গাইবান্ধায় সাঁওতালদের ঘরে অগ্নিসংযোগ করে সন্ত্রাসীরা

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১২ ডিসেম্বর, সোমবার: নভেম্বরে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে রংপুর চিনিকলের জমি থেকে সাঁওতালদের উচ্ছেদের সময় তাদের বাড়িতে পুলিশই আগুন1 দিয়েছে বলে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে। যদিও এ ঘটনার পর শিল্পসচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া দাবি করেছিলেন, পালিয়ে যাওয়ার সময় সাঁওতালরা তাদের বাড়ি-ঘরে আগুন দিয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পুলিশের আগুন ধরিয়ে দেয়ার দৃশ্য স্পষ্ট।
পূর্ব পুরুষদের জমি দাবি করে ওই ভূমিতে বাড়ি করেছিল শতাধিক সাঁওতাল পরিবার। ৬ নভেম্বর সাঁওতালদের ঘরে অগ্নিসংযোগ করে সন্ত্রাসীরা। পরদিন তাদের বসতভিটায় হামলা চালিয়ে গরু, ছাগল ও জিনিসপত্র লুট করে। বর্তমানে সাঁওতাল অধ্যুষিত মাদারপুর ও জয়পুর গ্রামের বাসিন্দারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
গত মাসেও নিজেদের ঘরে ছিলেন বাংলাদেশের প্রাচীন উপজাতিগোষ্ঠী সাঁওতাল মুক্তি রানি এবং চঞ্চল মহন্তে। কিন্তু এখন তারা গাছের নিচে মাথা গুঁজার ঠাঁই খুঁজছে। অন্যান্যদের মতো মুক্তি এবং চঞ্চলের সংসারও ছিল গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীতে।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জে রংপুর চিনিকলের জমি উদ্ধারকে কেন্দ্র করে সাঁওতালদের উপর হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন সাঁওতাল গুলিবিদ্ধ হন। এদের মধ্যে কমপক্ষে তিনজন পরে মারা যান।
কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরার এক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন দিচ্ছে পুলিশ। সেখানে বলা হয়, পুলিশের দেয়া আগুনে কমপক্ষে দুজন সাঁওতাল পুরুষের মৃত্যু হয়। আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় কয়েক ডজন সাঁওতাল।
যদিও পুলিশের দাবি, সাঁওতালরাই তাদের ওপর হামলা চালায়। মুক্তি বলেন, সরকারের কাছে আমাদের জায়গা ফেরত চাই। শীতের সকালে খোলা আকাশের নিচে বাচ্চাদের নিয়ে থাকতে খুব কষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন এখানে শিশির পরে। এভাবে আর কতদিন আমরা খোলা জায়গায় থাকবো?
পুলিশের ছোঁড়া রাবার বুলেটে মারাত্মক আহত হয়েছেন সাঁওতাল আন্দোলনকারী দ্বিজেন টুটো। তার চোখে পুলিশের বুলেট এসে লাগে। এমন অবস্থায় তাকে ঢাকায় জাতীয় চক্ষু হাসপাতালে আনা হয়। কিন্তু হাতকড়া পরিয়ে দ্বিজেনকে হাসপাতালের বিছানায় দশদিন চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে আলজাজিরার পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
জমি নিয়ে সংঘর্ষের তিনদিন পর গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের জমি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেয় রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ। দুই গজ পর পর সিমেন্টের পিলার দিয়ে তাতে বাঁধা হয় কাঁটাতার। সেখানে টহল পুলিশকে পাহারা দিতেও দেখা যায়। এই কাঁটাতারের বেড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ বলেন, এটি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে দেয়া হয়েছে।
সাঁওতালদের ‘অপরাধ’, তারা পূর্বপুরুষের ভূমি উদ্ধারের আন্দোলন করছিলেন। ১৯৬৫ সালে গোবিন্দগঞ্জে চিনিকল প্রতিষ্ঠার সময় জমি অধিগ্রহণের চুক্তিতে বলা হয়েছিল, চিনিকলের জন্য আখ ছাড়া অন্য কিছুর চাষ হলে জমি সরকারের মাধ্যমে পূর্বতন মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়া হবে। ২০০৪ সাল থেকে চিনিকলটি বেশির ভাগ সময়ই বন্ধ থাকছে এবং উল্লেখিত জমি বাণিজ্যিকভাবে ইজারা দিয়ে ধান, তামাক ইত্যাদির আবাদ করা হচ্ছে। এই যুক্তিতেই ভূমিহীন সাঁওতালরা পূর্বপুরুষের জমি ফেরতের দাবি জানাচ্ছিলেন। ভূমিবিষয়ক সংসদীয় কমিটিও বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানের সুপারিশ করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মৌখিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে সাঁওতালরা তাদের ভাষায় ‘পূর্বপুরুষের জমিতে’ ঘর তোলেন।
সন্ত্রাসী বাহিনী সাঁওতাল বসতিতে হামলা চালালে তারা তা প্রতিরোধে চেষ্টা করেন। সে সময় পুলিশ সাঁওতালদের ওপর গুলি চালায়। তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, ট্রাক্টর দিয়ে গুঁড়িয়ে সমান করা হয় মাটির ঘরবাড়ি। পরে পাশের আরেক সাঁওতাল গ্রামেও হামলা ও লুটপাট চলে। এসব ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) স্থানীয় চেয়ারম্যান ও সাংসদের ইন্ধনের অভিযোগ গণমাধ্যমে এসেছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাঁওতালসহ বাংলাদেশের সব সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর এভাবেই চলছে নির্যাতন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*