চট্টগ্রামে মেলার কারণে খেলতে পারছে না নগরীর শিশু-কিশোররা

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৮ ডিসেম্বর, বুধবার: চট্টগ্রাম মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সব কটি খেলার মাঠ এখন মেলার দখলে। বিশেষ করে নগরীর আউটার স্টেডিয়াম, পলোগ্রাউন্ড মাঠ, হালিশহর আবাহনী মাঠসহ ইনডোরেও চলছে মেলা। দীর্ঘ সময় ধরে চলা মেলার কারণে খেলতে পারছে না নগরীর শিশু-কিশোররা।
মেলার নামে পণ্য বিক্রির এসব আয়োজনে ক্ষুব্ধ ক্রীড়ামোদী ও এলাকার অভিভাবকরা। দেশের ক্রীড়াব্যক্তিত্ব ও চট্টগ্রামের সন্তান ক্রিকেটার আকরাম খানও মেলার দখলে খেলার মাঠ চলে যাওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রায় বছর জুড়ে মেলা চলে চট্টগ্রামে। আয়োজন এক কিংবা দুই মাসের জন্য হলেও মেলার আগে-পরে মিলিয়ে ছয় মাসের মতো মাঠগুলো খেলার বাইরে থাকে। একই সময়ে একাধিক মাঠে চলে মেলা। এতে ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা বন্ধ থাকার পাশাপাশি মেলার মাইকের কারণে বিঘœ ঘটে আশপাশের বাসার শিক্ষার্থীদের।
চট্টগ্রামের ক্রীড়াবিদদের অভিযোগ, খেলার জন্য মাঠ চাইলে পাওয়া যায় না। কিন্তু বাণিজ্যের লোভে মাঠগুলো দেয়া হয় মেলা আয়োজনে। তারা বলছেন, মেলার জন্য পরিকল্পিতভাবে জায়গা ও সময় নির্দিষ্ট করে দিলে সমস্যঅ অনেক কমে যায়।
গত কয়েক মাস ধরে একের পর এক মেলা বসছে চট্টগ্রামে। মহানগরীর আউটার স্টেডিয়ামে মাসব্যাপী চলছে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা। হালিশহরের আবাহনী মাঠেও মাসব্যাপী চলছে মেট্রোপলিটন চেম্বারের আন্তর্জাতিক রপ্তানি ও বাণিজ্য মেলা। নভেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে নগরীর পলোগ্রাউন্ডে উইমেন চেম্বারের ইন্টারন্যাশনাল এসএমই এক্সপো।
এর আগে নগরীর আগ্রাবাদের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এবং জিমনেশিয়াম চত্বরে জুনিয়র চেম্বারের মেলা বসেছিল। এ ছাড়া নগরীর জিইসি কনভেনশন সেন্টারে চলছে আন্তর্জাতিক ফার্নিচার মেলা। এর আগে দ্য পেনিনসুলা চিটাগাংয়ে শেষ হলো আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা।
একসঙ্গে কয়েকটি জায়গায় মেলা আয়োজিত হলেও চেম্বারের এসএমই মেলা ছাড়া আন্যগুলোর পণ্য প্রায় একই। সপ্তাহের কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে তেমন দর্মনার্থীর সমাগম হয় না; ছুটির দিনে কেবল ভিড় হয় এসব মেলায়।
সে তুলনায় ১ ডিসম্বের বিজয় মেলা শুরু হলেও অল্প কদিনেই বেশ দর্শণার্থী হয়েছে। নগরীর কেন্দ্রস্থলে আয়োজিত এ মেলায় অবশ্য এখনো কিছু স্টলে পণ্য তোলা হয়নি।
দেশের রপ্তানিকারক ও উৎপাদকদের দ্রব্যাদি সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে মাসব্যপী মেলার আয়োজন করেছে মেট্রোপলিটন চেম্বার। সংগঠনটির সহসভাপতি এ এম মাহবুব চৌধুরী জানান, দেশের ৫০টি উৎপাদক ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মেলায় ২০৭টি স্টল দিয়েছে। রপ্তানিযোগ্য দ্রব্যাদি প্রদর্শন ও দেশীয় উৎপাদিত পণ্য ভোক্তাদের কাছে প্রদর্শন করাই মেলার উদ্দেশ্য।

ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ও ইন্স্যুরেন্স প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়ার জন্য চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে এক ছাদের নিচে আন্তর্জাতিক এসএমই বাণিজ্য মেলার আয়োজন করেছিল চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স।
চিটাগাং চেম্বার ও মেট্রোপলিটন চেম্বারের মতো বড় ও ব্যবসায়িকভাবে তেমন পরিচিত না হলেও তরুণদের জন্য এবারই প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয়েছে তরুণ উদ্যোক্তা বাণিজ্য মেলা। নিজেদের আইডিয়া নিয়ে মেলায় স্টল ও প্যাভিলিয়ন সাজিয়েছিলেন তরুণ উদ্যোক্তারা।
কাজীর দেউড়ি এলাকায় বিজয় মেলা ও তরুণ উদ্যোক্তা মেলার কারণে যানজটেও প্রভাব পড়েছে। তবে মেলার বাইরে ট্রাফিক সমস্যা নিরসনের জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে দাবি করেন সিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মাসুদ উল হাসান। তিনি জানান, রাস্তা যেন ফ্রি থাকে, তার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত মেলায় বেশি ভিড় না হওয়ায় তেমন সমস্যা হচ্ছে না।
যানজটের মতো আরেকটি বড় সংকট দেখা দিয়েছে মেলাগুলোর স্থান নিয়ে। একসঙ্গে এতগুলো স্থানে না হয়ে পরিকল্পিতভাবে একটি স্থানেই মেলার আয়োজন করা উচিত ছিল বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
মেলায় দেশীয় পণ্য ও ঐতিহ্য থাকলেও পরিকল্পনা করে মেলার আয়োজন করা উচিত ছিল বলে মনে করেন চট্টগ্রামের ক্রীড়াবিদরা। ইনডোর মেলাগুলো ছাড়া বাকি সব মেলাই হচ্ছে নগরীর বড় বড় মাঠে। চিটাগাং মেট্রোপলিটন চেম্বারের মেলাটি হালিশহরের আবাহনী মাঠে, উইমেন চেম্বারের মেলা নগরীর পলোগ্রাউন্ড এবং বিজয় মেলা আউটার স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শহরের ছেলেমেয়েরা নগরীর যে প্রধান ও বড় তিনটি মাঠে একটু খেলার সুযোগ পায়, সেসব এখন ব্যস্ত রয়েছে মেলায় বিভিন্ন পণ্যের প্রচারণায়। এ ছাড়া প্রায় সারা বছর নগরীর বাওয়া স্কুলের মাঠটিতেও মেলা লেগেই থাকে।
বাংলাদেশ প্ল্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী এম আলী আশরাফ বলেন, মেলার জন্য আলাদা মাঠ থাকলে ভালো হতো। আগে নগরীর জাম্বুরী মাঠে সব মেলা হতো। এখন মেলার জন্য সে রকম নির্দিষ্ট মাঠ নেই। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নিলে মেলার জন্য বাণিজ্যিকভাবে কোনো মাঠ বা কনভেনশন হতে পারে।
একই মতামত জানালেন আরেক প্রকৌশলী ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার। তিনি বলেন, মেলার ভালো-খারাপ দুটি দিকই আছে। তবে মেলার জন্য সুনির্দিষ্ট স্থান থাকলে ভালো হতো। তাহলে এতগুলো স্থানে ছোটাছুটি করতে হতো না।

এ ছাড়া অপরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মেলার কারণে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও লেখাপড়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন দেলোয়ার মজুমদার। তিনি বলেন, কোন মেলা কখন হবে তা পরিকল্পিতভাবে ঠিক করা যায়। কারণ বড় বড় মাঠ দখল করে যেসব মেলা হচ্ছে এতে শিশু ও খেলোয়াড়রা বঞ্চিত হচ্ছে। বিজয় মেলা ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আয়োজিত হচ্ছে বলে এটি পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও অন্য মেলার ক্ষেত্রে সুযোগ আছে।’ এ ছাড়া শীতকালসহ বছরজুড়ে আয়োজিত মেলায় উচ্চস্বরে মাইক বাজানোর ফলে পরীক্ষার্থীদেরও সমস্যা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ স¤পাদক সিরাজুদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় থাকা মাঠগুলো আমরা খেলার জন্য বরাদ্দ চাইলে নানা অজুহাতে আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অথচ সেই মাঠ আবার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়াও দেওয়া হয়। এই মাঠের অভাবে দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।’
ক্লাবগুলো এখন অনুশীলন করার জন্য মাঠ পায় না উল্লেখ করে সিরাজুদ্দীন বলেন, ‘অথচ মাঠগুলো সব মেলার দখলে চলে গেছে। বিশেষ করে গত চার-পাঁচ বছরে কিছু লোক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রলোভনে পড়ে মাঠগুলো শেষ করে দিচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে মেলা শুধু ১৫ দিন কিংবা এক মাসের জন্য হচ্ছে। পলোগ্রাউন্ডে চট্টগ্রাম চেম্বার ও মহিলা চেম্বারের আড়াই মাসের যে মেলা হয়, তা আগের প্রস্তুতি এবং মেলা শেষে পড়ে থাকা ইট-সুরকির কারণে প্রায় ৬ মাসই খেলার অনুপযোগী থাকে। এভাবে আমাদের সন্তানদের খেলার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।’
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠক আশীষ ভদ্র এ বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, স্টেডিয়ামে যখন খেলা চলে, বাইরের মেলার কারণে তাতে ব্যাঘাত ঘটে। এ ছাড়া নগরীতে এমনিতেই খেলার মাঠ নেই। সেখানে মাঠগুলো যদি বছরজুড়ে নানান মেলায় ব্যস্ত হয়ে থাকে তাহলে শিশুরা খেলবে কোথায়? আউটার স্টেডিয়ামে খেলোয়াড়েরা প্র্যাকটিস করে। এখন সেটাও বন্ধ থাকছে। মেলার জন্য আলাদা জায়গা বরাদ্দ থাকলে এমনটা হতো না বলে মনে করেন তিনি।
হালিশহর এইচ ব্লকের বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘এই এলাকায় বড় মাঠ বলতে আবাহনী মাঠ। বর্তমান ক¤িপউটার গেমসের যুগে আমি নিজেই ছেলেকে বিকেল বেলা মাঠে খেলতে পাঠাতাম। কিন্তু মেলার নামে গত এক মাস ধরে সেটা বন্ধ। কমপক্ষে আগামী দুই মাস এই মাঠে খেলা সম্ভব হবে না। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। অথচ এই সময়ে খেলতে না পেরে ছেলে মনমরা হয়ে বাসায় বসে থাকে। এটা ছোট ছেলেমেয়েদের মানসিক বিকাশের জন্য খুব খারাপ লক্ষণ।’
দীর্ঘদিন ধরে মাঠে খেলতে না পেরে মন খারাপ নগরীর পলোগ্রাউন্ড সংলগ্ন রেলওয়ে কলোনির রিফাতের। মেলার জন্য গত দেড় মাস ধরে পলোগ্রউন্ডে খেলতে পারছে না ওরা। আবার এই মেলা শেষ হতে না হতেই মার্চ মাসে শুরু হবে চট্টগ্রাম চেম্বারের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। মেলা শেষে ইট-পাথরের কারণে আরও এক থেকে দেড় মাস মাঠ ব্যবহার করা যায় না। আক্ষেপ করে রিফাত বলে, ‘আসলে আমরা বছরে ৬ মাসই মাঠে খেলতে পারি না। এই সময়টা আমাদের খুব কষ্টে কাটে।’
নন্দিত ক্রিকেটার আকরাম খান সম্প্রতি চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত এক গুণী সংবর্ধনায় বলেন, ক্রিকেট খেলার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে সুনামের সঙ্গে পরিচিতি লাভ করেছে। অত্যন্ত দুঃখজনক, চট্টগ্রামে খেলার মাঠগুলো মেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। নতুন খেলোয়াড় সৃষ্টির জন্য মাঠগুলো মেলামুক্ত রাাখতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি

Leave a Reply

%d bloggers like this: