চট্টগ্রামে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবপাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৭ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার: চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন শাখায় কর্মরত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।1
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্প্রতি শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে পাচার হওয়া ৭৫ জনের নাম ও পাসপোর্ট নম্বরসহ একটি তালিকা তৈরি করেছে গোয়েন্দা সংস্থা। আর এই পাচারের সঙ্গে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন শাখায় কর্মরত অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (এডিসি) আরেফিন জুয়েল, সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি-ইমিগ্রেশন) পলাশ কান্তি নাথ, এএসআই সবিরুল খানসহ ৮ কর্মকর্তার জড়িত থাকার তথ্যও উঠে এসেছে।
এই ৭৫ জনের মধ্যে তালিকার এক নম্বরে সুমন বেপারি (পাসপোর্ট নম্বর অঊ ০৮১৯৪৭১) নামে একজন আছেন যিনি গত ৩ আগস্ট শাহ আমানত বিমানবন্দর দিয়ে লিবিয়া চলে গেছেন। তার বাবা মেজবাহ উদ্দিন বেপারি সম্প্রতি সিভিল এভিয়েশন বিভাগে চিঠি দিয়ে ছেলের সন্ধান চেয়েছেন। এছাড়া ইমিগ্রেশন বিভাগের বিরুদ্ধে মানবপাচারে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন সুমনের বাবা।
জানতে চাইলে চিঠি পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করেন চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিভিল এভিয়েশন বিভাগের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার রিয়াজুল কবীর। তিনি ক বলেন, ইমিগ্রেশন বিভাগ তো আমার অধীনে নয়। এসব বিষয় তদন্তের এখতিয়ারও আমার নেই। তবে পাচার হয়ে যাওয়া একজনের পিতা মেজবাহ যে অভিযোগ করেছেন সেটি আমি নিয়ম অনুযায়ী সিএমপি কমিশনারের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। এছাড়া বিষয়টি আমি আমার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করেছি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিএমপি কমিশনারের মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ইমিগ্রেশন বিভাগ আমার অধীনে নয়। এটি প্রশাসন বিভাগের অধীন। এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) সালেহ মোহাম্মদ তানভির বলেন, ইমিগ্রেশন বিভাগ আমার অধীনে নয়। এটি অপরাধ বিভাগের অধীন। তারপরও বলছি, ইমিগ্রেশন বিভাগ নিয়ে লিখিত কোন অভিযোগ উঠেছে কিনা আমি জানি না। যদি এরকম কোন অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে নিশ্চয় কমিশনার তদন্তের নির্দেশ দেবেন।
এর আগে গত ১২ অক্টোবর রাতে সন্দেহজনক ভিসা নিয়ে দুবাই চলে যাওয়ার সময় শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে ৩৯ জনকে উদ্ধার করে র‌্যাব-৭। একইদিন একই ধরনের ভিসা নিয়ে ২১ জন নির্বিঘেœ ইমিগ্রেশন পার হয়ে দুবাই চলে যাওয়ার তথ্যও জানিয়েছিল র‌্যাব।
র‌্যাব জানায়, ৩৯ জনের মধ্যে ১৯ জনের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হয়েছিল। তাদের প্রত্যেকের ভিসা ছিল ৫ অক্টোবর থেকে ৩০ দিনের। বাকি ২০ জনের মধ্যে ১০ জুন শেষ হয়ে গেছে এমন ভিসা ছিল দুটি। ১০ জুনের চারটি ভিসার ফটোকপি ছিল। বাকি সব ভিসার মেয়াদ ছিল মাত্র একদিন।
র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে.কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ ইমিগ্রেশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছিলেন, সন্দেহজনক ভিসায় কিভাবে ২১ জন ইমিগ্রেশন পার হয়ে দুবাই যেতে পারল ? ১৯ জনের ইমিগ্রেশন কিভাবে সম্পন্ন হয়েছিল ?
র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লে.কর্নেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, যাদের আমরা উদ্ধার করেছি তাদের অধিকাংশই সিলেটের। সিলেটে তো দুবাইয়ের ফ্লাইট আছে। তারা সিলেট থেকে বিমানে না উঠে চট্টগ্রামে আসল কেন, সেটা আমরা জানতে চেয়েছিলাম। তারা বলেছেন, চট্টগ্রামে ইমিগ্রেশন পার হওয়া সহজ। দালালরা তাদের চট্টগ্রাম দিয়েই দুবাই হয়ে লিবিয়া পাঠাতে আগ্রহী।
১৩ অক্টোবর র‌্যাব কার্যালয়ে উদ্ধার হওয়া কয়েকজন জানান, তাদের প্রত্যেককে ইমিগ্রেশন পার করানোর জন্য ৩০ হাজার টাকা করে পুলিশকে দেয়া হয়েছিল।
এদিকে মেজবাহ উদ্দিন বেপারি সিভিল এভিয়েশন বিভাগে যে চিঠি দিয়েছেন তাতে তিনি বিমানবন্দরে কর্মরত আত্মীয়ের বরাত দিয়ে মানবপাচারের সঙ্গে ইমিগ্রেশন পুলিশের জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। এতে বলা হয়, এএসআই সবিরুল খান ও এসআই নূরুল আলম সিদ্দিকী লিবিয়া, সিরিয়া ও ইরাকে মানবপাচারে জড়িত দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। বেসরকারি দুটি বিমান সংস্থার কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বড় অংকের টাকার বিনিময়ে বোর্ডিং পাস নিয়ে দেন এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা।
এরপর সন্দেহজনক ভিসায় ইমিগ্রেশন পার করে দেয়ার জন্য যাদের দায়ী করা হয়েছে তারা হলেন, এডিসি আরেফিন জুয়েল, এসি পলাশ কান্তি নাথ, পরিদর্শক মাহফুজ, এএসআই মো. শাহজাহান আলী (বর্তমানে ইমিগ্রেশন থেকে বদলি হয়ে গেছেন), এএসআই হাবিবউল্লাহ এবং এএসআই ফরিদ আহমেদ।
এই ৮ জনের সঙ্গে চট্টগ্রামের জনশক্তি ও কর্মসংস্থার ব্যুরোর কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম টিপু, আশরাফ ও মোশাররফ এবং নগরীর দেওয়ানহাটের এনি ট্রাভেলসের মালিক জসিম জড়িত বলে মেজবাহ অভিযোগ করেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন জসিম লিবিয়া যাওয়ার টিকেট সংগ্রহ করে দিয়েছিল। পুলিশ কর্মকর্তাসহ সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য সংগ্রহ করে ছেলে সুমন বেপারিকে খুঁজে দেয়ার আবেদন করেছেন মেজবাহ।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এডিসি আরেফিন জুয়েল বলেন, সব মিথ্যা কথা। আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সব নিয়মকানুন মেনেই ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হয়। এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন সুযোগ নেই।
এসি-ইমিগ্রেশন পলাশ কান্তি নাথ বলেন, আমরা ভাল কাজ করছি। ভালভাবে ইমিগ্রেশন বিভাগ পরিচালনা করছি। এতে অনেকের স্বার্থে আঘাত লেগেছে। তদবির না শুনলে অনেকের স্বার্থে আঘাত লাগে। এজন্য ষড়যন্ত্র করে আমাদের সরাতে চায় একটি মহল।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) সালেহ মোহাম্মদ তানভির বলেন, র‌্যাব যাদের বিমানবন্দর থেকে নিয়ে গিয়েছিল তাদের কারও ভিসাই জাল ছিল না। পর্যাপ্ত নথিপত্র ছিল বলেই তাদের ইমিগ্রেশন ত্যাগের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। আমি খোঁজ নিয়ে বিষয়টি জেনেছি।
মানবপাচারের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসি বলেন, আমাদের মন্ত্রণালয়ের অধীনে টাস্কফোর্স আছে। টাস্কফোর্সের মাধ্যমে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি। এক্ষেত্রে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগের দায়দায়িত্ব আছে। ইমিগ্রেশন বিভাগ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন। তবে আমরা মানবপাচারকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি। মেজবাহ উদ্দিন বেপারি যা বললেন প্রতিবেদন প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগের সহকারি কমিশনার পলাশ কুমার নাথ তিনি একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে মেজবাহ উদ্দিন বেপারির সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ করেন।
ফোনে যোগাযোগ করা হলে মেজবাহ উদ্দিন বেপারি বলেন, আমার ছেলে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর দিয়ে দুবাই হয়ে প্রথমে লিবিয়া যায়। এরপর লিবিয়া থেকে ইতালি চলে গেছে। কয়েকদিন আগে ছেলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছে।

সিভিল এভিয়েশনের কাছে লিখিত কোন অভিযোগ করেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি লিখিত কিংবা মৌখিকভাবে কোন অভিযোগ করিনি। পুলিশের পক্ষ থেকে চাপের মুখে এমন কথা বলছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, না, না, পুলিশ আমাকে কোন চাপ দেয়নি।
তার ছেলের দুবাই যাবার ভিসা ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমরা একটা ব্যবস্থা করছিলাম আর কি। এক কর্মকর্তাকে দিয়ে কিছু কাগজপত্র বের করছিল আমার ছেলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*