টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে নির্ভরশীল তরুণ যুবাদের কর্ম প্রাপ্তি

মো. আবুল হাসান, সভাপতি ও খন রঞ্জন রায়, ২১ ডিসেম্বর, বুধবার: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বিশ্বজুড়ে গরিবী হটাতে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ৭০ তম অধিবেশনে হাতে নিয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৯৩ দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান পনেরো বছর মেয়াদি ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করেন জাতিসংঘ সদর দফতরে। বিপুল করতালি আর হর্ষধ্বনির মধ্য দিয়ে গৃহীত হয় ১৬৯ টি উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। এসব লক্ষ্য আর লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে তা মাপার জন্য নেয়া হয় ৩০৪টি সূচক।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বৈশ্বিক উন্নয়নের একটি নতুন এজেন্ডা। ২০৩০ সালের মধ্যে একটি টেকসই বিশ্ব গড়ার এক উচ্চাভিলাষী বৈশ্বিক লক্ষ্য। আামাদের বসবাসের এই পৃথিবীটাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগী করে গড়ে তুলাই এর লক্ষ্য। বিগত সময়ে বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মানুষের জীবন মানের উন্নয়নে এমডিজি’ তথা সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা ও তা বাস্তবায়নের পথ নির্দেশনা দিয়েছিল। বাংলাদেশ নির্ধারিত সময়ের আগেই এমডিজির সব কটি এজেন্ডা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করে জাতিসংঘসহ বিশ্ব পরিমণ্ডলে প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এখন উন্নয়নের সাথে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। শুধু উন্নয়ন হলেই চলবে না তা হতে হবে টেকসই তথা সাসটেইনেবল।
দুভার্গ্যরে বিষয় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে সূচকের তলানিতে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। এ অঞ্চলের দেশগুলোর মতো বাংলাদেশও রয়েছে তালিকার পেছনের সারিতেই। তালিকায় থাকা ১৪৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৮। এসডিজির এক বছর পূর্তিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অগ্রগতির হালনাগাদ চিত্র তুলে ধরে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
তালিকার শীর্ষ ১০টি দেশই ইউরোপের। এগুলো হলো- সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, অষ্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য। এশিয়ার দেশ জাপান রয়েছে তালিকার ১৮ নম্বরে। এর পরের অবস্থানটি সিঙ্গাপুরের। তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ২৫ তম যেখানে রাশিয়া ও চীন রয়েছে ৪৭ ও ৭৬ তম অবস্থানে। এ তালিকার তলানিতে অবস্থান আফ্রিকার দেশ সেন্ট্রাল আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের। ১১০তম অবস্থান নিয়ে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে এগিয়ে আছে ভারত। এর পরই রয়েছে পাকিস্তান (১১৫), মিয়ানমার (১১৭), বাংলাদেশ (১১৮) ও আফগানিস্তান (১৩৯)। তালিকার শীর্ষে থাকা সুইডেনও এক্ষেত্রে কোনো উন্নতি করতে পারেনি। এই উচ্চভিলাষী লক্ষ্য অর্জনে জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনে প্রতিটি অঞ্চলের প্রধান সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে উন্নত দেশগুলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ সুরক্ষার সমস্যায় জর্জরিত। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দেশগুলোর মধ্যে অসমতা চরম পর্যায়ে বিরাজ করছে।
বিশ্বের প্রতিটি দেশ আজ প্রতিযোগিতা মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা আর্ন্তজাতিক অর্থবাজার পরস্পরবিরোধী চাপের মধ্যে অবস্থান করছে। এর মধ্যে শক্তিশালী প্রযুক্তি দক্ষ শ্রমবাজার, ভোগ্যপণ্যের দরপতন এবং সুদের হার কমানোর অব্যাহত চাপ অন্যতম। আমাদের সরকারি মহল থেকে বলা হচ্ছে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এটি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু তারপরও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন শুরু হতে সবমিলিয়ে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ম্যাপিং করা, অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতেই চলে যাবে এ সময়।
