দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় হ-য-ব-র-ল অবস্থা চলছে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : দেশের গণপরিবহন-ব্যবস্থা চরম বিশৃঙ্খলার শিকার। নিয়ম-কানুন ও শৃঙ্খলা কোথাও নেই। বেপরোয়া যানবাহন চালনা এখানে একটা প্রতিযোগিতার খেলায় পরিণত হয়েছে। বাস ইচ্ছে মতো যেখানে-সেখানে থামছে। যাত্রী তুলছে, নামাচ্ছে। গোটা নগর যেন একটা বড় বাসস্টপে পরিণত হয়েছে। যাত্রী ওঠানো-নামানোর ক্ষেত্রে বাসগুলো কোনো নিয়মের তোয়াক্কা করছে না। যেখান থেকে ইচ্ছে যাত্রী তোলা এবং যেখানে ইচ্ছা নামানো রীতিমতো সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। লক্ষণীয়, যাত্রী ওঠানো হয় টেনেহিঁচড়ে। নামানো হয় এক প্রকার গলা ধাক্কা দিয়ে। হেলপার যাত্রীদের চলন্ত বাস থেকে জোর করে নামিয়ে দেয়। এভাবে চলন্ত বাস থেকে লাফ দিয়ে নামতে গিয়ে প্রায়শই যাত্রীদের দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়। চলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারাচ্ছেন শত শত মানুষ।
চট্টগ্রামের সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়ক মহাসড়কে জেব্রাক্রসিং অংকন করা, প্রয়োজনীয় ফুটপাত ও ফুট ওভার ব্রীজ নির্মাণ করা এবং বিদ্যামান ফুটপাত হকার্স মুক্ত করে যাত্রীদের যাতায়াতের ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানিয়েছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। একই সাথে সড়ক মহাসড়কে দ্রুতগতির যানবাহন এবং ধীরগতির যানবাহনের জন্য  পৃথক লেইন চালু করা, মহাসড়কে নছিমন করিমন, ইজিবাইক, ব্যাটারী চালিত রিক্সা চলাচল বন্ধের দাবী জানিয়েছে সংগঠনটি। গত ৮ ডিসেম্বর সোমবার চট্টগ্রামের সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন প্রকাশ  উপলক্ষে গণমাধ্যমে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে উপরোক্ত দাবী জানানো হয়। উল্লেখ্য যে, গত জানুয়ারী ২০১৪ইং হতে চট্টগ্রামের সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং করে আসছে দেশের সড়ক, বেল, নৌ ও আকাশ পথের যাত্রীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়োজিত সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। দেশের গণ মাধ্যমে প্রকাশিত সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ মনিটরিং করে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
এবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী জানুয়ারী হতে নভেম্বর ২০১৪ইং পর্যন্ত গত ১১ মাসে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় সম্মিলিতভাবে সর্বমোট ৪৫৫টি সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৪১৪ জন নিহত ও ১৯৭৯ জন আহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৫৪ জন পথচারী, ১২৫জন শিশু, ২১৭ জন নারী ৮ জন চিকিৎসক, ২৫ জন শিক্ষক, ৫৫ জন বিভিন্ন রাজনৈতিকদলের নেতাকর্মী, ৯২ জন ছাত্র, ১৪৩ জন চালক ও পরিবহন শ্রমিক, ৩০ জন পুলিশ সদস্য, ১৫ জন সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্য সড়ক দূর্ঘটনার শিকার হয়। রিপোর্টে দেখা যায় সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ ৬৪ টি এবং মার্চে সর্ব নিম্ন ২৭টি সড়ক দূর্ঘটনার ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী জানুয়ারী মাসে ৪০টি সড়ক দূর্ঘটনায় ৩৪ জন নিহত ১৩৪ জন আহত হয়। ফেব্র“য়ারী মাসে ২৮ টি সড়ক দূর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত ৬৬ জন আহত হয়। মার্চে ২৭টি সড়ক দূর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ১৪২ জন আহত হয়। এপ্রিলে  ৩৯ টি সড়ক দূর্ঘটনায় ৪১ জন নিহত ১০৯ জন আহত হয়। মে মাসে ৪৬টি সড়ক  দূর্ঘটনায় ৩৯ জন নিহত ১৫৮ জন আহত হয়। জুনে ৩৫টি সড়ক দূর্ঘটনায় ৩১ জন নিহত ১৯৪ জন আহত হয়। জুলাই মাসে ৪০টি সড়ক দূর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত ২০৭ জন আহত হয়। আগস্টে ৫২টি সড়ক দূর্ঘটনায় ৫৮ জন নিহত ২১৯ জন আহত হয়। সেপ্টেম্বরে ৬৪ টি সড়ক দূর্ঘটনায় ৫২ জন নিহত ৩১৬ জন আহত হয়। অক্টোবরে ৫২টি সড়ক দূর্ঘটনায় ৫৪ জন নিহত ২৮৯জন আহত হয়। নভেম্বরে ৩২টি সড়ক দূর্ঘটনায় ৩৮ জন নিহত ১৪৫ জন আহত হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুন্ড অংশে সর্বোচ্চ সংখ্যাক দূর্ঘটনা ঘটছে। এছাড়াও চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশ, পটিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া অংশে বেপরোয়া গতির বাস, মাইক্রোবাসে বেপরোয়া গতির কারণে দূঘটনার ঘটনা ঘটছে। এদিকে নগরীতে চলাচলকারী ব্যাটারী চালিত রিক্সা প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০টি দূঘটনা ঘটালেও তা পত্র পত্রিকায় না আসায় মনিটরিং করা সম্ভব হচেছ না বলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।
এদিকে যাত্রীদের অসচেতনতা ও বোকামিও দুর্ঘটনার জন্য কম দায়ী নয়। অনেকেই আত্মনিরাপত্তার বিষয়টি আমলে নেয় না বা নিতে চায় না। ফলে ক্রমাগত দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। এক পরিসংখানে দেখা গেছে, এ বছর রাজধানীতে ১৫৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং এতে প্রাণ হারিয়েছে ১৩৪ জন। অনেকেই আহত হয়েছে। যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ম-কানুন মানতে বাধ্য করার দায়িত্ব পুলিশের। এক্ষেত্রে পুলিশের অবহেলা সীমাহীন। যে সোনারগাঁ ক্রসিংয়ে সাংবাদিক জগলুল আহমদ চৌধুরী দুর্ঘটনায় পড়ে নিহত হয়েছেন, গত পরশু সেখানে আগের মতোই চলন্ত বাস থেকে যাত্রী নামানো ও ওঠানোর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা গেছে। পাশেই পুলিশ সার্জেন্টদের নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। রাজধানীতে ট্রাফিক সিগন্যালের সংখ্যা ৭০টি। আইন অমান্য করে এর প্রায় সব সিগন্যালেই বাস থামে। যাত্রী ওঠানো ও নামানো হয়। পুলিশ কোনো বাধা দেয় না।
গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা, বেপরোয়া যানবাহন চালনা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানো-নামানো, যাত্রীদের অসচেতনতা ও বেতোয়াক্কা মনোভাব এবং পুলিশের দায়িত্ব পালনে অমনোযোগিতা এবং অবহেলা এ ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির কারণ। স্মরণ করা যেতে পারে, গত পরশুও রাজধানীতে দু’জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী মালিবাগে দুই বাসের চাপায় নিহত হয়েছে। অন্যদিকে কল্যাণপুরে বিআরটিসি’র এক বাস কন্ডাক্টর  বিআরটিসি’র বাসের ধাক্কায় নিহত হয়েছে। একই দিনে কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। দুপুরের দিকে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদাহগামী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কিছু বাস ক্যাম্পাস থেকে বের হচ্ছিল। এসময় একটি বাস থেকে মুখ বের করে এক সহপাঠীকে যখন ডাকছিল ওই শিক্ষার্থী তখনই পাস দিয়ে অতিক্রম করে যায় একটি বাস। এর ধাক্কায় মাটিতে পড়ে চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলে সে মারা যায়। এ ঘটনার জেরে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ৩৫টি বাস পুড়িয়ে দেয়। আরও আট-দশটি ভাঙচুর করে। পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়, যাতে আহত হয় অন্তত ২৯ জন। সহিংসতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থীর ওইভাবে মৃত্যু মর্মান্তিক, কোনোভাবেই তা মেনে নেয়া যায় না। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে প্রতিক্রিয়া যে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে গেছে, তাও স্বীকার করতে হবে। একটি বিষয় এ থেকে স্পষ্ট যে, পথে-ঘাটে এভাবে বেঘোরে মৃত্যুর ঘটনায় মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষ সীমা ও মাত্রা অতিক্রম করে যাচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের গভীরভাবে বিবেচনায় নেয়া অবশ্যক।
রাজধানীর গণপরিবহন সম্পর্কে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়েছে। রাজনৈতিক মালিক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন আর লাইসেন্সবিহীন চালক এই হলো মোটাদাগে ঢাকার গণপরিবহন। ওই খবরে জানা গেছে, বিআরটিএ ও মালিক-শ্রমিক সংগঠনের হিসেবে ঢাকায় ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সোয়া লাখ। অন্তত ৩০ শতাংশ চালকের লাইসেন্স নেই। বাস চলাচলের অনুমোদন আছে পৌনে দু’শ’ পথে। কিন্তু ১৫০টি পথে চালক-মালিকরা নির্ধারিত পথ কিংবা স্টপেজ মানে না। এই যদি প্রকৃত অবস্থা হয়, তাহলে গণপরিহনকে শৃঙ্খলায় আনা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা কীভাবে সম্ভব? রাজধানীর অবস্থা যেখানে এরকম সেখানে দেশের অন্যান্য এলাকার অবস্থা কী হতে পারে, সহজেই অনুমেয়। গোটা দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় যে নাজুক ও হ-য-ব-র-ল অবস্থা চলছে, তাতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভবপর নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা লক্ষ্য করছি, দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ক্রমাগত বাড়ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে ৯৫০ জন পথচারী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে ১১০২ জন, যাদের অনেকেই চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছে, একটি ইংরেজি দৈনিকের রিপোর্ট মতে, ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে অন্তত ৮২৭০ জন আহত হয়েছে ২১৮৮৬ জন। দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫৬৭৪টি। বলার  অপেক্ষা রাখে না, দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির রাস টেনে ধরতে হলে অবশ্যই ঢাকাসহ গোটা দেশের পরিবহন ব্যবস্থাকে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। যে কোনো দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রী ও পথচারীদের মধ্যে সচেতনতা ও নিরাপত্তাবোধ জাগিয়ে তোলার ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বোপরি আইন-বিধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল করে তুলতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*