চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ইতিহাস

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১১ ফেব্র“য়ারী: কর্ণফুলীর কালুরঘাট রেল সেতু। এর বয়স প্রায় ৮৪ বছরেরও বেশি হবে। তবে প্রাগৌতিহাসিক যুগ হতে নদী পারাপারের জন্য স্থানটি কালুরঘাট নামে নদী পারাপারে ভূমিকা রেখে আসলেও ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে এ রেল সেতুটি নির্মিত হয়। স্থানীয় ভাবে কালুরঘাট সেতুটি কালুরঘাটের পোল নামে বহুল পরিচিত। আশি বছরের পুরাতন এ সেতুটি দক্ষিণাংশের একমাত্র সংযোগ মাধ্যম ছিল এক দশক পূর্বে শাহ আমানত কর্ণফুলী সেতুর উদ্বোধনের পূর্ব পর্যন্ত। তাই একে দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রবেশ দ্বারও বলা হয়। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বার্মা ফ্রন্টের সৈন্য পরিচালনা করার জন্য কর্ণফুলী নদীতে ব্রীজ নির্মাণের প্রয়োাজনীয়তা দেখা দেয়। ফলে ১৯৩০ সালে ব্রুনিক এন্ড কোম্পানী ব্রীজ বিল্ডার্স হাওড়া নামক একটি ব্রীজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ব্রীজটি নির্মাণ করে। মুলত ট্রেন চলাচলের জন্য ৭শ গজ লম্বা সেতুটি। বর্তমানে কালুরঘাট রেল সেতুটি কর্ণফুলী নদী নামে পরিচিত।River
যেভাবে হলো কর্ণফুলী নদীর নামকরণ…..এটি ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড়ে শুরু হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার কাছে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। এই নদীর মোহনাতে বাংলাদেশের প্রধান সমূদ্র বন্দর চট্টগ্রাম বন্দর অবস্থিত। এই নদীর দৈর্ঘ্য ৩২০ কিলোমিটার।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিস্তীর্ণ জনপদের প্রাণপ্রবাহ বলতে গেলে কর্ণফুলী নদী। যেটি ভারতের লুসাই পর্বতমালার পাদদেশ থেকে বেয়ে রূপসী কর্ণফুলী পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে চট্টগ্রামের বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। বহু বন্ধুর পথ পেরিয়ে আসা কর্ণফুলী চট্টগ্রামের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে উপজীব্য হয়েছে। এই কর্ণফুলীর নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা লোকগাথা, উপকথা, রূপকথা। কর্ণফুলী নদীর নামের উৎস সম্পর্কে বিভিন্ন কাহিনী প্রচলিত আছে। কথিত আছে যে, আরাকানের এক রাজকন্যা চট্টগ্রামের এক আদিবাসী রাজপুত্রের প্রেমে পড়েন। এক জ্যোৎস্না-স্নাত রাতে তারা দুই জন এই নদীতে নৌভ্রমণ উপভোগ করছিলেন। নদীর পানিতে চাঁদের প্রতিফলন দেখার সময় রাজকন্যার কানে গোঁজা একটি ফুল পানিতে পড়ে যায়। ফুলটি হারিয়ে কাতর রাজকন্যা সেটা উদ্ধারের জন্য পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু প্রবল স্রোতে রাজকন্যা ভেসে যান, তার আর খোঁজ পাওয়া যায় নি। রাজপুত্র রাজকন্যাকে বাঁচাতে পানিতে লাফ দেন, কিন্তু সফল হন নি। রাজকন্যার শোকে রাজপুত্র পানিতে ডুবে আত্মাহুতি দেন। এই করুণ কাহিনী থেকেই নদীটির নাম হয় ‘কর্ণফুলী’। মার্মা উপজাতিদের কাছে নদীটির নাম কান্সা খিওং।
