চট্টগ্রামে ৫ বছরের শিশু ইয়াছিন আরাফাত আবির হত্যায় ৪ জনের ফাঁসি

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৭ নভেম্বর: চট্টগ্রামের হালিশহরে পাঁচ বছরের শিশু ইয়াছিন আরাফাত আবির নামে এক শিশুকে অপহরণের পর হত্যার দায়ে ৪ জনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত।
মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মহিতুল হক এনাম চৌধুরী তিন বছর আগের এ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন।child
সর্বোচ্চ সাজার আদেশ পাওয়া চার আসামি হলেন- মো. ফারুক (২৫) ইদ্রিস মিয়া (২৮), মো. আনোয়ার (২৩) ও সুজন (২৩)। এদের মধ্যে সুজন পলাতক। ফারুক, আনোয়ার ও সুজন চাঁদপুরের এবং ইদ্রিস সিলেটের মৌলভীবাজারের বাসিন্দা।
ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আইয়ূব খান জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আদালত দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন।abir
“এছাড়া ২০১ ধারায় সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭ ও ৮ ধারায় আলাদা আলাদাভাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার আদেশ দেওয়া হয়েছে।”
অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ইদ্রিসের স্ত্রী রাবেয়া বেগমকে খালাস দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। রায় ঘোষণার সময় আসামিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
নগরীর হালিশহর ‘বি-ব্লক’ এলাকার বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিনের ছেলে আবির প্রাণহরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুশ্রেণির ছাত্র ছিল। সে মা-বাবার সঙ্গে নানার বাড়িতে থাকত।
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর বিকেলে হালিশহর আবাসিক এলাকার বি-ব্লকের বাসিন্দা রিয়াজ উদ্দিনের ছেলে আবির তার বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধূলার করার সময় অপহরণের শিকার হয়। আবির স্থানীয় প্রাণহরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীর ছাত্র। পরদিন ১৮ ডিসেম্বর আবিরের লাশ সীতাকুন্ডের ফৌজদারহাট এলাকা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় রিয়াজ উদ্দিন বাদি হয়ে নগরীর হালিশহর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনার সাত মাস পর দন্ডিত চারজন ও খালাসপ্রাপ্ত রাবেয়াকে গ্রেপ্তার করে হালিশহর থানা পুলিশ। এসময় তারা পুলিশকে ও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, নগরী থেকে পাঁচ বছরের শিশু ইয়াছিন আরাফাত আবিরকে অপহরণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পরও কান্না থামাতে ব্যর্থ হয়ে অপহরণকারীরা আবিরের মুখে চাদর চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলে। জানা গেছে, আসামি ফারুক রিয়াজ উদ্দিনের ভবনের ভাড়াটিয়া ছিল। পরিচয়ের সূত্র ধরে সুজন ও ইদ্রিস ফারুকের বাসায় প্রায়ই আসা যাওয়া করত। তিনজন মিলে আবিরকে অপহরণ করে তার বাবার কাছ থেকে টাকা পয়সা আদায়ের পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আবিরকে কৌশলে ফারুক সিএনজি অটোরিকশায় তুলে ইদ্রিসের বাসায় নিয়ে যায়। এরপর ইদ্রিসের স্ত্রী রাবেয়াকে আবিরের মা সাজিয়ে অটোরিকশায় করে অলংকার মোড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। যাওয়ার পথে জুসের সঙ্গে তাকে ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ানো হয়। অংলকার মোড়ে যাবার পর অটোরিকশায় উঠে আনোয়ার। অন্যদিকে সুজন অলংকার মোড় থেকে সিলেট যাবার জন্য তিনটি টিকেটও কিনে। টিকেটের সময় অনুযায়ী বাস ছাড়ার আগ পর্যন্ত সময়ে তারা অটোরিকশা নিয়ে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। তারা কুমিরা এলাকায় গেলে আবির শব্দ করে কান্নাকাটি শুরু করে। বারবার কান্না থামানোর চেষ্টা করেও অপহরণকারীরা ব্যর্থ হয়। এরপর অটোকিশার ভেতরেই চাদর চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়।
পরে ছলিমপুর কালুশাহ মাজারের কাছে নগরদোলা চাইনিজ রেস্টুরেন্টের কাছে রাস্তার ওপর লাশ ফেলে দেওয়া হয় এবং পরদিন পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে।
এঘটনায় রিয়াজ উদ্দিনের করা মামলায় পুলিশ পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে পরের বছরের ২৪ অক্টোবর অভিযোগপত্র দেয়। ২০১৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি আদালত অভিযোগ গঠন করে। গত ২ ফেব্রুয়ারি মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যালে স্থানান্তর করা হয়।
আবিরকে হত্যার পাঁচ মাস পর চাঁদপুর, সিলেট ও চট্টগ্রাম থেকে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং তারা সবাই হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়। পরে জামিনে মুক্তি পেয়ে সুজন পালিয়ে যায়।
ছেলেকে হত্যায় চারজনের ফাঁসির রায়ে সন্তুষ্ট হলেও রাবেয়া বেগমের খালাসে খুশি হতে পারেননি রিয়াজ উদ্দিন।
রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “আমার সন্তানকে যারা এভাবে খুন করেছে তাদের ফাঁসি হওয়ায় আমি খুশি। কিন্তু রাবেয়া বেগমের ফাঁসি না হওয়ায় আমি অসন্তুষ্ট। ওই অটোরিকশায় আমার ছেলে তার কোলে ছিল।”

Leave a Reply

%d bloggers like this: