়াল মিন্টুর আগ্রহে ইঞ্জিনিয়ার ইস্কান্দার আলীর মেয়ে সওশান ইস্কান্দারের সাথে তাবিথের বিয়ে হয়। উচ্চ শিক্ষিত সওশান শিক্ষকতায় পেশায় নিযুক্ত। যেভাবে কর্মী থেকে বিএনপির মেয়রপ্রার্থী : ব্যক্তিগত জীবনে অনেকটা অন্তর্মুখী ও স্বল্পভাষী মানুষ তাবিথ আউয়াল। ভদ্রতা ও নিয়মিত নামাজ পড়ার কারণে পরিচিত মহলে তিনি সমাদৃত। ২০০১ সালে তাবিথের বয়স যখন ২২ বছর তখন তার বাবা আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। ওই সময় থেকে বিএনপিকে সমর্থন করলেও মূলতঃ ২০১৩ সাল থেকে দলটির কর্মীতে পরিণত হন তিনি। তাবিথ ঢাকা ও পৈত্রিক ভিটা নোয়াখালীতে বিএনপির নেতাকর্মীদের অর্থনৈতিক সহায়তা করে থাকেন। পাশাপাশি দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মামলা পরিচালনা ও জামিন প্রাপ্তিতে তার নেপথ্য ভূমিকার কথাও জানা যায়। তাবিথ বিএনপি ও এর কোনো অঙ্গ সংগঠনের পদে না থাকলেও দলটির একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে থাকেন। ৫ জানুয়ারির এক তরফা নির্বাচন প্রতিহত করতে ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর মার্চ ফর ডেমক্রেসি কর্মসূচি পালনের ডাক দেয়ায় খালেদা জিয়াকে তার গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করা হয়। এর মধ্যে ২৫ মার্চ রাতে কার্যালয়ের সামনে থেকে তাবিথ আওয়াল গ্রেপ্তার হন। সর্বশেষ গত ২১ ফেব্রুয়ারি অবরোধের মধ্যেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিএনপির শোক মিছিলে অংশ নিয়ে ভাষা শহীদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তিনি। জানা গেছে ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে একজন বিশেষ প্রার্থীকে জেতানোর জন্য আগে থেকেই মাঠ প্রস্তুত করা হচ্ছিল। এর অংশ হিসেবেই এই সিটিরি শক্তিশালী প্রার্থী নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না আটক হন এবং কারাগারে থেকে নির্বাচন করতে চেয়েও অনুমতি পাননি তিনি। একই কারণে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আউয়াল মিন্টুও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। তাকে নির্বাচন করতে দেয়া হবে না এমন খবর জেনে ঝুঁকি এড়াতে শেষ মুহূর্তে বড় ছেলে তাবিথকে দিয়েও মনোনয়ন কেনান তিনি। পরে দেখা যায় তুচ্ছ কারণ দেখিয়ে মিন্টুর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। যা চ্যালেঞ্জ করে বিভাগীয় কমিশনার, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে আপিল করেও নজিরবিহীনভাবে প্রার্থিতা ফেরত পাননি তিনি। এরমধ্যে যেন মিন্টুর ছেলে তাবিথও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে তার জন্য তাদেরকে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার ও সব পরিশোধ থাকা সত্ত্বেও সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণখেলাপি দেখিয়ে তাবিথের প্রার্থীতাও বাতিলের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে সরকারি দল আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আনিসুল হকের শ্বশুর ব্যারিস্টার রফিক-উল-হককে ধরে নিজের যমুনা রিসোর্টের লিজ বাতিলের সিদ্ধান্ত স্থগিত করান মিন্টু। পাশাপাশি তাবিথকেও নির্বাচন থেকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এ সময় মেয়র পদে বিকল্পধারার প্রার্থী মাহী বি চৌধুরীকে বিএনপির সমর্থন করার বিষয়টি কোন কোন মহল সামনে আনে। মাহীও নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে জাতীয়তাবাদী দাবি করে খালেদা জিয়ার সমর্থন চান। কিন্তু বিএনপির সমর্থন চাইলেও দলটির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে যোগদানের উদ্যোগ না নেওয়ায় এবং এ কারণে জোটের শরিকদের পক্ষ থেকে মাহীকে সমর্থন দেয়ার তীব্র বিরোধিতা করা হয়। বিশেষ করে মাহী শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চে গিয়ে জামায়াত নেতাদের ফাঁসির দাবি জানানোর কারণে এবং জামায়াত আছে বলে ২০ দলে যোগ না দেয়ায় দলটির পক্ষ থেকে বিরোধিতা ছিল লাাগামহীন। পাশাপাশি তিন সিটি নির্বাচনের কোনোটিতেই জামায়াত মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ না পেলেও দলের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী নেতার মেয়ের জামাইকে তাবিথ যেন বিএনপি ও ২০ দলের মনোনয়ন পায় তার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করেছিল দলটি। ফলে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিএনপি ও ২০ দলের পক্ষ থেকে দলের কর্মী তাবিথকেই প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেন। জানা গেছে, বিএনপি ও ২০ দল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করলেও লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড ও সুষ্ঠু-অবাধ-নিরপেক্ষ ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে চূড়ান্ত মুহূর্তে নির্বাচন বয়কট করতে পারে। এক্ষেত্রে দলের নির্দেশে তাবিথও নির্বাচনে সরে যাবেন, কিন্তু বাইরের প্রার্থী দিয়ে ঝুঁকি থাকত। তাবিথের সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে এই বিবেচনা বড় ভূমিকা রেখেছে। তাবিথের হলফানামা : ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, তার বার্ষিক আয় এক কোটি ৬০ লাখ টাকা। হলফনামা থেকে দেখা গেছে, তাবিথের শিক্ষাগত যোগ্যতা এমএসসি ইন ইনফরমেশন সিস্টেম টেকনোলজি। তার জন্ম তারিখ ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯। তার নামে অতীতে কোনো ফৌজদারি মামলা ছিল না এবং বর্তমানেও নেই। তাবিথের নামে দুই দশমিক ৩৪ একর কৃষিজমি ও ১৫ দশমিক ৭৯ একর অকৃষি জমি ছাড়াও রয়েছে এক কোটি ৪৭ লাখ ৮২ হাজার ৩৩২ টাকার স্থাবর সম্পদ। তবে তার স্ত্রী বা অন্য কোনো নির্ভরশীলের নামে কোনো স্থাবর সম্পদ নেই। তাবিথের নিজ নামে রয়েছে ৩১ কোটি ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৪৫৩ টাকার অস্থাবর সম্পদ। আর তার স্ত্রীর নামে ৬০ ভরি স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু এবং পাথর নির্মিত অলঙ্কারাদি ছাড়াও রয়েছে এক কোটি ৪ লাখ ৬০ হাজার ২১৯ টাকা মূল্যমানের সম্পদ। উত্তর সিটি নির্বাচন রহস্য ও তাবিথ বিরোধী প্রচারণা : ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতি গতিপথ নির্দেশিত হয়ে যাবে। এই নির্বাচনের নির্দিষ্ট ফলাফলের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই সিভিকো-কর্পোরেট-মিলিটারি সম্পর্কের প্রাতিষ্ঠানিকতা নির্ধারিত হয়ে যেতে পারে। যদিও আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজে) ক্ষমতা কাঠামোর বাইরে ছিটকে পড়া বিরোধী দল বিএনপিকে সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার অংশীদার করার মধ্য দিয়ে চলমান রাজনৈতিক সমাধান পথ খোলার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু এ পরামর্শকে এড়িয়ে অসমতল মাঠ ও বৈরি পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে কার্যত সংসদে বিরোধী দলহীন সরকার নাগরিক পরিসরেও এক তরফা ক্ষমতা গঠন করতে চাচ্ছে। আর এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই ঢাকা উত্তরে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে পদ্ধতিগত কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। আবার এই কৌশলে ফল হিসেবে মিন্টুর প্রার্থীতা বাতিল হয়ে যাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত ধরে নিয়ে আগাম অপপ্রচার চালানো হয়েছে। পূর্বাপর কোনো ঘটনাকে সামনে না এনেই সন্দেহ-সংশয় ছড়ানো হয়েছে মিন্টু সরকারের সাথে আঁতাত করে ছেলেকে বিএনিপর প্রার্থী করে সরকার দলীয় প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করার চক্রান্ত করছেন। আর এতে অনেকটাই চেপে যাওয়া হয় ঢাকা উত্তর সিটিতে বিএনপি ও ২০ দলের লাখ লাখ ভোটার থাকা সত্ত্বেও বাইরের ভোটারকে দিয়ে প্রার্থীতা সমর্থন করানোর অভিযোগে মনোনয়ন বাতিল করা কত তুচ্ছ ব্যাপার। যেখানে রাজউকের উত্তরা মডেল টাউনের ১৩ নং সেক্টরকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের অংশ নয় বলে মিন্টুকে সমর্থনকারী আবদুর রাজ্জাককে বাইরের ভোটার সাব্যস্ত করা হয়েছে। কিন্তু উত্তরা মডেল টাউনের ১৩ নং সেক্টর সিটির ১নং ওয়ার্ডের অংশ এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের কর বিভাগ ১৩ নং সেক্টরের বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে হোল্ডিং ট্যাক্স গ্রহণ করে থাকে। বাস্তবতা এমন হওয়া সত্ত্বেও যেখানে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে করা আপিলেই মিন্টুর প্রার্থীতা ফেরার কথা সেখানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে গিয়েও ফল পাননি তিনি। এ অবস্থায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে মাহী বি চৌধুরী মেয়র প্রার্থী হিসেব সমর্থন পাবেন ধরে নিয়ে তাবিথের বিরুদ্ধেও ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। এর মধ্যে বিএনপির রাজনীতির কেউ নয় বলার পাশাপাশি এ কথাও প্রচার করা হয় তাবিথ আউয়াল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর মেয়ের জামাই। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গওহরের মেয়ে বারোলো রিজভীর সাথে তাবিথের নয় তার ছোট ভাই তাফসির আউয়ালের বিয়ে হয়েছে। ২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর সম্পন্ন ওই বিয়ের খবর সংবাদমাধ্যমেও প্রচারিত হয়েছে। কিন্তু তাবিথকে গওহরের মেয়ের জামাই বলা হয়েছে যেন বিএনপি কর্মী হওয়া সত্ত্বেও তাকে আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সূত্র : শীর্ষ নিউজ ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*