জয়পুরহাটে সরব হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গন

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ৩ মে ২০১৭, বুধবার: ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে আন্দোলন-সংগ্রামে ব্যর্থ বিএনপি পরবর্তী সময়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়লে জয়পুরহাটের রাজনীতির মাঠ একতরফা হয়ে পড়ে। তবে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে একটু একটু করে সরব হচ্ছে জেলা রাজনৈতিক অঙ্গন।
একই সঙ্গে বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে কোন্দল আর বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। জাতীয় পার্টি ও জাসদ নিজেদের গোছানোর চেষ্টা করছে। জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থা এখানে খুবই নাজুক।
আওয়ামী লীগ
জয়পুরহাট জেলা আওয়ামী লীগ এখন দুই ভাগে বিভক্ত। অন্তঃকোন্দল প্রকাশ্যে আসে জেলা পরিষদ নির্বাচন থেকে। একে অপরকে দোষারোপ, ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপে মিটিং-সমাবেশ এখন জয়পুরহাটে ওপেন সিক্রেট।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিবদমান দুই পক্ষের একদিকে আছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপির অনুসারীরা। অন্যপক্ষে রয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামছুল আলম দুদু এমপি ও সাধারণ সম্পাদক এস এম সোলায়মান আলীর অনুসারীরা। তারা জেলার প্রায় সব উপজেলায় প্রকাশ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
এই বিরোধের পেছনে নাশকতার মামলার আসামি বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের আওয়ামী লীগে যোগদানের ভূমিকাও দেখছেন নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, নাশকতা মামলার আসামিরা আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে আওয়ামী লীগের পুরনো ও ত্যাগী, দুঃসময়ের নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে ফেলেছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মূল্য দিতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
দলীয় কোন্দলের জের পড়ছে স্থানীয় নির্বাচনে। গত ১৬ এপ্রিল জয়পুরহাট ক্ষেতলাল উপজেলায় তুলশীঙ্গা ও বড়তারা ইউপি নির্বাচনের একটিতে দলীয় কোন্দলের কারণে জিতে যায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। আগামী ২৩ মে ক্ষেতলাল পৌরসভার নির্বাচনে ভোট গ্রহণ। এখানে দলীয় প্রতীক নৌকা পেয়েছেন ক্ষেতলাল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম সরদার। কিন্তু জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সিরাজুল ইসলাম বুলু স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
দলের বিরোধ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট শামসুল আলম দুদু এমপি বলেন, মূলত দলের মধ্যে কোনো কোন্দল নেই। কিন্তু কেন্দ্রীয় এক নেতার অনুসারীরা জেলা আওয়ামী লীগের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি করেছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম সোলায়মান আলী বলেন, আট-দশজন মিলে জেলা আওয়ামী লীগে গ্রুপিং করছে। তবে কিছু দিনের মধ্যেই এসব সমস্যার সমাধান হবে। জেলা আওয়ামী লীগ এখন আগের চেয়ে সাংগঠনিকভাবে অনেক শক্তিশালী।
জয়পুরহাট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আরিফুর রহমান রকেট বলেন, যারা এই কোন্দল করছে তারা আওয়ামী লীগের বাইরের নয়। তবে দ্বন্দ্বটা কারো কারো ব্যক্তিগত হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, দলের সভানেত্রীর সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী দলের শৃঙ্খলা মেনে সবাইকে চলতে হবে।
দলে যে কোন্দল চলছে তা অস্বীকার করছেন নাপ কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপি। তিনি  বলেন, ‘একটি বড় পরিবারের মধ্যে অনেক সন্তান থাকে, বসবাস করতে গেলে অনেক কোন্দল সৃষ্টি হয়। সে রকমই হয়েছে। তবে জয়পুরহাটের কোন্দল বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক ও খালিদ মাহমুদ চৌধুরী শিগগিরই কোন্দল নিরসনে ব্যবস্থা নেবেন।’
বিএনপি
জেলা কমিটি গঠনের পর থেকে বিএনপির গ্রুপিং চরমে। জেলা বিএনপির অফিস পোড়ানো এবং কেন্দ্রীয় বিএনপির দুই নেতা সাবেক এমপিসহ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে জেলা ছাত্রদলের নেতার মামলা, পরস্পরের  পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে কুশপুত্তলিকা দাহ, মিছিল-মিটিং-সমাবেশ, নিজেদের মধ্যে সবই হয়েছে। এখনো চলছে দুই পক্ষের কোন্দল।
জয়পুরহাট বিএনপিতে কোন্দল আগে থেকে ছিল বটে, তবে তা চরমে ওঠে তৃণমূলের অপছন্দের ব্যক্তিকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করার পর। একসময় বিএনপি-জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত জয়পুরহাট জেলায় এখন জোটের সাংগঠনিক অবস্থা অতি নাজুক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নেতাকর্মী অভিযোগ করেন, দলের দুঃসময়ের ত্যাগী নেতাকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বানানো হয়নি। সদ্যঘোষিত জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বর্তমান সভাপতি দ্বারা আট বছর আগে বহিষ্কৃত ও সংস্কারপন্থী।
জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি মোজাহার আলী প্রধান বলেন, যারা এসব গ্রুপিং করছে তারা জিয়া ও বিএনপির আদর্শ মানে না। তাদের সঙ্গে দলের তেমন কেউ নেই। তারা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাফিজুর রহমান পলাশকে দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে মেনে নিতে চায় না। এ জন্য এসব সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
জেলা বিএনপির সহসভাপতি সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা বলেন, জেলা বিএনপির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাফিজুর রহমান পলাশ বিগত সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন না। সংস্কারপন্থী ও দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বর্তমান সভাপতি তাকে আট বছর আগে বহিষ্কার করেছিলেন। তাই এসব কোন্দল দেখা দিচ্ছে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নাফিজুর রহমান পলাশ বলেন, ‘আমি রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলাম না। গত কমিটিতে জেলা বিএনপির সদস্য, তার আগে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক, জেলা যুবদলের আহ্বায়ক, জয়পুরহাট সরকারি কলেজের ভিপি ছিলাম। আমি সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দলের কাজ করতে চাই।’
অন্যান্য দল
জাতীয় পার্টির নতুন জেলা কমিটি গঠন হলেও সাংগঠনিক তেমন কোনো তৎপরতা নেই। জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি হেলাল উদ্দীন বলেন, ‘আমরা জয়পুরহাটে নতুনভাবে দলের উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড কমিটি করে সাংগঠনিকভাবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
জামায়াতের বেশির ভাগ নেতা-কর্মী-সমর্থকই ২০১৩-২০১৪ সালের বিভিন্ন সময়ে নাশকতা, জ্বালাও-পোড়াও মামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত। কেন্দ্রীয় নেতাদের যুদ্ধাপরাধ মামলায় ফাঁসি ও সাজা হওয়ায় জামায়াতের সাংগঠনিক অবস্থা একেবারে স্থবির।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (ইনু) আগের চেয়ে জয়পুরহাটের সাংগঠনিক অবস্থা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ ব্যাপারে জেলা জাসদের
সাধারণ সম্পাদক আমেজ উদ্দীন বলেন, ‘বর্তমানে আগের চেয়ে আমাদের সাংগঠনিক অবস্থা অনেক ভালো। জেলা, উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন কমিটি করা হয়েছে। আমরা সরকারে থেকে তেমন কোনো সহযোগিতা পাই না এবং আমরা সরকারের সমালোচনাও করতে পারি না।’
অন্যান্য দল ওয়ার্কার্স পার্টি, বাসদ, কমিউনিস্ট পার্টিসহ ছোট দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম আগের মতোই ঢিলেঢালা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*