এসডিজির ১৭টি অভীষ্ট হচ্ছে, দারিদ্র্য বিলোপ, ক্ষুধামুক্তি, সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, গুণগত শিক্ষা, নারী পুরুষের সমতা বিধান, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের নিশ্চয়তা, সকলের জন্য সাশ্রয়ী ও দূষণমুক্ত জ্বালানির ব্যবস্থা করা, যথাযোগ্য কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্প উদ্ভাবন ও অবকাঠামো, অসমতা তথা বৈষম্য হ্রাসকরণ, টেকসই নগর ও সমাজ উন্নয়ন ইত্যাদি। প্রযুক্তির এই যুগে প্রায় প্রতিটি মানুষ, দেশ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন চাহিদায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ভোগবাদিতার পাশাপাশি বিলাসিতা আয়েস প্রভৃতিতেও এসেছে বৈচিত্র্য। এটি শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই নয়, প্রযোজ্য পুরো বিশ্বের জন্যই। তাছাড়া এই আয়েসি জীবন ও ভোগবাদী জীবনে এখন বড় বাধা ও আতংকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জঙ্গিবাস, সন্ত্রাসবাদ, মাদক, মানব পাচার প্রভৃতি। এসব মোকাবিলা করাটাও প্রতিটি দেশ ও জনগণের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠেছে। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীকে এসব মোকাবিলার পাশাপাশি বৈশ্বিক উন্নয়ন চাহিদা পূরণে কাজ করে যেতে হচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এসব মোকাবিলা করেই বাংলাদেশ জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে পরিকল্পিতভাবে অগ্রগামী হতে হবে।
আমাদের প্রত্যাশা থাকবে এসডিজি বাস্তবায়নে গৃহীত কর্মপরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারি ডিপ্লোমা প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা চেতনা প্রণয়ন করা। কারণ বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও সমস্যাসংকুল দেশে জমি, সম্পদ, সময় প্রভৃতি বিবেচনায় নিয়েই উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি। এক্ষেত্রে মানব সম্পদকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে। এসডিজি বাস্তবায়নে যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বাংলাদেশে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৪ কোটি ৮০ লাখ তরুণ-তরুণী আছেন। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪ কোটি ৩৪ লাখ। এটা পৃথিবীর অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। জনসংখ্যার সুবিধা (পপুলেশন ডিভিডেন্ড) পেতে হলে যুবসমাজের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। শ্রমশক্তিতে থাকা তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ ডিপ্লোমা শিক্ষার অভাবে কোন কাজই করতে পারে না।
টেকসই উৎপাদনব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জানিয়েছে বাংলাদেশে বড় বড় শিল্পকারখানা হচ্ছে। কিন্তু এসব কারখানার জন্য দক্ষ শ্রমিক তৈরি করা যাচ্ছে না। সেখানে বিদেশিরা চাকরি করছেন। দেশি শ্রমিক দিয়ে এ শূন্যতা কীভাবে পূরণ করা হবে, এর পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। জাতিসংঘের ইয়ুথ অ্যাডভাইজারি কাউন্সিলের হিসাব মতে এখন যারা শৈশব বা কৈশোর পার করছে, তারা ২০২৫ সালে যুবশক্তি হবে। তাই স্কুল পর্যায়ে শিক্ষা সমাপনান্তে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে। শিক্ষার আসল ও মর্মকথা হল সুদক্ষ ও দক্ষ কাঠামোগত লোক নির্মাণ করা। শিক্ষা কেবল মাত্র অক্ষর জ্ঞানের মধ্যম হিসাবে গণ্য করলে হয় না। প্রাথমিক মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের যদি তারে যোগ্যতা অনুযায়ী কোনো না কোনো কাজে আত্মনিয়োগ করানো যায় তবেই সেটা মানবসম্পদ সৃষ্টির জন্য বীজ বপন করার সামিল একটি কাজ হবে।
এ বিশ্বেই আমাদের বসবাস এবং এখানেই আমাদের বসবাস করতে হবে। সুতরাং আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই এ বিশ্বকে বসবাসের উপযোগী রাখতে হবে। সমৃদ্ধ করতে হবে অর্থনৈতিক কাঠামো মানুষকে পরিণত করতে হবে সম্পদে। মেধা নির্ভর অর্থনীতির আমলে তরুণ যুবদের মেধা বিকাশ ও কর্মনির্ভর করার শিক্ষাই হলো প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা। আমাদের মোট শিক্ষার্থীর ৪০/৫০ শতাংশকে প্রযুক্তিগত দক্ষ ডিপ্লোমা জনশক্তিতে পরিণত করার সিদ্ধান্তই এসডিজি বাস্তবায়নের বুদ্ধিদীপ্ত প্রাথমিক পদক্ষেপ। লেখক: সভাপতি ও মহাসচিব ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ। Khanaranjanroy@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*