চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার মূল সমস্যা ও নিরসনে প্রস্তাবনা

ওসমান জাহাঙ্গীর, ৩০ জুলাই ২০১৭, রবিবার: চট্টগ্রাম শহরটি গড়ে উঠেছে তিনপাশে পানি পরিবেষ্টিত স্থল ব-দ্বীপে। একদিকে কর্ণফুলী নদী আর অন্যদিকে হচ্ছে বঙ্গোপসাগর। শহরের ভিতরে ৭০টি খাল রয়েছে ট্রেসম্যাপ অনুযায়ী। বর্তমানে এই খালগুলোর ৩৬টির মতো অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বাকি খালগুলো দখল হয়ে ভরাট করা হয়েছে। কিন্তু ৩৬টি খালের মুখ দিয়ে ভরাকাটালের সময় বিশেষ করে আষাঢ় শ্রাবণ মাসে পানি প্রবেশ করেন। ফলে অতিবৃষ্টি হলে শহরের ভিতরে পানি সাগর ও নদীতে যাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে শহরটি জলমগ্ন হয়ে পড়ে। শহরটি জলমগ্ন বা জলজট হওয়ার আরও অনেকগুলো কারণ রয়েছে। যে খালগুলো বর্তমানে রয়েছে এগুলো ভরাট ও দখল হয়ে গেছে। তেমন কোনো খনন কাজ করা হয়নি অদ্যাবধি। ওয়াসা সৃষ্টি হওয়ার পর সুয়ারেজের কাজটি তারা শুরু করেনি। দেড় কোটি মানুষের বসবাসের নগরী সুয়ারেজের মাটিগুলো নালা হলে ঐসব খালে এসে পড়ছে। সুয়ারেজের মাটিতে এক ধরনের বাষ্পায়িত গ্যাস রয়েছে। এসব মাটি খালেতে পড়ে খালের তলা থেকে ফুলে উঠে অর্ধেক ভরাট করে ফেলে এসব খালগুলোর। যখন বৃষ্টি হয় ঐ খালে পানি ধরে রাখার কোনো সক্ষমতা থাকে না। ফলে জলমগ্ন হয়ে পড়ে চট্টগ্রাম শহরের নিুাঞ্চলগুলো। চট্টগ্রাম শহরে প্রকৃতি প্রদত্ত যেসব জলাধার ছিল, যেমন অনন্য আবাসিক, বাকলিয়ার কল্পলোক, নতুন চান্দগাঁও থানা থেকে রাহাত্তারপুল পর্যন্ত রাস্তার পশ্চিমপাশের জলাধার, বিভিন্ন ইমারতের দোহাই দিয়ে এসব জলাধারগুলোকে ভরাট করা হয়েছে। নগরীতে যে পুকুরগুলো ছিল তারই বেশিরভাগ ভরাট করা হয়েছে। ফলে শহর বর্ষা মৌসুমে জলমগ্ন বা জলাবদ্ধতায় পরিণত হয়। আমরা এককভাবে সিটি কর্পোরেশনকে দায়ী করলে ভুল হবে। এই দায় স্থানীয় সরকারের আরও দুটি প্রতিষ্ঠানও দায়ী। যেমন সিডিএ ও ওয়াসা। যেহেতু সিডিএ নগরায়নের ক্ষেত্রে কাজ করার কথা থাকলেও কোনো জলাধার সংরক্ষণে কাজ করেনি এবং নিুাঞ্চলগুলো জলমগ্ন থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য ভূ-গর্ভস্থ কোনো জলাধারও নির্মাণ করেনি। বরঞ্চ কল্পলোক, অনন্য আবাসিকের মতো এলাকাগুলো প্রকৃতি প্রদত্ত জলাধার ছিল। সেগুলো নগরায়নের নামে ভরাট করে ধ্বংস করা হয়েছে। ওয়াসা সুয়ারেজ করার কথা থাকলেও সে শুধু পানি সাপ্লাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যস্ত। সুয়ারেজের মাটি সিটি কর্পোরেশনের নালা হয়ে অভ্যন্তরীণ খালগুলোর মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীতে এসে পড়ছে। সুয়ারেজ না করার কারণে সুয়ারেজের মাটির কারণে নিচু অঞ্চলগুলো ভরাট হচ্ছে। যেসব কালো পানি ও মাটি আমরা নালা এবং শহরের খালগুলোতে দেখি প্রথমে মনে হয় এগুলো কোনো কারখানার ময়লা পানি ও মাটি, আসলে এগুলো সুয়ারেজ মিশ্রিত পানি ও মাটি। চট্টগ্রাম শহরের অভ্যন্তরীণ ৭০টি খালের কোনো জলজ উদ্ভিদ পাওয়া যায় না। সুয়ারেজের কারণে এসব জলজ উদ্ভিদ প্রাণী ধ্বংস হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। অথচ ঢাকা শহরে নালার মধ্যে টাকি মাছ পাওয়া যায়। ঢাকা শহরের নালার পানি হাতিরঝিলের বয়াম কমিউনিটি সেন্টারের পথ দিয়ে পড়ছে। সেই পানি ওয়াসা সংগ্রহ করে ঢাকার মানুষকে খাওয়াচ্ছে। আমরা কেন পিছিয়ে পড়ছি? কারণ সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, সিডিএ এসব তিনটি প্রতিষ্ঠান অদক্ষতার কারণে আমাদের প্রকৃতি প্রদত্ত চট্টগ্রামকে আজকের আবর্জনার শহর, জলাবদ্ধতার শহর হিসেবে চিনি। এখন উপায় কী? কীভাবে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব? (১) চট্টগ্রাম শহরের অভ্যন্তরে যেসব খাল রয়েছে তার গভীরতা বৃদ্ধি করে জলাধার হিসেবে উপযোগী করা; (২) প্রতিটি খালের মুখে ভরাকাটালের সময় জোয়ারের পানি প্রবেশ করতে না পারে, সে লক্ষ্যে ফটক তৈরি করা; (৩) যেসব অঞ্চল জলমগ্ন হয় সেখানে ভূ-গর্ভস্থ জলাধার নির্মাণ করা; (৪) যেসব খাল করার প্রস্তাবনা রয়েছে তা শীঘ্রই বাস্তবায়ন করা; (৫) ওয়াসাকে সুয়ারেজ করতে বাধ্য করা; (৬) বর্তমানে যে পুকুরগুলো রয়েছে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা; (৭) ফ্লাইওভারের দুই পিলারের মাঝখানে যে জায়গাটা রয়েছে বর্ষাকালীন সময়ে বৃষ্টি পানি সংগ্রহের ক্ষেত্রে ঐ জায়গায় পানির ট্যাংক তৈরি করা; (৮) কাপ্তাই বাঁধের উপরে অতিরিক্ত পানির কারণে বাঁধ রক্ষার্থে গেইট খুলে দেওয়ার সময় কর্ণফুলীর নদীর জোয়ার ভাটার হিসাবটি রেখে যেন খুলে দেয়া হয়। উপরোক্ত সমস্যা দীর্ঘদিনের, সমাধানও একদিনে সম্ভব নয়। এই সমস্যা নিরসনে কাজ শুরু করলে একদিন স্থায়ী সমাধান পেয়ে যেতে পারি। এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ এ তিন প্রতিষ্ঠানের লাগাম টেনে ধরার কাজটি এই মন্ত্রণালয় করতে পারে এবং সমন্বয়ও করতে পারে। লেখক: সংবাদ ও মানবাধিকার কর্মী

Leave a Reply

%d bloggers like this: