চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটে মানুষ ব্যাংকে সঞ্চয় রাখতে পারছে না

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : মধ্যবিত্তের আমানতের হার দিন দিন কমছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা, মূল্যস্ফীতি ও চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটে মানুষ আর নতুন করে ব্যাংকে সঞ্চয়bb রাখতে পারছে না। পাশাপাশি বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে ব্যাংকগুলো উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। পরিচালন ব্যয় কমানোর জন্য আমানতের সুদহার কমানো হচ্ছে। এতে কমে গেছে সার্বিক আমানতের প্রবৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, সামগ্রিক আমানত সাড়ে ৫ শতাংশ থেকে সোয়া দুই শতাংশে নেমে এসেছে। আর ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে চলতি আমানত। মেয়াদি আমানতও অর্ধেকে নেমে গেছে। এ চিত্র গত জুলাই-অক্টোবরের। বর্তমান পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। ব্যাংকারদের মতে, আমানত কমে গেলে বিনিয়োগের জন্য টাকার উৎস কমে যায়। এতে ব্যাংক আগের মতো বেশি পরিমাণ বিনিয়োগ করতে পারে না। কমে যায় ব্যাংকের বিনিয়োগসক্ষমতা। বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও সর্বোপরি সুদহার কমে যাওয়ায় মানুষ ব্যাংকের আমানত ভেঙে ফেলছেন, যার প্রভাব পড়ছে আমানতে। এটা অব্যাহত থাকলে ব্যাংকিং খাতসহ পুরো অর্থনীতির জন্য খারাপ সঙ্কেত বয়ে আনবে। প্রচলিত নিয়মানুযায়ী, সাধারণত দুই ধরনের আমানত রাখা হয়। প্রথমত স্বল্প সময়ে মুনাফা লাভের জন্য মানুষ স্বল্প সময়ের জন্য চলতি আমানত রাখে। তিন মাস সময় থেকে এক বছর মেয়াদি এ আমানত রাখে। অপর দিকে দীর্ঘমেয়াদি মুনাফার জন্য মানুষ মেয়াদি আমানত রাখে দুই বছর থেকে তিন বছর, পাঁচ বছর ১০ বছর ও তার ঊর্ধ্বে। তাদের মতে, মানুষ যখন তার প্রয়োজনীয় ব্যয় মিটিয়ে হাতে উদ্বৃত্ত থাকে তখন সে সঞ্চয় করে। আবার আয়ের চেয়ে যখন ব্যয় বেড়ে যায় তখন সঞ্চয় ভেঙে খায়। তখন চলতি আমানতসহ সামগ্রিক আমানত কমে যায়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, ব্যবসায়-বাণিজ্যে যখন স্থবিরতা নেমে আসে তখন তলবি আমানত নেতিবাচক হয়ে পড়ে। কারণ, এ সময়ে ব্যবসায়ীরা আগের মতো লেনদেন করতে পারেন না। তাদের হাতে টাকা থাকে না। সবসময় ব্যবসায়ীরা টানাটানির মধ্যে থাকেন। আর মেয়াদি আমানত কমে যাওয়ার অর্থ হলো সাধারণ মানুষ আর আমানত takaরাখতে পারছেন না। মূল্যস্ফীতিই তাদের সঞ্চয় খেয়ে ফেলছে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ দিন ধরে দুই অঙ্কের ঘরে অবস্থান করছে। আয়ের সাথে ব্যয় সঙ্কুলান করতে পারছে না নি¤œমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নির্ধারিত আয়ের মানুষ। এ কারণে এখন ভবিষ্যতের জন্য জমানো অর্থে হাত দিয়েছেন। মেয়াদপূর্তির আগেই ব্যাংকে জমানো স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ডিপিএস ভেঙে ফেলছে। সঞ্চয় ভেঙে খাওয়ায় কমে যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর আমানত। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সামগ্রিক আমানতের প্রবৃদ্ধি গত জুলাই-অক্টোবরে নেমে এসেছে সোয়া দুই শতাংশে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল সাড়ে ৫ শতাংশ। এর মধ্যে চলতি আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে হয়েছে ঋণাত্মক ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অপর দিকে মেয়াদি আমানত কমে নেমেছে সাড়ে ৩ শতাংশে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল প্রায় ৭ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকের এ আমানতের পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য মোটেও সুখকর নয়। কেননা, বিনিয়োগের বর্তমান অচলাবস্থা হয়তো সামনে কেটে যেতে পারে। এতে বিনিয়োগের চাহিদা বাড়লে ঋণের চাহিদা বাড়বে। তখন ব্যাংকে টাকা না থাকলে চাহিদা অনুযায়ী বিনিয়োগ করতে পারবে না। ব্যাংক বিশ্লেষকদের মতে, মূলত দুই কারণে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে যায়। প্রথমত, অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমে যাওয়ায় ব্যাংকে লেনদেন কমে গেছে। আর ব্যাংক লেনদেন কমে যাওয়ায় তলবি আমানত কমে যাচ্ছে। অপর দিকে, মূল্যস্ফীতির কারণে আমানত কমে যায়। জিনিসপত্রের দাম যখন বেড়ে যায়, তখন মানুষ ব্যাংক থেকে বেশি পরিমাণ আমানত তুলে নিজের কাছে নগদ টাকা বেশি রাখে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক সঙ্কের কারণে মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে ব্যাংকের পরিবর্তে নিজের কাছেই অর্থ ধরে রাখছে। পাশাপাশি কয়েক বছর ধরে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ ঋণকেলেঙ্কারি, বেসিক ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম, ন্যাশনালসহ আরো কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সব মিলেই ব্যাংকে আমানতের ওপর প্রভাব পড়েছে। দেশের প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, তলবি আমানত সাধারণত কখনো নেতিবাচক হয় না। কারণ ব্যবসায়ীরা সবসময় ব্যাংকে লেনদেন করেন। কিন্তু তলবি আমানত নেতিবাচক হওয়ার অর্থ হলো ব্যবসায়-বাণিজ্যের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, এক দিকে শিল্প কারখানায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না সরকার। কিন্তু পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জালানি তেলের দাম দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে। এতে ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে গেছে। ব্যবসায় ব্যয় যখন বেড়ে যায় তখন ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। লোকসান হয় শিল্প প্রতিষ্ঠানে। তখন ব্যবসায়ীদের টিকে থাকাই sansyদায় হয়ে পড়ে। এ কারণে ব্যাংকে লেনদেন কমে যায়। অপর দিকে, ব্যাংকিং খাতের চেয়ে ব্যাংকবহির্ভূত খাতে অধিক মুনাফা পেলে তখন ব্যাংকে আর কেউ টাকা রাখে না। অন্যত্র সরিয়ে ফেলে। এ কারণেও তলবি আমানত কমতে পারে বলে তিনি মনে করেন। মেয়াদি আমানত কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে সাবেক এ গভর্নর জানান, মূল্যস্ফীতির কারণে যখন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায় তখন সাধারণ মানুষ সঞ্চয় করতে পারেন না। উপরন্তু সংসারের ঘাটতি মেটাতে ভবিষ্যতের জন্য জমানো সঞ্চয়ে হাত দেন। ওই ব্যাংকারের মতে, ব্যাংক থেকে বেশি মাত্রায় আমানত উত্তোলন হলে ব্যাংকিং খাতে নগদ অর্থের সঙ্কট দেখা দেবে। এটা সমন্বয় করতে না পারলে ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের সঙ্কট পড়বে, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের তদারকি ব্যবস্থা বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে বেশি মাত্রায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। সূত্র : নয়া দিগন্ত অনলাইন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*