জাবি রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন কাল

শেখ আদনান ফাহাদ, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৭, শুক্রবার: আগামীকাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন। উনিশ বছর পর বহুল আলোচিত এবং কাঙ্ক্ষিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জাকসু থাকলে ছাত্র-ছাত্রীদের সরাসরি অংশগ্রহণ থাকত সিনেটে। রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট নির্বাচন এর তাৎপর্য তাই সুদূরপ্রসারী। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাই এখানে নির্বাচন করে, তবে সাবেক হওয়ার পরে। ছাত্রজীবনে নিজেদের জীবন থেকে ক্যাম্পাসের সুখ-দুঃখ খুব কাছ থেকে দেখেছেন এই প্রার্থীরা। নিজেরাই ভালো বলতে পারবেন এই ক্যাম্পাসের সমস্যা ও সম্ভাবনার দিকগুলো। অনেক ক্যাম্পেইন, এন্টি-ক্যাম্পেইন হল। ২৫ জন বিজয়ীর নাম জানতে আর ২৪ ঘণ্টার সামান্য কিছু বেশি সময়ের অপেক্ষা। এখন প্রশ্ন হল, নির্বাচিত হওয়ার পর এই ২৫ জন কী করবেন? অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কী করবেন?
সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধি আছেন, সরকারি প্রতিনিধি আছেন। সাথে যোগ হবেন এই ২৫ জন সাবেক শিক্ষার্থী। নির্বাচিত হওয়ার পর কী এই উচ্চশিক্ষিত, যোগ্য মানুষগুলো নিজের কাজের প্রতি, দায়িত্বের প্রতি এত আন্তরিক থাকবেন, যতখানি আন্তরিকতা প্রচারণাকালে প্রদর্শন করছেন? আমরা আশা করি, নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ভালো হবে এমন সব কাজ করবেন। সিনেটরদের কাজ খুব বেশি না। প্রধানত বাজেট পাশ হয় সিনেটে। আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাঁরা করেন। ভিসি প্যানেল নির্বাচন করেন তাঁরা, যেখান থেকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে ভিসি নিয়োগ দেন। ভিসি নিয়োগ প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল তাঁদের সুযোগ-সুবিধা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ ছাত্র-ছাত্রীরাই। ছাত্র-ছাত্রীরা ভালো থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় ভালো থাকবে। ছাত্র-ছাত্রীরা একটু ভালো ও বড় লাইব্রেরি চায়, হলে গিয়ে আরাম করে ঘুমাতে চায়, একটু সস্তায় স্বাস্থ্যকর খাবার পেতে চায়, ঢাকায় যাওয়া-আসা করার সময় বাসে একটা সিট চায় (যারা দরজায় ঝুলতে ঝুলতে যাওয়া-আসা করে মজা পায় তাদের কথা ভিন্ন), পর্যাপ্ত খেলার মাঠ চায়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চায়, বিভাগের স্বাভাবিক কার্যক্রম চায়। যে ছাত্র/ছাত্রীর পা নেই বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকে, সে হয়ত মনে মনে একটু অবকাঠামোগত সুবিধা চায়। ছাত্র-ছাত্রীরা পড়ালেখার পরিবেশের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সেবা চায়। এগুলো ঠিক থাকলে, একজন ছাত্র/ছাত্রী নিজেদের মেধা ও পরিশ্রম কাজে লাগিয়ে বিশ্ব জয় করতে পারে। তাই আমি সিনেটরদের কাছে আগাম কিছু দাবি জানিয়ে রাখতে চাই। বাজেট সবকিছুর নিয়ামক। কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় হবে, সেটি বাজেটের মাধ্যেম নির্ধারিত হয়। এখানে সিনেটরগণ রাখতে পারেন যুগান্তকারী ভূমিকা। নিয়মিত বাজেটে না পেরে উঠলে, সরকার থেকে বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ এনে বড় কাজগুলো সম্পাদন করতে হবে।
১। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চরিত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য হলে একটা সিট নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য সময় লাগবে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে হিসেব করে এক সাথে একাধিক হলের কাজ ধরলে, সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ হয়ে যাবে। ছেলেদের হলের সংখ্যা দ্রুত বাড়াতে হবে। মেয়েরা একটু রাগ করলেও বলতে হবে আমাকে। ক্যাম্পাসে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা তুলনামূলক বেশি কষ্টে হল জীবন কাটায়। বিশেষ করে প্রথম বর্ষে ছেলেদের দিকে তাকানো যায় না। গণরুমে একটা ছেলে যে পরিবেশে থাকে, তাতে সে যে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায় না, সেটি আমি অবাক হয়ে ভাবি। একটা জরিপ করলেই বিষয়টা ক্লিয়ার হবে। প্রথম বর্ষের পরীক্ষার রেজাল্টগুলো জরিপ করলেই পরিস্থিতি পরিষ্কার হবে। দেখা যাবে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের রেজাল্ট ভালো হচ্ছে। কারণ ছেলেরা রাতে শান্তিতে হলে ঘুমাতে পারেনা। এর অন্যতম কারণ সিট না থাকা। মেয়েদের জন্যও দরকার হলে আরও হল নির্মাণ করতে হবে।
২। ছেলেদের নতুন হল নির্মাণ করা হলে নামকরণ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে হবে। আমাদের রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে প্রাসঙ্গিক ব্যক্তিত্বদের নামে হল নির্মাণ করতে হবে। যেমন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠতম সহচর তাজউদ্দিন আহমদ, কবি জসিমউদ্দিনদের মত ব্যক্তিত্বদের নামে হল হওয়া জরুরী। বীরশ্রেষ্ঠ সাতজনের নামেও হল হতে পারে। যেমন ভাষা-বীরদের নামে (রফিক-জব্বার, সালাম-বরকত) হল আছে।
৩। পুরনো এবং নতুন হলগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বড় বড় লাইব্রেরি, স্টাডিরুম নির্মাণ করতে হবে। খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে হবে।
৪। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য পরিবহন সুবিধা প্রয়োজনমত বাড়াতে হবে। বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দিয়ে শুধু ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ব্যবহৃত হবে এমন বেশ কয়েকটি বাস কিনে ফেলতে হবে। কয়টি বাস কিনলে বা বানালে, সমস্যা দূর হবে সেটি হিসেব করে বের করতে হবে।
৫। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বৃত্তির পরিমাণ বাড়াতে হবে। সরকার যদি টাকা বাড়াতে না চায়, তখন বিশেষ বরাদ্দ এনে ব্যাংকে ফান্ড হিসেবে জমা রেখে এর সুদ দিয়েই ছাত্র-ছাত্রীদের, বিশেষ করে দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। মেধাবী ও দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের আলাদা লিস্ট করে বৃত্তি দিতে হবে। অনেক মেধাবী আছে, যার বৃত্তির দরকার নেই, আবার অনেক দরিদ্র আছে যারা উচ্চ পর্যায়ের মেধাবী নাও হতে পারে। আবার অনেক দরিদ্র আছে যারা খুবই মেধাবী। অর্থাৎ দরকার এবং কারণ অনুযায়ী যেন ছাত্র-ছাত্রীরা বৃত্তি পায় সেদিকে খেয়াল রেখে বেশি অংকের বৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যে বৃত্তি বর্তমানে দেয়া হয়, খুবই হাস্যকর। বৃত্তি ফর্মে শিক্ষক হিসেবে সাইন করার সময় পরিমাণ দেখে আমার হাসি পায়, দুঃখও লাগে।
৬। একাডেমিক অবকাঠামো বাড়াতে হবে। নতুন বিভাগ খোলার আগে পর্যাপ্ত ক্লাসরুম, শিক্ষকদের অফিস, সেমিনাররুম, লাইব্রেরি, বই ইত্যাদি নিশ্চিত করেই তবে বিভাগ খুলতে হবে।
৭। জনগণের কর ও খাজনার টাকায় আমাদের বাজেট হয়। জনগণের টাকা দিয়ে যেন কোনো প্রকৌশলী বা ঠিকাদারের পকেট আর ব্যাংক ব্যাল্যান্স ভারী না হয়, সেদিকে সিনেটরদের কড়া নজর রাখতে হবে। ভবনগুলোর মান খুব নিম্ন পর্যায়ের। ভবনগুলোর দিকে তাকালে, কক্ষগুলোর দিকে মনোনিবেশ করলেই নিম্নমানের দিকটি সবার কাছে ক্লিয়ার হবে। একদিকে ভবন নির্মিত হয়, অন্যদিকে দেয়াল খসে খসে পড়ে, ড্যাম হয়ে যায়। নবনির্মিত প্রতিটি ভবন ঘুরে দেখলে সাংবাদিক এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসন আমার কথার প্রমাণ পাবেন।
৮। ভবনগুলোতে লিফটের ব্যবস্থা করতে হবে। সবার জন্য না পারলে শারীরিকভাবে সমস্যাযুক্ত ছেলে-মেয়েদের জন্য লিফটের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ এই লিফটে বয়স্ক শিক্ষক-শিক্ষিকারাও উঠা-নামা করতে পারবেন।
৮। আল-বেরুনি হল আর বঙ্গবন্ধু হলের মাঠ সংস্কার করতে বিশেষ বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে। একটা আধুনিক জিমনেশিয়াম ও সুইমিংপুল স্থাপন করতে হবে।
৯। ক্যাম্পাসের জীব-বৈচিত্র্য রক্ষায় বিশেষ মনোযোগ দিতে প্রশাসনকে বাধ্য করতে হবে। আগামী বছর যেন অতিথি পাখি এসে বিরক্ত হয়ে অসময়ে চলে না যায়, সে জন্য এখন থেকেই ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে চাপ দিতে হবে।
১০। বিশেষ কারণ ছাড়া, বাইরের কেউ গাড়ি নিয়ে ক্যাম্পাসে আসলে, লেক থেকে অনেক দূরে নির্দিষ্ট স্থানে গাড়ি পার্ক করতে হবে। যে পাখি দেখতে আসবে, সে হেঁটে যাবে, সেখানে গিয়ে হৈ-চৈ করতে পারবে না মর্মে নিয়ম করে বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু অতিথি পাখি, স্থানীয় পাখি এবং অন্যান্য জীব-বৈচিত্র্য রক্ষার জন্য একটা ছোট আলাদা বাহিনী তৈরি করা যেতে পারে। শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সকলের প্রতিনিধিত্ব রেখে একটি কমিটি করে এই বাহিনী তৈরি করা যায়।
১১। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, কর্মকর্তা –কর্মচারী মিলে প্রায় ২০ হাজার মানুষ ক্যাম্পাসে বসবাস করে। আশেপাশে কয়েকটি গ্রাম আছে যেখানেও হাজার হাজার মানুষ নানা কারণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আনঅফিসিয়ালি সম্পর্কযুক্ত। এত বড় একটা কমিউনিটির জন্য বড় একটা হাসপাতাল ক্যাম্পাসে স্থাপন জরুরী হয়ে পড়েছে। এখন যে চিকিৎসা কেন্দ্র আছে, সেটি কোনোভাবেই ছাত্র-ছাত্রী এবং অন্যান্যদের স্বাস্থ্য চাহিদা মেটাতে পারছে না।
উপরের একটা দাবিও অবাস্তবায়নযোগ্য নয়। শুধু দরকার হবে ইচ্ছা শক্তি এবং আন্তরিকতার। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সিনেটরগণ রাজনীতিবিদদের মত আচরণ করবেন না। কথা দিয়ে কথা রাখবেন তাঁরা। কথা যদি নাও দিয়ে থাকেন, তাহলেও অসুবিধা নেই। সমস্যাগুলো সকলেরই জানা, সমস্যা দূরীকরণে ব্যবস্থা নিতে পারলেই ভোটারদের মূল্যবান ভোটের প্রতি সঠিক মূল্যায়ন করা হবে। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

%d bloggers like this: