গণ মানুষের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য বলাই, ১৯ জুন ২০১৭, সোমবার: বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন তারিখে ঢাকার কে এম দাস লেন-এর বশির আহমেদ এর রোজ গার্ডেন নামক বাড়িতে। বৃটিশদের খপ্পর হতে মুক্ত হয়ে অদ্ভুত রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই জনহিতৈষী কিছু রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা উপলব্ধি করেন যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ভারত হতে মোহাজের হয়ে আসা ইতর শ্রেণির কিছু লোক ও পাঞ্জাব প্রদেশের কিছু ভূস্বামী ও ব্যবসায়িদের করালগ্রাসে পড়ে একটি জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার বদলে বৃটিশ শাষণামলের মতোই একটি শোষণ যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। বৃটিশ শাষণামলের শেষভাগের ও পাকিস্তানের শাষণামলের শুরুর সময়ের বিদেশী প্রভূ তোষণ ও পদলেহনকারি, অথর্ব, লোভী রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে বলা যায় যে, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পর সময়কার গভর্নর জেনারেল পার্সী অগ্নি উপাসক মায়ের সন্তান মুহম্মদ আলী জিন্নাহ, সামন্ত প্রভূদের স্বার্থ রক্ষাকারি প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও জমিদারদের প্রতিনিধিত্বকারি পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক মূখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন আহমেদরা পাকিস্তান রাষ্ট্রটিকে একটি প্রজা নিপীড়ক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। এমনি অবস্থার প্রেক্ষিতে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে একটি বিকল্প জনগণের প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ছিলো ঐতিহাসিক প্রয়োজন, পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পরপরই এ আওয়ামী লীগ গড়ে না উঠলে বৃটিশরা পুনরায় পাকিস্তান রাষ্ট্রটি দখল করে নিতো এবং পূর্বেকার তুলনায় অনেক বেশি জুলুম-নিপীড়ন-নির্যাতন চালাতো।
দীর্ঘদিনের প্রকাশ্য ও গোপন লড়াই-সংগ্রাম-আন্দোলনের ফলে বৃটিশরা যখন উপলব্ধি করে যে, তাদের ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যেতেই হবে, তখন তাঁরা ব্যবহার করে লর্ড মাউন্টব্যাটেন এর স্ত্রী লেডি মাউন্টব্যাটেনকে। সুদীর্ঘকাল মুসলিম লীগ, কংগ্রেস, ফরায়েজী আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলনের প্রকাশ্য আন্দোলন-সংগ্রাম ও সর্ব-ভারতীয় কম্যুনিষ্টদের বিভিন্ন গোপন ও কৌশলগত আক্রমণে পর্যুদস্ত বৃটিশরা লেডি মাউন্টব্যাটেনকে লেলিয়ে দেয় মুহম্মদ আলী জিন্নাহকে কাবু করতে, যাতে এই কূটচালে পারদর্শী মহিলা (কুটনী বুড়ি) সর্বতোভাবে সফল হন। শেরে-বাংলা এ কে ফজলুল হকের ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের মূল খসড়ার স্টেটস হতে এস (ং) বর্ণটি বাদ দিয়ে জিন্নাহ তার সেক্রেটারীকে দিয়ে স্টেট টাইপ করানো মূল লাহোর প্রস্তাবটি বাধ্য করে আড়াই হাজার মাইল দুরত্বের দুইটি ভূখন্ডকে এক রাষ্ট্রে পরিণত করতে; যা কোন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ মেনে নিতে পারেন নাই। যার ফলে প্রকৃত জনমানুষের কল্যাণকামী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীবৃন্দ বাধ্য হন পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোতে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রটি স্বাধীনতা লাভের মাত্র ৬৭৮ দিনের মাথায় আরেকটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ” প্রতিষ্ঠা করতে।
২০১৪ সালের ২৩ শে জুন তারিখে আওয়ামী লীগের ওয়েবসাইটে “অর্জন থেকে উত্তরণে: ৬৬ বছরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ” শীর্ষক সংবাদে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার অংশটি নিন্মরূপ:
