চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত উদ্যোগ ও কার্যক্রম বিষয়ে মেয়রের সংবাদ সম্মেলন

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ০৪ জুলাই ২০১৭, মঙ্গলবার: চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ও সাম্প্রতিক বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরীর ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত করণে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের গৃহীত উদ্যোগ ও কার্যক্রম বিষয়ে দুপুরে নগরভবনের কে বি আবদুচ ছত্তার মিলনায়তনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আলহাজ্ব আ জ ম নাছির উদ্দীন সংবাদ সম্মেলন বলেন, চট্টগ্রাম নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে অবস্থিত ১৪৪ কি.মি. খাল এবং প্রায় ৬ শত কি.মি. নালা-নর্দমা পরিষ্কার করার জন্য ১৮ কোটি টাকার দরপত্র আহবান করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু কাজ সমাপ্ত হয়েছে। কিছু কাজ চলমান রয়েছে এবং অবশিষ্ট কাজের কার্যাদেশ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়াও শ্রমিক নিয়োগ করে নিজস্ব ও ভাড়াকৃত এস্কেভেটর এর মাধ্যমে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ খাল সমূহে প্রতিনিয়ত মাটি উত্তোলনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি আরো বলেন, প্রতি বছর বর্ষাকালে পাহাড় থেকে নেমে আসা বালিতে নালা-নর্দমা ভরাট হয়ে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। ফলে ভরাটকৃত বালি ও ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্য প্রকল্প নেয়া হয়। গত অর্থবছরেও নালা-নর্দমা পরিষ্কার করার জন্য ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নালা-নর্দমা পরিষ্কার করা হয়েছে। এ ছাড়াও বিমান বন্দর সড়কের সিমেন্ট ক্রসিং থেকে রুবি সিমেন্ট ফ্যাক্টরী পর্যন্ত রাস্তার অংশে জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য ৪ হাজার ৬ শত ফুট ড্রেইন নির্মাণ কাজের জন্য ৬ কোটি ২৪ লক্ষ ৩২ হাজার টাকার দরপত্র আহবান করা হয়েছে। মেয়র বলেন, প্রায় ৩২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বহদ্দারহাট বারইপাড়া হয়ে কর্নফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ খাতে বর্তমানে ৬০ কোটি টাকা মন্ত্রনালয় থেকে ছাড় দেয়া হয়েছে। যা ভূমি অধিগ্রহনের জন্য ব্যয় হবে। জনাব আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা সমূহের উন্নয়ন এবং নালা, প্রতিরোধ দেয়াল, ব্রীজ ও কালভার্ট নির্মান প্রকল্পে ৭ শত ১৬ কোটি ২৮ লক্ষ টাকার আওতায় ২৩৪টি রোড সংলগ্ন ড্রেইন, ৬৯টি ড্রেইন, ২২টি ব্রীজ, ৪টি কালভার্ট নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি বলেন, মহেশখালে বাঁধ নির্মাণের ফলে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় গত জুন মাসে তা অপসারণ করা হয়। মহেশখাল, চাক্তাইখাল সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খালে এস্কেভেটর মাধ্যমে মাটি উত্তোলন ও অপসারণ কাজ চলমান রয়েছে। তা ছাড়াও মহেশখাল থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটি ড্রাইভারশান খাল খনন বিষয়ে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যাতে বর্ষনজনিত কারণে সৃষ্ট পানি সহজে বঙ্গোপসাগরে চলে যেতে পারে। মেয়র বলেন, সিটি গভর্নেন্স প্রকল্পের আওতায় জাইকার অর্থায়নে ১ শত কোটি টাকা ব্যয়ে মহেশখাল, সুরভীখাল, ডাইভারশন খালে খাল সংলগ্ন রাস্তা ও রিটেইনিং ওয়ালের কাজ চলমান রয়েছে এবং প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮টি ব্রীজ নির্মাণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম নগরের আওতায় সংসদ সদস্যদের নির্ধারিত প্রকল্পে ডোমখালের উপর ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রীজ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। জনাব আ জ ম নাছির উদ্দীন সাংবাদিকদের অবগতির জন্য আরো বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং চীনের সরকারী প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়নার সাথে জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে ২৭টি স্লুইচ গেইট, বড় খাল সমূহের দু’পাশে রিটেইনিং ওয়াল এবং খাল সমূহের ড্রেজিং এর জন্য ৫ হাজার ৬ শত কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটি পিডিপিপি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন হয়েছে এবং প্রকল্পটি জি টু জি এর মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য ইআরডি-তে প্রেরণ করা হয়েছে। বর্তমানে ডিপিপি প্রস্তুতির কাজ চলছে। মেয়র বলেন, সাম্প্রতিক বর্ষণে নগরীর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এতে ক্ষতির পরিমান আনুমানিক ৫শত কোটি টাকা। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সমূহের তথ্য তুলে ধরে বলেন, পোর্ট কানেকটিং রোড ৬কি.মি., আগ্রাবাদ একসেস রোড ২কি.মি., ডি.টি. রোড ৬কি.মি.,স্ট্যান্ড রোড, ৩ কি.মি.,আগ্রাবাদ শেখ মুজিব রোড ২ কি.মি., সিডিএ এভিনিউ রোড ৬ কি.মি.,আরাকান রোড ৭ কি.মি., হাটহাজারী রোড ৩ কি.মি.,বায়োজিদ বোস্তামী রোড ৫ কি.মি.,কাপাসগোলা রোড ২ কি.মি., ফিরিঙ্গীবাজার মেরিনার্স রোড ৩কি.মি., জুবিলী রোড ১ কি.মি., খাজা রোড ৫ কি.মি., মিয়াখান রোড ৩ কি.মি., হালিশহর রোড ৩ কি. মি. ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সমস্ত রাস্তা চসিকের মালামাল দ্বারা পট-হোল মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। বৃষ্টির সময় ব্রীক সলিং ও খোয়া দ্বারা মেরামত করা হচ্ছে। অনুকুল আবহাওয়া ফিরে আসলে এ্যাসফল্ট প্ল্যান্ট দ্বারা কার্পেটিং করে দেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, জিওবি প্রকল্পের আওতায় নতুন একটি এ্যাসফল্ট প্ল্যান্ট বসানো হচ্ছে, যাতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সড়কের মেরামত কাজ স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বর্তমানে সরকারী অর্থায়নে চলমান প্রকল্পের বিবরণ তুলে ধরে বলেন, এ্যাসফল্ট প্ল্যান্ট প্রকল্পে প্রায় ২শত কোটি টাকা, বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাসমূহের উন্নয়ন ও নালা নর্দমা ও ব্রীজ কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পে প্রায় ৭ শত ১৬ কোটি ২৮ লক্ষ টাকা, বহদ্দারহাট বারইপাড়া হতে কর্নফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্পে প্রায় ৩২৭ কোটি টাকার প্রকল্প রয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় কিছু কিছু কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে এবং কাজ চলমান আছে এবং বাকী কাজের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মেয়র বলেন, সমাজের দর্পন গণমাধ্যম এ মাধ্যমে জনগনের স্বার্থে সংবাদ পরিবেশিত হলে দেশের সুনাম ও সুখ্যাতি বৃদ্ধি পাবে। মহেশখালের কার্যক্রম এবং আগামী পরিকল্পনা বিষয়ে একটি ম্যাপ তুলে ধরে তিনি বলেন, মহেশখালের পানি কর্ণফুলী নদীতে প্রবাহের পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে প্রবাহের লক্ষ্যে ড্রাইভারশান খাল খনন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নগরীর খালগুলোর জরিপ কাজ চলমান আছে। জরিপ শেষে খালের দু’পাড়ে রাস্তা নির্মাণ এবং অবৈধ দখল ও স্থাপনা চিরতরে উচ্ছেদ করা হবে। খালের পাড়ে কোন বসতি গড়ে তুলতে দেয়া হবে না। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নানা কারণে সৃষ্টি হয়, তৎমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, কাপ্তাই বাঁধের পানি ছাড়া, অতিবর্ষন, পাহাড়ের বালি মাটি মিশ্রন, খাল-নালা দখল, জলাদার ও জলাশয় কমে যাওয়া এবং খাল-নালার ধারন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া। মেয়র বলেন, প্রকৃতি সৃষ্ট দুর্ভোগ লাঘব করা দু’সাধ্য বিষয় তবে মানব সৃষ্ট দুর্ভোগ লাঘব করা জনসচেতনতার মাধ্যমে সম্ভব। স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা, সোয়ারেজ ও মাষ্টার প্লান্ট বাস্তবায়িত হলে নাগরিক দুর্ভোগ অনেকাংশে নিরসন করা সম্ভব হবে। প্রসঙ্গেক্রমে মেয়র বলেন, অতীতের তুলনায় জলাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট নাগরিক দুর্ভোগ কিছুটা কমেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি কয়েকটি স্থানের উদাহরন তুলে ধরে বলেন, ফ্লাইওভার নির্মাণ, ওয়াসা, পিডিবি ও টিএন্ডটি ও গ্যাস কোম্পানীর রোড কাটিং এর কারণে নগরীতে জনদুর্ভোগ অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারী এ কাজে বাধা দেয়ার কোন সুযোগ তাঁর নেই। এ প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, আগ্রাবাদ এক্সেস রোড প্রায় ৩ ফুট উচু করে রাস্তার দু’পাশে বৃহৎ আকারের নালা নির্মাণ প্রকল্প এবং পোর্ট কানেকটিং রোডে ৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়েছে। বর্ষন বন্ধ হলে এ সকল সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু হবে। প্রসঙ্গেক্রমে মেয়র আরো বলেন, মহেশখাল সহ সকল খালের মুখে স্লুইচ গেইট নির্মাণের পরিকল্পনা ও প্রকল্প পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, সাংবাদিক সমাজও চট্টগ্রামের সম্মানিত নাগরিক। ক্ষতিকর বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষন করে লিখনির মাধ্যমে জনকল্যাণধর্মী কার্যক্রম তুলে ধরা হলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে এবং দেশের সম্মান ও সুখ্যাতি বৃদ্ধি পাবে। এক শ্রেণীর অপশক্তি সুযোগ বুঝে প্রকৃতিগতভাবে সৃষ্ট জনদুর্ভোগকে পুঁজি করে যাতে ফায়দা লুটার চেষ্টা করতে না পারে সেবিষয় গুলো বিবেচনার আনার কথা উল্লেখ করে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদনক্রমে ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে রাজস্ব ও এডিপি’র আওতায় ৭১৭টি প্রকল্পের মাধ্যমে ২২০ কোটি ৫৫ লক্ষ ৮০ হাজার টাকার উন্নয়ন, ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে ৯৯২টি প্রকল্পের অধীনে ৪৩১ কোটি ৮৫ লক্ষ ২৬ হাজার টাকার প্রকল্প এবং জাইকার অর্থায়নে সিটি গভর্নেন্স প্রকল্পের অধীনে ১৮টি প্রকল্পে ৬ শত ৪০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলমান আছে। এ ছাড়াও এডিপিভুক্ত প্রকল্প সমূহের মধ্যে ১৯৯ কোটি ৯৯ লক্ষ ২৫ হাজার টাকার চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকার রাস্তা সমূহ অ্যাসফল্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে উন্নয়ন, ৭ হাজার ১ শত ৬২ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন আওতাধীন বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাসমূহের উন্নয়ন এবং নালা, প্রতিরোধ দেওয়াল, ব্রীজ ও কালভার্টের নির্মাণ ও পুন:নির্মাণ প্রকল্প, ৩২৬ কোটি ৮৪ লক্ষ ৮১ হাজার (সংশোধিত প্রস্তাবিত ব্যয় ৬১৫ কোটি ৩১ লক্ষ) টাকা ব্যয়ে বহদ্দারহাট হতে বারই পাড়া হয়ে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্প, ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে সোলার স্ট্রীট লাইটিং প্রোগ্রাম ইন সিটি কর্পোরেশন (এডিবি) প্রকল্প এবং ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে আরএডিপি তে অন্তর্ভুক্ত এবং আইপিইসি সভায় অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে ৮৮৪ কোটি ৮ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং ব্রীজ সমূহের উন্নয়ন সহ আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সড়ক আলোকায়ন, ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত সংসদ সদস্যদের অধীনস্থ বিভিন্ন এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে। অতিবর্ষন ও অতি জোয়ারের পানির কারণে নগরীতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় নাগরিক দুর্ভোগের জন্য সংবাদ সম্মেলনে দুঃখ প্রকাশ করেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*