টেকসই উন্নয়নে ডিপ্লোমা শিক্ষার গুরুত্ব

মো. আবুল হাসান, খন রঞ্জন রায়: ১৯৪৫ সালে ভয়ংকর এক যুদ্ধের বিভীষিকাকে ধারণ করে জন্ম নিয়েছিল আজকের জাতিসংঘ-ইউনাইটেড নেশনস বা ইউএন। পৃথিবীর জাতিতে জাতিতে সন্দেহ, বিদ্বেষ, অনাস্থা, অবিশ্বাস, অসহিষ্ণুতা, অসহমর্মিতা যখন তছনছ করে দিচ্ছিল মানবসভ্যতাকে-মানবতাকে, তখন অত্যন্ত সুদূরপ্রসারি চেতনার সংঘবদ্ধ ধারণা নিয়ে জাতিসংঘের জন্মলাভ। dip
ক্ষুধার্ত পৃথিবীর ক্ষুধা নিবারণে, যুদ্ধবাজ জাতিসমূহে অশান্তি ও অস্থিরতাকে অবদমন করতে, আঞ্চলিক বিরোধ নিষ্পত্তি করতে, নিরলসভাবে কাজ করেছে গত শতাব্দীজুড়ে জাতিসংঘ। সত্তর বছরের জাতিসংঘ পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অনন্য ভূমিকা রেখে যাচ্ছে।
উত্তর থেকে দক্ষিণে-পূর্ব থেকে পশ্চিমে, পৃথিবীর যেখানে সংকট ঘনীভূত হয়েছে, জাতিসংঘ এগিয়ে এসেছে, কথা বলেছে, নিন্দা বা প্রতিবাদ করেছে, নাড়া দিয়েছে, তাড়না দিয়েছে, সংকটের সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সফল না হতে পারলেও প্রচেষ্টার সম্ভাবনাকে মিলিয়ে যেতে দেয়নি। যেখানে জাতিসংঘকে অসহায়ের ভূমিকায় দেখা গেছে সেখানে মানুষের বিবেক জাগ্রত হয়েছে। মানুষ কথা বলেছে। নিপীড়কদের নিন্দা জানিয়েছে। এখানেও জাতিসংঘ প্রকারান্তরে সার্থক হয়েছে।
সময়ের সাথে পৃথিবীতে রাষ্ট্রব্যবস্থায় এবং রাষ্ট্র রাজনীতির পরিবর্তন হয়েছে। এখানে অভিযোজন, ভূ-রাজনৈতিক সামাজিক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বে জনসংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন সূচকে পৃথিবীর দেশেদেশে পরিবর্তন এসেছে। পৃথিবীর মেরুদণ্ডেরও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পৃথিবীর দেশ ও সমাজ মনে করে শক্তিশালী জাতিসংঘ পারে উৎকৃষ্ট পৃথিবী উপহার দিতে। এজন্যই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার আহ্বান ইউএন চার্টারে। এই চাটারতৈরি করেন বিশ্বের ৪৯ জন খ্যাতিমান রোটারিয়ান।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জাতিসংঘের ভূমিকা এদেশের জনগণ চিরদিন স্মরণ রাখবে। ২০১৫ পরবর্তী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে জাতিসংঘের গেল সম্মেলন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা গৃহিত হয়। জাতিসংঘের এই টেকসই উন্নয়ন সম্মেলন ২০১৫ এ প্রায় তিন বছর ধরে পরিচালিত আলোচনা ও সমঝোতা-প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত অর্জনগুলো তুলে ধরা হয়। এসব আলোচনায় বহু ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সংগঠন ও সরকার অংশ নিয়েছিল।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ শীর্ষক দলিলের বর্তমান সংস্করণটি একটি সর্বজনীন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের আহ্বান জানায় এতে ‘জনগণ, উন্নয়ন ও পৃথিবী’ এই তিনটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োগের জন্য বৈশ্বিক অংশীদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
বিশ্বজুড়ে এমডিজি বা সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা উন্নয়ন সফলভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। এসডিজি বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সতেরটি লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে নতুন কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন ও ক্ষুধামুক্তিকে যেখানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এমডিজির গতানুগতিক পন্থায় এসডিজি অর্জন সম্ভব নয়, চাই বিজ্ঞানমনঙ্ক মানবসম্পদ।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাপি প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল সৃস্টির নিরন্তর চেষ্টা হচ্ছে। বিশ্বসমাজের উপযোগী শিক্ষা কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের ভাবনার অন্ত নেই। ভবিষ্যতের বিশ্ব কেমন হবে তা নির্ভর করবে আজকের তরুণ ও যুবসমাজের ওপর। এদের কর্মকেন্দ্রীক শিক্ষায় যদি গলদ থেকে যায় তবে ভবিষ্যত মানবসভ্যতা সংকটের মধ্যে পড়বে। এ কারণেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ডিপ্লোমা শিক্ষা।
জাতিসংঘ ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলো গত দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ডিপ্লোমা শিক্ষার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরার পাশাপাশি গুণগুত ডিপ্লোমা শিক্ষা অর্জনের জন্য নানা ধরনের সুপারিশও করা হয়েছে। ওঠে এসেছে নানা অসংগতির চিত্র। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিক্ষকের সংখ্যা ও শিক্ষাদানে কাক্সিক্ষত মানের ঘাটতি। আছে শিক্ষার পরিবেশের ঘাটতিও। প্রতিবেদন অনুযায়ী দ্রুত কমপক্ষে আরো ৫০ শতাংশ মানসম্পন্ন শিক্ষক অর্ন্তভুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের মানোন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। ডিপ্লোমা শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত মানমর্যাদা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্দ্যোগ গ্রহণ। তৃণমূলে এই শিক্ষা প্রসারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা এবং জাতীয়ভাবে একটি অভিন্ন শপথনামা করানোর উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস। গেলবার প্রথমবারের মতো এই দিবস পালন করার প্রস্তুতির সময় ব্যাপক সাড়া পরে। দেশে প্রায় শতাধিক সংগঠন ও ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এক যোগে পালন করা হয় এই দিবস। এবার ২য় বারের মতো পালন করতে গিয়ে ভাবনার স্ফূরণ লক্ষ্য করি। বাংলাদেশের একুশে ফেব্র“য়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে প্রতিষ্ঠার ন্যায় জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবসও বিশ্বব্যাপি পালনের রূপ লাভ করবে নিকট ভবিষ্যতে এই স্বপ্নযাত্রার অংশিদার হচ্ছি।
‘টেকসই উন্নয়নে ডিপ্লোমা শিক্ষা’ প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে যখন ২য় বারের মতো জাতীয় ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবস পালন করছি তখন আমরা আশা করছি আগামী ১৫ বছরে এসডিজি যখন বাস্তবায়িত হবে, তার মধ্যে তরুণ শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর আকার ও চাহিদা বাড়তে থাকবে। এই বর্ধিত চাপের কারণেই আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও বেশি গতিশীল, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক হতে বাধ্য হবে। তখনই ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবসের সার্থকতার রূপ পরিগ্রহ হবে।
ডিপ্লোমা শিক্ষা দিবসের চেতনায় ভরে যাক আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী। বিশ্ব শান্তির নতুন দ্বার উন্মোচন হোক এই দিবসের নতুন আলোয়।
লেখক: মো. আবুল হাসান, সভাপতি, খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব, ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।

Leave a Reply

%d bloggers like this: