চট্টগ্রাম খাজা রোডের হত্যাকাণ্ডের আগে ছড়ানো হয় গুজব

নিউজগার্ডেন ডেস্ক :  চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানার খাজা রোডের বাদামতল এলাকায় শুক্রবার রাতে হত্যা করা হয় দু’সহোদরকে। তাদের হত্যা করতে পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হয় গুজব। পরে সুযোগ বুঝে প্রথমে ছোট ভাই আবু সিদ্দিককে (৪২) হত্যা করা হয়। ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে খুন হন তার ভাই ফরিদুল আলমও (৪৫)। মূলত আবু সিদ্দিকের সঙ্গে অবৈধ কাঠ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির বিরোধের জের ধরে একই থানার বলিরহাটের বাসিন্দা আইয়ুব ও তার লোকজন এ দু’ভাইকে খুন করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবু সিদ্দিকের হাতে প্রতিপক্ষের লোকজন খুন হয়েছে এমন গুজব তুলে বাড়ির সামনেই তাদের খুন করে। গুজবের কারণে আবু সিদ্দিক ও ফরিদুল আলমের বাড়িরর সামনে মানুষের জটলা থাকার সুযোগ নিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের অপারেশন শেষ করে যে যার মত পালিয়ে যায় হত্যাকারীরা। শনিবার সকালে সরেজমিন অবস্থান করে এলাকাবাসী, নিহতের পরিবার ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর খাজা রোড বাদামতল এলাকার মুন্সী বাড়ীর মৃত আব্দুস সবুরের পাঁচ সন্তানের মধ্যে আবু সিদ্দিক তৃতীয়। তিনি বিবাহিত এবং এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের বাবা। এলাকায় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তার বড় ভাই ফরিদুল আলম ও মইনুদ্দীন মহসিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আবু এলাকায় কাঠ ব্যবসা করতো। বৈধ কাঠ ব্যবসার ফাঁকে অবৈধ কাঠ ব্যবসাও করতো সে। মূলত সেই অবৈধ কাঠ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই পাশের গ্রাম বলিরহাটের আরেক অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ী আইয়ুবের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয় আবু সিদ্দিকের। এনিয়ে তাদের দু’জনের মধ্যে একাধিকবার মারামারিও হয়েছে। গত এক মাস আগে খুনের দায়ে অভিযুক্ত আইয়ুবের অবৈধ কাঠভর্তি একটি ট্রাক কোস্টগার্ডকে ধরিয়ে দেয় আবু সিদ্দিক। এছাড়া আইয়ুব অবৈধভাবে যাদের সঙ্গে কাঠের ব্যবসা করতো ঠিক তাদের সঙ্গেই ব্যবসা শুরু করেন নিহত আবু সিদ্দিক। এছাড়াও খাজা রোড দিয়ে বলিরহাট যাওয়ার সময় আইয়ুবের বেশ কয়েকটি কাঠ বোঝাই গাড়ী থেকে চাঁদাও আদায় করেছে নিহত সিদ্দিক। যার ফলে তাদের মধ্যে বিরোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছে। একজন আরেকজনকে দেখে নেয়ার হুমকি দিয়ে রাখে। শুক্রবারের ওই ঘটনায় নিহত অপরভাই ফরিদুল আলমের দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। সে জমি সংক্রান্ত ব্যবসা-বাণিজ্য করতো এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলো। ওই রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে মুন্সী বাড়ীর এক নারীর জানাজার নামাজ শেষ করে আবু সিদ্দিক বাদমতল এলাকার দিকে যায়। এ সময় সেখানে আগেই অবস্থান করছিলেন হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আইয়ুব ও তার লোকজন। আবু সিদ্দিকদের বাড়ীতে এক বৃদ্ধ নারীর মৃত্যু হওয়া ওইদিন এলাকার পরিবেশ ছিল একটু শোকাবহ আর অন্যদিকে শীতকাল হওয়ায় তেমন লোকজনও ছিল না ঘটনাস্থলে। অন্যদিকে বলিহাটে আইয়ুবের বাড়ীতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল তখন। বিয়ে বাড়ীতে রটিয়ে দেয়া হয় আইয়ুবের লোকজনকে বাদামতলের আবু সিদ্দিকের লোকজন হত্যা করেছে। এর ফলে উত্তেজিত জনতা বিয়ে বাড়ী থেকে বাদামতলে এসে জড়ো হয়। এরই মধ্যে জানাজার নামাজ শেষ করে যখন মুন্সী বাড়ীর লোকজন ওই নারীর কবর দেয়ায় ব্যস্ত ছিলো তার কিছু দূরেই রাস্তায় আবু সিদ্দিককে একা পেয়ে তার ওপর লাঠি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা করেন প্রতিপক্ষের লোকজন। এ খবর পেয়ে দ্রুত সেখানে যান আবু সিদ্দিকের বড় ভাই ফরিদুল আলম। তাকেও একইভাবে আঘাত করা হয়। কবর দেয়ার যাবতীয় কাজ শেষ করে এলাকাবাসী ঘটনাস্থলে গেলে হত্যাকারীরা পালিয়ে যায়। এই হত্যাকাণ্ডের সময় লাগে মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট। এরই মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। সিদ্দিক ও আলমকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাতেই তাদের মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের শিকার দুই ভাইকেই টার্গেট করে মাথায় ও মুখে আঘাত করায় দ্রুত রক্তক্ষরণ হয়ে তারা মারা যান। শনিবার সকালে ঘটনাস্থলে গেলে মুন্সী বাড়ীর কবরস্থানে পাশাপাশি দুটি কবর খনন করতে দেখা গেছে। আবু সিদ্দিকের বাড়ীতে গিয়ে দেখা যায়, তার মা ও নিহত দু’জনের স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে বিলাপ করে কাঁদছেন। বিশেষ করে তাদের মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। দোতলা বাড়ীর সামনেই সিঁড়ী ঘরে রক্ষিত আছে আবু সিদ্দিকের মোটর সাইকেল। তবে তার বাড়ীর লোকজনও হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে খুব একটা কথা বলতে চাননি। যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে তারা দাবি করেন, কাঠ ব্যবসার বিরোধের জের ধরে বলিরহাটের আইয়ব ও তার লোকজন তাদের পিটিয়ে হত্যা করেছে। এদিকে সম্পূর্ণ উল্টোচিত্র দেখা গেছে আইয়ুবের এলাকা বলিরহাটে। জোড়া খুনের এই ঘটনায় সেখানে আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে নতুন করে হামলা বা সংঘর্ষের আশঙ্কা থেকে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। মামলার বাদী মইনুদ্দীন মহসীন বলেন, ‘এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কাঠ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আশা করছি এখন পুলিশ জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করবে।’ চান্দগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বলেন, ‘ঘটনার মোটিভ সম্পর্কে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। আবুর বিরুদ্ধে আগে থানায় মামলা থাকলেও এখন কাঠ ব্যবসা করে জীবন যাপন করতেন বলে শুনেছি। তবে তাদের পূর্বের কর্মকাণ্ডের জন্য স্থানীয়রাও তাদের তেমন সহযোগিতা করছে না। মামলা যেহেতু হয়েছে, পুলিশ আসামি গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*