স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা: বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ এবং বিশ্বের বুকে প্রথম কোন ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্রের জন্ম- এটাই আমাদের সোনার বাংলা। আর আওয়ামী লীগ- জাতীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ব্যক্তি-স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করার অটল প্রয়াসে শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার শ্লোগানের জীবন্ত ককপিট। ভাষা অধিকার থেকে শুরু করে আত্ম সম্মান নিয়ে বাঁচার অধিকারের দীর্ঘ যাত্রার অগ্নিসারথি, ইতিহাসের শরীর জুড়ে পরতে পরতে লেপ্টে থাকা এটাই আমাদের বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মানেই ‘স্বাধীনতার স্বপ্নদেখা’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুদূরপ্রসারী দৃষ্টি, পঞ্চান্ন হাজার বর্গ মাইল ভূখন্ডের একটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি। ইতিহাস বিনির্মাণেই থেমে থাকেনি দেশের ঐতিহ্যবাহী এ দলটি, অদম্য বাসনা আর বিসর্জনের ক্যানভাসে নিজ জাতির মুক্তির মানচিত্র এঁকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্রমেই সমৃদ্ধ করে চলেছে আমাদের প্রাণাধিক প্রিয় জন্মভূমিকে।
বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, আর মুদ্রাটি হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে একের পর এক বিপর্যয় সামাল দিয়ে দেশরতœ শেখ হাসিনার উনয়নের পতাকাবাহী নৌকা তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে- প্রান্তিক মানুষের অন্ন-কর্ম-স্বাস্থ্য-শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে যে নতুন অভিযান শুরু হয়েছিল তা এখন আধুনিক সুখী সমৃদ্ধ ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রয়াসে এক নতুন অধ্যায়ের রচনা করেছে। হ্যা, এটাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ- জাতির আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন পূরণের আনন্দ-বেদনার চিরন্তর সঙ্গী।
আজ ২৩ জুন ২০১৭ গণমানুষের প্রিয় দল আওয়ামী লীগের জন্মদিন। বাঙালি জাতির মুক্তির মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে গণতান্ত্রিকভাবে জন্ম নেয়া উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আজ ৬৯ বছরে পা রাখল। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার বিখ্যাত রোজ গার্ডেনে দলটি প্রতিষ্ঠালাভ করেছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে। ১৯৫৬ সালে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত দলীয় কাউন্সিলে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’ নামকরণের মাধ্যমে দলটি অসাম্প্রদায়িক রূপলাভ করে।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জন্মভূমি বাংলাদেশ: আওয়ামী লীগের জন্মলাভের পর মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ‘৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয়দফা, ’৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থান এবং ’৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে এই দলের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ক্রমশ এগিয়ে যায় স্বাধীনতার দিকে। এই দলের নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ নিজেদের স্থান দখল করে। আর এসব আন্দোলনের পুরোধা ও একচ্ছত্র নায়ক ছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেন প্যালেসে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক টাঙ্গাইলের শামসুল হক। পরবর্তীকালে, ১৯৫৫ সালে মওলানা ভাসানীর উদ্যোগে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠনটির নাম থেকে পরে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়; নাম রাখা হয়: ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। আওয়ামী লীগের জন্মসূত্রের সঙ্গে ঢাকা ১৫০ নম্বর মোগলটুলিস্থ পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবিরের উদ্যোগের সম্পর্ক অনস্বীকার্য। ২৩ জুনের সম্মেলনের আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শওকত আলী। তার উদ্যোগে ১৫০ নং মোগলটুলিস্থ শওকত আলীর বাসভবন এবং কর্মী শিবির অফিসকে ঘিরে বেশ কয়েক মাসের প্রস্তুতিমূলক তৎপরতার পর ২৩ জুনের কর্মী সম্মেলনে দলের ঘোষণা দেয়া হয়। শওকত আলীর অনুরোধে কলকাতা থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী একটি মামলা পরিচালনার কাজে ঢাকায় এলে তিনি শওকত আলীকে মুসলিম লীগ ছেড়ে ভিন্ন একটি রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। শওকত আলী এ পরামর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে “পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবির” এর নেতৃবৃন্দকে নতুন সংগঠন গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেন। এসময় কর্মী শিবিরের প্রধান নেতা ছিলেন শামসুল হক। কামরুদ্দীন আহমদ, মো. তোয়াহা, অলি আহাদ, তাজউদ্দীন আহমদ, আতাউর রহমান খান, আবদুল আউয়াল, মুহম্মদ আলমাস, শামসুজ্জোহা প্রমুখ প্রথম দিকে এবং পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমান কর্মী শিবির কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মতৎপরতায় বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন। মুসলিম লীগের আবুল হাশিম-সোহরাওয়ার্দী গ্র“প নেতৃবৃন্দ মুসলিম লীগের অন্যায় কাজগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার লক্ষ্যেই এখানে কর্মী শিবির গড়ে তুলেছিলেন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৪৯ সালে আসামের ধুবড়ী জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়ে ঢাকা এলে তার সঙ্গে শওকত আলীর আলোচনা হয়। শওকত আলী মওলানাকে পূর্ববঙ্গ কর্মী শিবিরকেন্দ্রিক রাজনৈতিক তৎপরতার কথা জানান। এসময় মওলানা ভাসানী আলী আমজাদ খানের বাসায় অবস্থান করছিলেন। শওকত আলীর সঙ্গে তার প্রাথমিক আলোচনা সেখানেই হয়। এই আলোচনার সূত্র ধরে নতুন দল গঠনের জন্য একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন শওকত আলী। সেজন্যে ১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়। মওলানা ভাসানী সেই বৈঠকে যোগদান করেন। এসময় খোন্দকার আবদুল হামিদের সঙ্গে পরামর্শ করে শওকত আলীর উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি, ইয়ার মুহম্মদ খানকে সম্পাদক এবং খন্দকার মুশতাক আহমদকে দপ্তর সম্পাদক করে অন্যদেরসহ একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়। উপরোক্ত সাংগঠনিক কমিটি ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন রোজ গার্ডেনে নতুন দল গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এক সম্মেলন আহ্বান করে। রোজ গার্ডেনে ২৩ জুনের বিকেল ৩টায় সম্মেলন শুরু হয়। সম্মেলনে উপস্থিত নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, শওকত আলী, আনোয়ারা খাতুন, ফজলুল কাদের চৌধুরী, আবদুল জব্বার খদ্দর, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, আতাউর রহমান খান, মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, আলী আমজাদ খান, শামসুদ্দীন আহমদ (কুষ্টিয়া), ইয়ার মুহম্মদ খান, মওলানা শামসুল হক, মওলানা এয়াকুব শরীফ, আব্দুর রশিদ প্রমুখ।
প্রতিষ্ঠাকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, সহ-সভাপতি হন আতাউর রহমান খান, শাখাওয়াত হোসেন ও আলী আহমদ। টাঙ্গাইলের শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক; শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেনকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কোষাধ্যক্ষ হন ইয়ার মোহাম্মদ খান। এসময় শেখ মুজিব কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। অন্যদিকে, পুরো পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সংগঠনটির নাম রাখা হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। এর সভাপতি হন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ২৪ জুন বিকেলে নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে ঢাকার আরমানিটোলা ময়দানে প্রকাশ্যে জনসভা করে। সভায় আনুমানিক প্রায় চার হাজার লোক উপস্থিত হয়। ১৯৫২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরের বছর ঢাকার ‘মুকুল’ প্রেক্ষাগৃহে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে তাকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ১৩ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন শেখ মুজিব। উল্লেখ্য যে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ছিলো তৎকালীন পাকিস্তানে প্রথম বিরোধী দল।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি প্রাদেশিক স্বায়ত্ত্বশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বসহ ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে। শুরুর দিকে দলটির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার স্বীকৃতি, এক ব্যাক্তির এক ভোট, গণতন্ত্র, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং তৎকালীন পাকিস্তানের দু’অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ।
‘সাঁকো দিলাম, এই সাঁকো দিয়েই একদিন আমরা স্বাধীনতায় পৌঁছাব।’: দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকায় ২৩শে জুন ২০১৬ প্রকাশিত জননেতা তোফায়েল আহমেদ রচিত “আওয়ামী লীগের ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস” শীর্ষক নিবন্ধে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার বর্ণনা অংশটি নিন্মরূপ:
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় রাজনৈতিক সংগঠন। ২৩শে জুন ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। যারা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন-মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং অকালপ্রয়াত নেতা শামসুল হক-তারা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার জন্য ঐতিহাসিক এই ২৩শে জুন তারিখটি বেছে নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে থাকার দুর্লভ সুযোগ হয়েছিল আমার। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে আমি শুনেছি, তিনি আমাকে বলেছিলেন, “পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছি যে, এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয় নাই। একদিন বাঙালির ভাগ্য-নিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই প্রথমে তোমাদের ছাত্র-সংগঠন ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছি। তারপর ২৩শে জুন এই ঐতিহাসিক দিনটি বেছে নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছি। লক্ষ্য ছিল একদিন বাংলাদেশকে স্বাধীন করা।” আজ আওয়ামী লীগের ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সেসব কথা আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। জাতির জনক যে লক্ষ্য নিয়ে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ, ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ, ’৬২-এর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ধাপে ধাপে বাংলার মানুষকে মহান জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ’৬২তে আমাদের স্লোগান ছিল ‘জাগো, জাগো, বাঙালী জাগো; ‘পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’। ’৬৬তে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা দিয়েছিলেন লাহোরে। তখন তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ফেব্র“য়ারির ৫ তারিখে ৬ দফা দিলেন। বিমানবন্দরে জাতির সামনে ৬ দফা পেশ করলেন এবং ১৮, ১৯ ও ২০ মার্চ ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলনে জাতির জনক আওয়ামী লীগের সভাপতি হলেন এবং শহীদ জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন আহমেদ সাধারণ সম্পাদক হলেন। ৬ দফা দেয়ার পর বঙ্গবন্ধু আমাদের বলতেন ‘সাঁকো দিলাম, এই সাঁকো দিয়েই একদিন আমরা স্বাধীনতায় পৌঁছাব।’ ছয়-দফা ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজমন্ত্র তথা অঙ্কুর। কাউন্সিল অধিবেশনের শেষদিন অর্থাৎ ২০ মার্চ চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভায় দলীয় নেতাকর্মী ও দেশবাসীর উদ্দেশে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘চরম ত্যাগ স্বীকারের এই বাণী লয়ে আপনারা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ুন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রত্যন্ত প্রদেশের প্রতিটি মানুষকে জানিয়ে দিন, দেশের জন্য, দশের জন্য, অনাগতকালে ভাবী বংশধরদের জন্য সবকিছু জেনে-শুনেই আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীরা এবার সর্বস্ব পণ করে নিয়মতান্ত্রিক পথে ছয় দফার ভিত্তিতে দেশব্যাপী আন্দোলনের জন্য এগিয়ে আসছে।’ সেদিনের বক্তৃতায় তিনি আরও বলেছিলেন ‘ছয়-দফার প্রশ্নে কোন আপোস নাই। রাজনীতিতেও কোন সংক্ষিপ্ত পথ নাই। নেতৃবৃন্দের ঐক্যের মধ্যেও আওয়ামী লীগ আর আস্থাশীল নয়। নির্দিষ্ট আদর্শ ও সেই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের ঐক্যেই আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগ নেতার দল নয়-এ প্রতিষ্ঠান কর্মীদের প্রতিষ্ঠান।’ সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্মীদের প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির একজন নগণ্য কর্মী হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মাননীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মীদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। একই সাথে এই দিনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। লেখক: বিশিষ্ট লেখক, গবেষক, সাংবাদিক ও সংগঠক,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*