তবে সবচেয়ে প্রচলিত কিংবদন্তি হলো- এই অঞ্চলে একজন মগরাজা ছিলেন। প্রাচীন কালের সেই রাজার ছিলো একটি মাত্র কন্যা। সেই কন্যাকে রাজা ভালবাসতো ভীষণ। এই কন্যা হাসলে সূর্য উঠতো, কাঁদলে বৃষ্টি নামতো। হাঁটলে বাতাস বইতো, তাকালেই ফুল ফুটতো। এই অপরূপা রাজকুমারী গোসল করতো পাহাড়ি ছড়ার জলে। ঝিরঝিরিয়ে বয়ে যেতো ছড়ার জল। একদিন নদী বেয়ে এক সওদাগর এলো। যুব সওদাগরের নধরকান্তি দেখে রাজকন্যা বিমোহিত। দু’জনের চোখের পলক আর পড়ে না। একে অপরের প্রেমে পড়ে। তারপর দিনগুলো রঙিন আর রাতগুলো স্বপ্নিল হয়ে ওঠে দু’জনের। দিন যায়, মাস যায়। তাদের প্রেমের কথা এক কান, দুই কান করতে করতে ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে যুবক সওদাগরের বাণিজ্যের বহর গুটিয়ে অন্যবন্দরে পাল তোলার সময় হয়ে যায়। যুবক সওদাগর যাওয়ার কালে রাজকন্যাকে এই প্রতিশ্র“তি দিয়ে যায় যে, অচিরেই ফিরে এসে তাকে বিয়ে করে বিদেশে নিয়ে যাবে। তার স্মৃতির চিহ্ন হিসাবে রাজকন্যাকে একজোড়া কানের ফুল দিয়ে যুবক সওদাগর অন্যবন্দরের উদ্দেশ্যে পাল তোলে।
তারপর কানের ফুল পরে রাজকন্যা ঘুরে বেড়ায়। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। কিন্তু সওদাগর আর ফিরে আসে না। রাজকন্যা প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নদীর তীরে অপেক্ষা করে। রাজকন্যার অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হয় না। দিনে দিনে বেড়ে ওঠে বিরহব্যথা।
এদিকে রাজার চোখে ঘুম নেই দেখতে দেখতে তার ছোট্ট মেয়েটি বড় হয়ে গেছে। সুপাত্রে কন্যা দান করতে হবে। অবশেষে দেখে-শুনে রাজা তার কন্যার বিবাহ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ে রাজ্যময়। এক কান, দুই কান, করতে করতে খবর শেষে রাজকন্যার কানেও আসে।
রাজকন্যা আর কি করে। বিরহব্যথায় কাতর হয়ে, অবশেষে নদীর পাড়েই কাঁদতে বসে। দিনে দিনে দিন চলে যায়। কান্না আর শেষ হয় না। জীবন থাকতে সওদাগর ছাড়া আর কাউকে মালা দিতে পারবে না রাজকন্যা। এদিকে সওদাগরও আসছে না। একদিন পাগলপারা রাজকন্যার কানের ফুল হারিয়ে যায় নদীর বুকে। খুঁজতে খুঁজতে অস্থির হয়ে পড়ে কন্যা। শেষ পর্যন্ত আর খুঁজে পায় না। রাজকন্যার মনে করে সওদাগর আর আসবে না কোন দিন। কানের ফুল হারিয়ে যাওয়া যেন তারই লক্ষণ।
হতাশ, ক্লান্ত রাজকন্যা আরেক কানের ফুল তীরে খুলে রেখে, গায়ের জড়ানো ওড়না খুলে নদীর বুকে আত্মাহুতি দিয়ে প্রেমের মর্যাদা দেয়। সকলেই পরের দিন এসে দেখে রাজকন্যার ওড়না আছে, কানের ফুল আছে কিন্তু রাজকন্যা নেই। কিছুই বুঝতে আর বাকী থাকে না কারো। রাজকন্যা আর নেই। শোকে পাথর হয়ে রাজাও রাজ্য ছেড়ে চলে যায়। সেই থেকে এই নদীর নাম হয়ে যায় কর্ণফুলী।

Leave a Reply

%d bloggers like this: