ঘুম : মন-মনন ও মস্তিষ্ককে স্বস্তি দেয়

সাকী মাহবুব, ৭ জুলাই ২০১৭, শুক্রবার: আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষকে যত প্রকার নেয়ামত দান করেছেন ঘুম বা নিদ্রা তার মধ্যে এক শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। কুরআন মাজিদে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য নিদ্রাকে করেছি ক্লান্তি নিবারক আর রাতকে করেছি আবরণ’। (সূরা নাবা : ০৯-১০) অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের জন্য রাত্রিকে আবরণ, ঘুমকে ক্লান্তি নিবারক ও দিনকে জীবন প্রবাহ করেছেন।’ (সূরা ফোরকান : ৪৭) ক্লান্ত শ্রান্ত অবসন্ন দেহ মনের প্রশান্তি হিসেবেই আল্লাহ তায়ালা ঘুম সৃষ্টি করেছেন, যা মানুষের সব রকম অবসাদ দূর করে। মন-মনন ও মস্তিষ্ককে স্বস্তি দেয়। যার বিকল্প অন্য কিছু হতে পারে না। পোশাক যেমনি শরীরকে ঢেকে রাখে, নিরাপদ রাখে। তেমনি রাতের আঁধারো প্রকৃতিকে ঢেকে নেয়। ফলে ঘুমের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিষাদ দূর করে। দেহ মনে সজীবতা ফিরে আসে। সে জন্যই রাতকে আবরণ বলা হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তায়ালা শুধু ঘুমের মতো অপরিহার্য নেয়ামতই দেননি, তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশও সৃষ্টি করেছেন। গবেষণা করলে বোঝা যায়, ঘুমটা বিশাল নেয়ামত। ঘুমই মানুষের সুখের মূল। মানুষ যতই শক্তিশালী হোক, যতই সুস্বাস্থের অধিকারী হোক, একটানা পরিশ্রম করতে সক্ষম নয়। এক সময় ক্লান্তি অবসাদ তার দেহে নেমে আসেই। সেই ক্লান্তি দূর করা ছাড়া সে তার মেহনতকে ধরে রাখতে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সেই ক্লান্তিকে দূর করার জন্যই আল্লাহ তায়ালা ঘুমের মতো এক মহা নেয়ামত সৃষ্ট জীবকে দান করেছেন। মানুষ একটানা যতই মেহনত করুক ঘুম বা নিদ্রার কোলে কিছুক্ষণের জন্য আশ্রয় নিলে তার শরীর আগের মতো সতেজ ও চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কোনো ক্লান্তি তার অবশিষ্ট থাকে না। মানুষ যতই ধনসম্পদের অধিকারী হোক, আরাম আয়েশ, শান্তি সুখের যতই আসবাব তার কাছে মজুদ থাক, নিদ্রা বা ঘুম না আসে, তা হলে নিঃসন্দেহে তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে এবং ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে আসবে তার আকল জ্ঞান। এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা বাতাস ও পানির মতো নিদ্রাকেও সবার জন্য ব্যাপক করেছেন। ফলে ধনী-নির্ধন, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, রাজা-প্রজা, কুলি-মজুর সবাই এ নেয়ামত প্রাপ্ত হয়ে থাকে। সমাজজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অভাবী ও শ্রমজীবীরা যেহারে এ নেয়ামত ভোগ করে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসায় নরম তোষক ও কোমল বালিশধারীরা তা পায় না। এতে বোঝা যায়, ঘুম কোনো আয়েশ উপকরণের অনুগামী নয়। একমাত্র আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ। শুধু তার কাছ থেকেই আসে।
কখনো কখনো দেখা যায় ক্লান্ত শ্রমিক কিংবা কোনো রাজপথের টোকাই ছেলে ভরদুপুরে খোলা আকাশের নিচে ঘুমে বিভোর। অথচ বেচারার মাথার নিচে একটি বালিশও নেই। অন্য দিকে বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, কোটিপতিরা ডজন ডজন ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েও ঘুমাতে পারছেন না। ভেবে দেখার বিষয় এ অসীম নেয়ামত শুধু বিনা মূল্যেই দেয়া হয়নি, বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কখনো কাজের আধিক্যে মানুষ সারা রাত কাজ করতে চায়। কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহ তার ওপর বিজয়ী হয়। চোখ কথা শোনে না। প্রবল বেগে ঘুম নেমে আসে; যাতে কর্ম বিষাদ দূর হয়। নবোদ্যম ফিরে আসে। আরো অধিক কর্ম সম্পাদনে সক্ষম হয়। তাই তো বিস্ময় বিস্ফোরিত কণ্ঠে এয়াকুব আলী চৌধুরীর প্রশ্ন : সায়াহ্নে কাঁর শান্ত শোভায় হৃদয় মন ভরে যায়। কে শ্রমের মাঝে শান্তি আনে? ভীষণতায় মধু বহায়? আল্লাহ বলেন, ‘আমি রাতকে করেছি আবরণ, অতঃপর তাতে মানুষ ও প্রাণীদের ওপর নিদ্রা বা ঘুম চাপিয়ে দিয়েছি; যা তাদের আরাম ও শান্তির উপকরণ।’ এখানে কয়েকটি বিষয় অনুধাবনযোগ্য। প্রথমত ঘুম যে আরাম বা বিশ্রামের প্রাণ তা সবাই জানে। কিন্তু আলোর মধ্যে ঘুম আসা স্বভাবতই কঠিন। ঘুম এলেও দ্রুত ভেঙে যায়। আল্লাহ তায়ালা ঘুমের উপযোগী করে রাতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করেছেন। শীতলও করেছেন। এমনিভাবে রাত একটি নেয়ামত এবং ঘুম দ্বিতীয় নেয়ামত। তৃতীয় নেয়ামত হলো সারা বিশ্বের মানুষ ও জীবজন্তুর ঘুম একই সাথে বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। একেক জনের ঘুমের সময় ভিন্ন ভিন্ন হলেও কেউ ঘুমাত আর কেউ কাজে লিপ্ত থাকত। এতে সবারই ঘুমের বিঘ্নতা সৃষ্টি হতো। তা ছাড়া প্রত্যেক মানুষের অনেক প্রয়োজন অন্যের সাথে জড়িত। ফলে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা বিঘ্নিত হতো। এর উদ্দেশ্য যদি আন্তর্জাতিক কোনো চুক্তি হতো যে, সবাইকে ঘুমের জন্য একই সময় নির্দিষ্ট করতে হবে, তবে প্রথমত কোটি কোটি মানুষের মধ্যে এরূপ চুক্তি সম্পাদিত হওয়া সহজ ছিল না। তদুপরি চুক্তি যথাযথ পালিত হচ্ছে কিন্তু যাচাই করার জন্য হাজারো বিভাগ খুলতে হতো, এতদসত্ত্বেও সাধারণ আইন ও চুক্তিগত পদ্ধতিতে স্থিরকৃত বিষয়াদিতে ঘুষ পক্ষপাতিত্ব প্রভৃতি কারণে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি সর্বত্র পরিলক্ষিত হয় এখানেও তাই হতো। এসব বিষয় বিবেচনা করেই আল্লাহ তায়ালা স্বীয় সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে ঘুমের একটি বাধ্যতামূলক সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ফলে সামান্য কিছু নিশাচর প্রাণী ছাড়া মানুষ ও জীবজন্তুর ঘুম একই সময়ে আসে। এখন কথা হলো প্রত্যেক মানুষের জন্য কতটুকু ঘুম প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমেরিকান ডাক্তার নাথানিয়েল ক্লিটম্যান দীর্ঘ চল্লিশ বছর গবেষণা করেছিলেন। কিন্তু তিনিও কার কতটুকু ঘুম প্রয়োজন সে কথা সঠিকভাবে বলতে পারেননি। সাধারণত বিশেষজ্ঞরা ৬-৮ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেন। কিন্তু কেউ দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েই সারা দিন নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম করতে পারে। আবার কেউ কেউ ১০ ঘণ্টা ঘুমিয়েও কাজ করতে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাদের ঘুম এসে যায়। সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট যুদ্ধ ক্ষেত্রে কয়েক মিনিট চোখ বন্ধ করেই সারা দিনের ঘুমের প্রয়োজন মেটাতে পারতেন। রাসূল সা: কোনো বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন রাতে ঘুমাতেন মাত্র চার ঘণ্টা। পক্ষান্তরে, বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলতেন, রাতে যদি তিনি ১০ ঘণ্টা না ঘুমান তা হলে তিনি ঠিক করে কাজ করতে পারেন না। মূলত আমাদের শরীর বৃত্তের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও সুস্থতার জন্য ঘুমের গুরুত্ব অপরিসীম। ঘুম হলো ন্যাচারাল অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। সারা দিন পরিশ্রমের ফলে দেহের যে ক্লান্তি সৃষ্টি হয় এবং কর্মক্ষমতা হ্রাস পায় সেটিকে চাঙ্গা ও নতুন কর্মসংস্থা সৃষ্টিতে ঘুমের কোনো তুলনা হয় না। আমাদের দেশের ছাত্রছাত্রী, যুবক-যুবতীরা আজ সারা রাত ফেসবুকের পেছনে সময় নষ্ট করছে। ঘুমানোর সময় নেই তাদের, অথচ বিজ্ঞান বলছে অপর্যাপ্ত ঘুম মানুষকে অবসন্ন ও ক্লান্ত করে, যা মানুষের স্মৃতি লুপ্তির জন্য দায়ী। কাজেই স্মরণশক্তি ঠিক রাখার জন্য ও পরিমিত ঘুম খুবই জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্রোহীনতার দরুন জাতীয় অর্থনীতিতে হৃত উৎপাদনশীলতার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে বছরে প্রায় এক হাজার মার্কিন ডলার এবং জাতীয় মহাসড়ক যানবাহন চলাচল নিরাপত্তা প্রশাসন হিসেবে দিয়েছে যে, বছরে এক লক্ষাধিক গাড়ি দুর্ঘটনা মানসিক শান্তির দরুন ঘটে থাকে। এ কারণে কয়েকটি সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে যে, প্রত্যেকের দৈনিক ৮-১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। উপরিউক্ত আলোচনা থেকে জানা যায় যে, ঘুম আল্লাহর এক মহা নেয়ামত। কারো ঘুম না এলে শত চেষ্টা করেও সে ঘুমাতে সক্ষম নয়। আর কারো চোখে ঘুম এসে গেলে, সে শত চেষ্টা করেও ঘুম থেকে রেহাই পাবে না। মহান আল্লাহ যদি মানুষের ঘুমকে এখতিয়ারভুক্ত করে দিতেন, তা হলে চিরলোভী মানব একটানা পরিশ্রম করে তার শরীরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিত। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর শরীরের ক্লান্তি দূর করে শরীরকে সতেজ ও চাঙ্গা করে তোলার জন্য প্রভুর মহান নেয়ামত এ ঘুমের বিকল্প আর দ্বিতীয়টি নেই।
লেখক : প্রাবন্ধিক

ঘুম : আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত সাকী মাহবুব ০৬ জুলাই ২০১৭,বৃহস্পতিবার, ১৪:০৯ প্রিন্ট ৫৮ ০ ০ এড়ড়মষব ০ ৫৮ আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষকে যত প্রকার নেয়ামত দান করেছেন ঘুম বা নিদ্রা তার মধ্যে এক শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। কুরআন মাজিদে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য নিদ্রাকে করেছি ক্লান্তি নিবারক আর রাতকে করেছি আবরণ’। (সূরা নাবা : ০৯-১০) অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের জন্য রাত্রিকে আবরণ, ঘুমকে ক্লান্তি নিবারক ও দিনকে জীবন প্রবাহ করেছেন।’ (সূরা ফোরকান : ৪৭) ক্লান্ত শ্রান্ত অবসন্ন দেহ মনের প্রশান্তি হিসেবেই আল্লাহ তায়ালা ঘুম সৃষ্টি করেছেন, যা মানুষের সব রকম অবসাদ দূর করে। মন-মনন ও মস্তিষ্ককে স্বস্তি দেয়। যার বিকল্প অন্য কিছু হতে পারে না। পোশাক যেমনি শরীরকে ঢেকে রাখে, নিরাপদ রাখে। তেমনি রাতের আঁধারো প্রকৃতিকে ঢেকে নেয়। ফলে ঘুমের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিষাদ দূর করে। দেহ মনে সজীবতা ফিরে আসে। সে জন্যই রাতকে আবরণ বলা হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তায়ালা শুধু ঘুমের মতো অপরিহার্য নেয়ামতই দেননি, তার জন্য উপযুক্ত পরিবেশও সৃষ্টি করেছেন। গবেষণা করলে বোঝা যায়, ঘুমটা বিশাল নেয়ামত। ঘুমই মানুষের সুখের মূল। মানুষ যতই শক্তিশালী হোক, যতই সুস্বাস্থের অধিকারী হোক, একটানা পরিশ্রম করতে সক্ষম নয়। এক সময় ক্লান্তি অবসাদ তার দেহে নেমে আসেই। সেই ক্লান্তি দূর করা ছাড়া সে তার মেহনতকে ধরে রাখতে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সেই ক্লান্তিকে দূর করার জন্যই আল্লাহ তায়ালা ঘুমের মতো এক মহা নেয়ামত সৃষ্ট জীবকে দান করেছেন। মানুষ একটানা যতই মেহনত করুক ঘুম বা নিদ্রার কোলে কিছুক্ষণের জন্য আশ্রয় নিলে তার শরীর আগের মতো সতেজ ও চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কোনো ক্লান্তি তার অবশিষ্ট থাকে না। মানুষ যতই ধনসম্পদের অধিকারী হোক, আরাম আয়েশ, শান্তি সুখের যতই আসবাব তার কাছে মজুদ থাক, নিদ্রা বা ঘুম না আসে, তা হলে নিঃসন্দেহে তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠবে এবং ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে আসবে তার আকল জ্ঞান। এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা বাতাস ও পানির মতো নিদ্রাকেও সবার জন্য ব্যাপক করেছেন। ফলে ধনী-নির্ধন, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, রাজা-প্রজা, কুলি-মজুর সবাই এ নেয়ামত প্রাপ্ত হয়ে থাকে। সমাজজীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অভাবী ও শ্রমজীবীরা যেহারে এ নেয়ামত ভোগ করে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসায় নরম তোষক ও কোমল বালিশধারীরা তা পায় না। এতে বোঝা যায়, ঘুম কোনো আয়েশ উপকরণের অনুগামী নয়। একমাত্র আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ। শুধু তার কাছ থেকেই আসে। কখনো কখনো দেখা যায় ক্লান্ত শ্রমিক কিংবা কোনো রাজপথের টোকাই ছেলে ভরদুপুরে খোলা আকাশের নিচে ঘুমে বিভোর। অথচ বেচারার মাথার নিচে একটি বালিশও নেই। অন্য দিকে বড় বড় ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, কোটিপতিরা ডজন ডজন ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েও ঘুমাতে পারছেন না। ভেবে দেখার বিষয় এ অসীম নেয়ামত শুধু বিনা মূল্যেই দেয়া হয়নি, বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কখনো কাজের আধিক্যে মানুষ সারা রাত কাজ করতে চায়। কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহ তার ওপর বিজয়ী হয়। চোখ কথা শোনে না। প্রবল বেগে ঘুম নেমে আসে; যাতে কর্ম বিষাদ দূর হয়। নবোদ্যম ফিরে আসে। আরো অধিক কর্ম সম্পাদনে সক্ষম হয়। তাই তো বিস্ময় বিস্ফোরিত কণ্ঠে এয়াকুব আলী চৌধুরীর প্রশ্ন : সায়াহ্নে কাঁর শান্ত শোভায় হৃদয় মন ভরে যায়। কে শ্রমের মাঝে শান্তি আনে? ভীষণতায় মধু বহায়? আল্লাহ বলেন, ‘আমি রাতকে করেছি আবরণ, অতঃপর তাতে মানুষ ও প্রাণীদের ওপর নিদ্রা বা ঘুম চাপিয়ে দিয়েছি; যা তাদের আরাম ও শান্তির উপকরণ।’ এখানে কয়েকটি বিষয় অনুধাবনযোগ্য। প্রথমত ঘুম যে আরাম বা বিশ্রামের প্রাণ তা সবাই জানে। কিন্তু আলোর মধ্যে ঘুম আসা স্বভাবতই কঠিন। ঘুম এলেও দ্রুত ভেঙে যায়। আল্লাহ তায়ালা ঘুমের উপযোগী করে রাতকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করেছেন। শীতলও করেছেন। এমনিভাবে রাত একটি নেয়ামত এবং ঘুম দ্বিতীয় নেয়ামত। তৃতীয় নেয়ামত হলো সারা বিশ্বের মানুষ ও জীবজন্তুর ঘুম একই সাথে বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়েছে। একেক জনের ঘুমের সময় ভিন্ন ভিন্ন হলেও কেউ ঘুমাত আর কেউ কাজে লিপ্ত থাকত। এতে সবারই ঘুমের বিঘ্নতা সৃষ্টি হতো। তা ছাড়া প্রত্যেক মানুষের অনেক প্রয়োজন অন্যের সাথে জড়িত। ফলে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা বিঘ্নিত হতো। এর উদ্দেশ্য যদি আন্তর্জাতিক কোনো চুক্তি হতো যে, সবাইকে ঘুমের জন্য একই সময় নির্দিষ্ট করতে হবে, তবে প্রথমত কোটি কোটি মানুষের মধ্যে এরূপ চুক্তি সম্পাদিত হওয়া সহজ ছিল না। তদুপরি চুক্তি যথাযথ পালিত হচ্ছে কিন্তু যাচাই করার জন্য হাজারো বিভাগ খুলতে হতো, এতদসত্ত্বেও সাধারণ আইন ও চুক্তিগত পদ্ধতিতে স্থিরকৃত বিষয়াদিতে ঘুষ পক্ষপাতিত্ব প্রভৃতি কারণে যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি সর্বত্র পরিলক্ষিত হয় এখানেও তাই হতো। এসব বিষয় বিবেচনা করেই আল্লাহ তায়ালা স্বীয় সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে ঘুমের একটি বাধ্যতামূলক সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ফলে সামান্য কিছু নিশাচর প্রাণী ছাড়া মানুষ ও জীবজন্তুর ঘুম একই সময়ে আসে। এখন কথা হলো প্রত্যেক মানুষের জন্য কতটুকু ঘুম প্রয়োজন। এ বিষয়ে আমেরিকান ডাক্তার নাথানিয়েল ক্লিটম্যান দীর্ঘ চল্লিশ বছর গবেষণা করেছিলেন। কিন্তু তিনিও কার কতটুকু ঘুম প্রয়োজন সে কথা সঠিকভাবে বলতে পারেননি। সাধারণত বিশেষজ্ঞরা ৬-৮ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেন। কিন্তু কেউ দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েই সারা দিন নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম করতে পারে। আবার কেউ কেউ ১০ ঘণ্টা ঘুমিয়েও কাজ করতে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাদের ঘুম এসে যায়। সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট যুদ্ধ ক্ষেত্রে কয়েক মিনিট চোখ বন্ধ করেই সারা দিনের ঘুমের প্রয়োজন মেটাতে পারতেন। রাসূল সা: কোনো বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন রাতে ঘুমাতেন মাত্র চার ঘণ্টা। পক্ষান্তরে, বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলতেন, রাতে যদি তিনি ১০ ঘণ্টা না ঘুমান তা হলে তিনি ঠিক করে কাজ করতে পারেন না। মূলত আমাদের শরীর বৃত্তের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও সুস্থতার জন্য ঘুমের গুরুত্ব অপরিসীম। ঘুম হলো ন্যাচারাল অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। সারা দিন পরিশ্রমের ফলে দেহের যে ক্লান্তি সৃষ্টি হয় এবং কর্মক্ষমতা হ্রাস পায় সেটিকে চাঙ্গা ও নতুন কর্মসংস্থা সৃষ্টিতে ঘুমের কোনো তুলনা হয় না। আমাদের দেশের ছাত্রছাত্রী, যুবক-যুবতীরা আজ সারা রাত ফেসবুকের পেছনে সময় নষ্ট করছে। ঘুমানোর সময় নেই তাদের, অথচ বিজ্ঞান বলছে অপর্যাপ্ত ঘুম মানুষকে অবসন্ন ও ক্লান্ত করে, যা মানুষের স্মৃতি লুপ্তির জন্য দায়ী। কাজেই স্মরণশক্তি ঠিক রাখার জন্য ও পরিমিত ঘুম খুবই জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্রোহীনতার দরুন জাতীয় অর্থনীতিতে হৃত উৎপাদনশীলতার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে বছরে প্রায় এক হাজার মার্কিন ডলার এবং জাতীয় মহাসড়ক যানবাহন চলাচল নিরাপত্তা প্রশাসন হিসেবে দিয়েছে যে, বছরে এক লক্ষাধিক গাড়ি দুর্ঘটনা মানসিক শান্তির দরুন ঘটে থাকে। এ কারণে কয়েকটি সমীক্ষায় দাবি করা হয়েছে যে, প্রত্যেকের দৈনিক ৮-১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। উপরিউক্ত আলোচনা থেকে জানা যায় যে, ঘুম আল্লাহর এক মহা নেয়ামত। কারো ঘুম না এলে শত চেষ্টা করেও সে ঘুমাতে সক্ষম নয়। আর কারো চোখে ঘুম এসে গেলে, সে শত চেষ্টা করেও ঘুম থেকে রেহাই পাবে না। মহান আল্লাহ যদি মানুষের ঘুমকে এখতিয়ারভুক্ত করে দিতেন, তা হলে চিরলোভী মানব একটানা পরিশ্রম করে তার শরীরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিত। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর শরীরের ক্লান্তি দূর করে শরীরকে সতেজ ও চাঙ্গা করে তোলার জন্য প্রভুর মহান নেয়ামত এ ঘুমের বিকল্প আর দ্বিতীয়টি নেই। লেখক : প্রাবন্ধিক

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*