জাতির পিঠে কলংকের তিলক

কামরুল হুদা : আজ এক ব্যতিক্রমধর্মী নির্বাচন প্রত্যক্ষ করলাম। এই নজীরবিহীন নির্বাচন অতীতে কেউ অবলোকন করেছে কি না বলতে পারবো না। এই নির্বাচনের মাধ্যমে একেবারে গণতন্ত্রকে চিরতরে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিদায় করেছে বলে অনেকেই মন্তব্য করেছে।f যেদিকেই যাই সরকার সমর্থকরা লাইনে দাঁড়িয়ে বুথের ভিতর সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পুলিং অফিসারের সামনে সীল মেরে বক্সে ঢুকাচ্ছে। আর বিরোধীদলের সব এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও আনসার বাহিনী ছিল নীরব দর্শকের ভূমিকায় এবং সরকার সমর্থকদের সহযোগিতায়। অন্যদিকে বিরোধী দলের অনেক জনকে ভোটের আগের দিন রাত্রে এবং কেন্দ্র থেকেও গ্রেফতার করে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। এই নির্বাচন দিয়ে এদেশের এত টাকা নষ্ট করার কি যুক্তিকতা ছিল সেই কথাও অনেকে বলাবলি করতে শুনা গেছে। যে নির্বাচন হল এই নির্বাচনের কারণে আমরা আজ ব্যর্থ রাষ্ট্রের ক্ষত-বিক্ষত নাগরিক।’ জাতির ভাগ্যাকাশে আজ জারি হয়েছে দশ নম্বর মহা বিপদ সংকেত। এ থেকে উত্তরণের উপায় ছিল একটাই। গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য একটি সর্বদল গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন। আর সেটা নির্ধারণের জন্যই অপরিহার্যভাবে প্রয়োজনীয় ছিল রাজনৈতিক সংলাপ। সে সংলাপ আহ্বানের আশা বা কথা সরকারি দল অধুনা মাঝে মাঝে দিয়ে থাকলেও, বিশেষত বিদেশিদের কাছে, আজ তাদের মনোভাব পরিষ্কারই হয়ে পড়েছে। আওয়ামী লীগ এখন সংলাপের মধ্য দিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা নির্ধারণের জন্য আন্তরিক বা আগ্রহী নয়।
অনির্বাচিত সরকার জনগণের সকল গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন পেশার মানুষ। সব অধিকার হরণ করলেও ভোটের অধিকার হরণ করা যায় না। কিন্তু এ সরকার সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকারও হরণ করেছে। আজকে গোটাদেশ অবরুদ্ধ।এটা কোন সভ্য সমাজের আচরণ হতে পারে না।
কেউ স্বাধীনতার কথা বললে হয়ে যায় রাজাকার। কাদের সিদ্দিকীর মত লোক যুদ্ধাপরাধী হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে বললেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের ভোটের অধিকার চরমভাবে হরণ করা হয়েছে। এ নির্বাচন করে মানুষের সঙ্গে ভণ্ডামী, ভাওতাবাজি করেছে আওয়ামী লীগ। এ নির্বাচনকে বিশ্ব মেনে নেয়নি। সারা বিশ্বে ছি ছি করেছে। ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের লোক পর্যন্ত ভোট দিতে যায়নি।
রাষ্ট্র এখন আর এক বিন্দুতে অঙ্কিত বৃত্ত নয়। ছোট ছোট অগোছানো রেখার আঁকা বাঁকা মানচিত্র। আমাদের কানে আজ বাজছে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রের’ মরণঘণ্টা। আমার বক্তব্য হচ্ছে, যদি আমরা বাংলাদেশে একটি সর্বদলের অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ নির্বাচন-প্রক্রিয়া সংলাপ মারফত উদ্ভাবন করতে পারতাম এবং সেভাবে নির্বাচন করে একটি দল ক্ষমতাসীন হতো, তাহলে বাংলাদেশেও অচিরেই অর্থনৈতিক স্থিরতা ও শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হতো, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পথে আমরা এক ধাপ দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারতাম। পাকিস্তান তো আমাদেরই কেয়ারটেকার ব্যবস্থা ধার করে নিয়ে তাদের দেশে তা সম্ভব করে তুলল। নেপালও তা করার চেষ্টা ও প্রস্তুতি শুরু করেছে। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনে হচ্ছে অর্থবহ সংলাপ ছেড়ে এক হিংসাত্মক সাংঘর্ষিক পথ বেছে নিচ্ছে। সভা-সমাবেশ, শোভাযাত্রার কোনো অনুমোদন দিচ্ছে না; ধরপাকড়, জোর-জুলুম, মামলা-হয়রানি শুধু চালিয়েই যাচ্ছে না, তার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে শতগুণ। দুই টেলিভিশন ও একটি জাতীয় দৈনিক বন্ধ করে দিয়েছে। সিএনএনের ক্রিস্টিন আমনপুরের ভাষায়, ‘সরকার গণমাধ্যমকে করেছে শৃঙ্খলাবদ্ধ।’ বিরুদ্ধাচরণ করলে কী করা হয় তা সাগর-রুনির ব্যাপারেই দেখা গেছে। দেশে এখন প্রবর্তিত হয়েছে স্বৈরাচারী শাসন। সরকার ‘কঠিন হস্তে’ এখন বিরোধী দলের সব গণতান্ত্রিক কার্যক্রম বন্ধ করতে চায়। গণতান্ত্রিক পরিবেশ এখন সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত। দেশের ভবিষ্যৎ আজ চরম অনিশ্চয়তার সম্মুখীন। ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হওয়ার দোরগোড়ায় আমরা।
সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সাধারণ মানুষ হত্যা করে ক্রসফায়ারের নামে মিথ্যা নাটক করছে।’ বর্তমান সংকট সমাধানের একমাত্র পথ হল আন্দোলন। আর এ আন্দোলন হবে ঘরে বসে নয় রাজপথ হবে। তাহলে বিদেশি মহল বুঝতে পারবে বাংলাদেশের সমস্যা কোথায়।
তাদের ভীষণ ভয়, যে কোনো নিরপেক্ষ, নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকার থাকলে তাদের ভরাডুবি হবে। তাই তারা যেকোনো উপায়ে দেশের সর্বস্বার্থ বিসর্জন দিয়েও ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়; জাতির ও বিশ্বের জনমত সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে সর্বদলের অংশগ্রহণের অপরিহার্যতার নীতি প্রত্যাখ্যান করে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: