জলাবদ্ধতা নিরসন ও পাহাড়ধস ঠেকাতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন: সিটি মেয়র

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৫ জুলাই ২০১৭, সোমবার: ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি), চট্টগ্রাম কেন্দ্রের উদ্যোগে সোমবার, ২৪ জুলাই ২০১৭ সন্ধ্যায় কেন্দ্রের সেমিনার কক্ষে জলাবদ্ধতা ও পাহাড় ধস বিষয়ে এক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মাননীয় মেয়র জনাব আ.জ.ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রামের ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। দিন দিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। নগরবাসী যেভাবে জলাবদ্ধতায় কষ্ট পাচ্ছে তা অবর্ণনীয়। তিনি বলেন, প্রকৌশলীরা ১৯৯৫ সালে সিডিএ প্রণীত মাস্টারপ্ল্যান ও ২০১৬ সালে ওয়াসা প্রণীত মাস্টারপ্ল্যানের কথা বলেছেন। এগুলো বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় রিভাইসড করে যদি দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে নগরবাসী রক্ষা পাবে। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়টি এখন আর সভা সেমিনারে সীমাবদ্ধ না রেখে আপনারা আপনাদের সিদ্ধান্তগুলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করার জন্য প্রকৌশলী সমাজের প্রতি আহ্বান জানান। তাহলে প্রধান মন্ত্রী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে অত্যন্ত আন্তরিক। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরনগরী ও বাণিজ্যিক রাজধানী। জলাবদ্ধতার কারণে শুধু চট্টগ্রাম নয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। যে কারণে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সমস্যা সমাধানের উপায় যথাযথভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হলে, চট্টগ্রাম জলাবদ্ধতা থেকে দ্রুত রেহাই পাবে। মেয়র বলেন, আজকের বাস্তবতা হচ্ছে কত দ্রুত নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার হাত থেকে মুক্তি দেয়া যায়। এজন্য চট্টগ্রাম নগরবাসীকে দ্রুত জলাবদ্ধতা থেকে পরিত্রাণ দিতে হলে সিভিল সোসাইটিকে সাথে নিয়ে প্রকৌশলী সমাজকে আর বেশি জনমত সংগঠিত করতে হবে। আরো প্রকৌশলীদের কাজগুলো নীতি নির্ধারক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন যে পৌরকর পায় তা দিয়ে অনেকগুলো সেবাধর্মী কার্যক্রম পরিচালনা করে। এরমধ্যে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাত উল্লেখযোগ্য। এগুলো দিয়ে জলাবদ্ধতার মত সমস্যা সিটি কর্পোরেশনের একার পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এছাড়া তিনি নগরীর রাস্তাঘাট সম্পর্কিত যে সব প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয় সেগুলো ওয়াসার সাথে সমন্বিত প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রহণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ওয়াসা একই রাস্তা একই স্থানে বার বার কাটাকাটি করে। এগুলো নগরবাসীর জন্য নানাভাবে দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। প্রতিষ্ঠান প্রধানদের আন্তরিকতা থাকলে এসব প্রকল্প একসাথে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)’র প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা ও পাহাড় ধস রোধ করতে হলে ১৯৯৫ সালে প্রণিত মাস্টারপ্ল্যান রিভাইসড করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন না করলে নগরবাসীর দুর্ভোগ কমানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। মূল প্রবন্ধকার পাওয়ার প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বিশ্বের বেশ কয়েকটি পাহাড়বেস্টিত দেশসমূহ পাহাড় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পাহাড়ে কিভাবে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে তা তুলে আমাদের দেশেও পাহাড়কে রিসোর্স হিসেবে ব্যবহার করে ২০-২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের প্রকৌশল পদ্ধতিতে যদি পরিচালিত করা সম্ভব না হয় তাহলে পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। প্রকৌশলীরা এ ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ও সভা সেমিনার করে প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ব্যাপারে করণীয় নির্ধারণে পরিকল্পিত নির্দেশনা দিবেন। জনগণও চায় চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকৌশলীরা যুক্ত হোক।
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ধসের ব্যাপারে বহির্বিশ্বে আমাদের ব্যাপারে যে বার্তা যাচ্ছে তা আমাদের ভাবমূর্তির জন্য অত্যন্ত খারাপ। এজন্য পাহাড় রক্ষার জন্য কর্তৃপক্ষের অবস্থান পরিস্কার করতে হবে এবং কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, পাহাড় ধস ও মানুষের মৃত্যু কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এসব দুর্যোগ মানুষ সৃষ্টি করেছে। কারণ পাহাড় কাটার সময়, বসতি নির্মাণের সময় প্রশাসন কিছু করে না। আইন প্রয়োগ করে না। পাহাড় নিয়ে মানুষের আবাসন সঙ্কটের কারণে ব্যবসা হচ্ছে। এখানে হাউজিং পলিসি ও বিল্ডিং নির্মাণ রুল নেই। সেমিনারে প্যানেল আলোচক ছিলেন সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রো-ভাইসচ্যান্সেলর, বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ ও আইইবি, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এম. আলী আশরাফ, পিইঞ্জ., কেন্দ্রের প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন, পিইঞ্জ., ও প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ হারুন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লে: কর্ণেল প্রকৌশলী মহিউদ্দিন আহমেদ, পিইঞ্জ.।
সেমিনারে প্যানেল আলোচকরা তাঁদের বক্তৃতায় বলেন, সমূদ্র, নদী ও পাহাড় বেস্টিত এই চট্টগ্রাম পৃথিবীর অন্যতম বৈচিত্রময় শহর। আমরা আমাদের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও লোভের কারনে এই সমস্যাটিকে জটিল করে তুলেছি। প্রকৃতিকে যদি তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া না হয়, তবে স্বাভাবিকভাবে বৈরী আচরণ করবেই। দীর্ঘদিন থেকে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কেটে, আমাদের ব্যক্তি ও গোষ্ঠির স্বার্থে ব্যবহার করার কারনে পাহাড় তার নিজের বৈশিষ্ট হারিয়ে বৈরী আচরণ শুরু করেছে। আলোচকেরা জলাবদ্ধতা নিরসন ও পাহাড়ধস থেকে রক্ষা পাওয়ার ব্যাপারে বলেন,
অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে রাস্তাঘাট বা স্থাপনা নির্মাণ করতে হলে পাহাড়ের মূল বৈশিষ্ট্য ধ্বংস না করে রাস্তাঘাট ও ভবন নির্মাণ করতে হবে। ধ্বংসপ্রাপ্ত পাহাড় থেকে নেমে আসা পলি ও বালিকে ধারন করার জন্য সিলট্রেপ নির্মাণ করতে হবে। ১৯৯৫ সালের মহা-পরিকল্পনায় চিহ্নিত খালগুলো উদ্ধার করে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। কর্ণফুলী নদী এবং চট্টগ্রাম যেসব খাল বেদখল হয়ে স্থাপনা নির্মিত হয়েছে তা উচ্ছেদ করে পানির স্বাভাবিক গতি সৃষ্টি করা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয়টি বর্তমান নির্বাচিত মেয়র জনাব আজম নাছির উদ্দিন জলাবদ্ধতার মূল কারনগুলো উপলদ্ধি করে চিহ্নিত করেছেন এবং তা নিরসনের জন্য বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সমাধানের জন্য এগিয়ে যাচ্ছেন।
আলোচকেরা আরো বলেন, কর্ণফুলী নদী ও খালের ড্রেজিং ও খনন কাজ সম্পন্ন করে জোয়ারের পানি প্রবেশ বন্ধ করার জন্য শুধুমাত্র স্লুইচগেইট নির্মানে সকল সমস্যার সমাধান হবে না। এব্যাপারে জোয়ারের পানির প্রবেশ বন্ধ করার জন্য প্ল্যাফ গেইট নির্মান করার সাথে সাথে বৃষ্টির সময় উজান থেকে নেমে আসা পানি নিষ্কাসনের জন্য ক্যাচম্যান এরিয়া হিসাব করে পানি নিষ্কাসন করার জন্য দেড়গুন ক্ষমতা সম্পন্ন পাম্প বসানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে কোন সময় মেকানিক্যাল সমস্যা দেখা দিলেও যাতে পানি নিষ্কাসনে বিঘœ না ঘটে। বক্তারা আরো বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন খাল খনন করতে হবে। একই সঙ্গে সেবা সংস্থার পাইপলাইন অপসারন এবং সেতু ও কালভার্টগুলো উচু ও প্রশস্ত করতে হবে। মধ্য মেয়াদে জলাধার, জোয়ার রোধক ফটক নির্মাণ এবং নতুন শাখা প্রশাখার নালা নির্মাণ করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে বন্যা প্রতিরক্ষা বাঁধ ও অবশিষ্ট জলাধার ও জোয়ার রোধক ফটক নির্মাণ করতে হবে। স্বল্প মেয়াদের কাজগুলোর তিন বছর, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদের কাজগুলো যথাক্রমে চার ও পাঁচ বছরের মধ্যে করতে হবে।
প্যানেল আলোচকরা আরো বলেন, ১৯৬৯ সালের জন ¯েœল এন্ড কোম্পানীর জরিপে চট্টগ্রাম নগরে যে সত্তরটি খালের কথা উল্লেখ ছিল তার অধিকাংশ দখল হয়ে গেছে। দখল হয়ে যাওয়া প্রতিটি খাল আর এস জরিপ অনুযায়ী খালের জায়গা খালকে ফেরত দিতে হবে। সেমিনারের শুরুতে বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ঘনিষ্ট সহচর সাবেক গণপরিষদ সদস্য প্রয়াত মোঃ ইসহাক মিয়ার মৃত্যুতে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করেন আইইবি, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও অনুষ্ঠানের সভাপতি প্রকৌশলী সাদেক মোহাম্মদ চৌধুরী। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, সর্বোপরি সিডিএ, ওয়াসা, চট্টগ্রাম বন্দর, কেজিডিসিএল, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পিডিবি, বিটিসিএল, ইত্যাদি সেবা সংস্থাগুলোকে নির্বাচিত মেয়র মাননীয় মেয়রের মাধ্যমে সমন্বয় করে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে নগরীকে জলাবদ্ধতা মুক্ত এবং নগরে পাহাড়ধস ঠেকানো সম্ভব হবে।
কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী সাদেক মোহাম্মদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং সম্মানী সম্পাদক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেনের সঞ্চালনায় সেমিনারে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামস্থ অনারারী কনসাল অব জাপান জনাব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। অন্যান্যদের মাঝে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ও আইইবি, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. ইব্রাহিম খান, কেন্দ্রের ভাইস-চেয়ারম্যান (একা. এন্ড এইচআরডি) প্রকৌশলী এম. এ. রশীদ ও ভাইস-চেয়ারম্যান (এডমিন. প্রফেশ. এন্ড এসডব্লিউ) প্রকৌশলী উদয় শেখর দত্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*