‘খেটে খাওয়া অনেককে বিএনপির কর্মী সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে’

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮ ইংরেজী, বৃহস্পতিবার: আসমা বেগম (৩০) দরজি, তাঁর প্রতিবেশী সুমাইয়া তাসনীন (১৭) কলেজছাত্রী। গত সোমবার সন্ধ্যায় তাঁরা নিউমার্কেট থেকে লেসফিতা কিনে বাসায় ফিরছিলেন। ধানমন্ডি ১ নম্বর রোডে পুলিশ তাঁদের বিএনপির কর্মী সন্দেহে আটক করে। ভাঙচুরের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল মঙ্গলবার তাঁদের ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে হাজির করা হয়। আইনজীবীরা তাঁদের নির্দোষ দাবি করে আদালতে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তাঁদের জামিনের আবেদন নাকচ করেন। আসমা ও সুমাইয়ার স্বজনদের দাবি, তাঁরা কোনো দলের সঙ্গে জড়িত নন। তাঁরা নির্দোষ। জানা গেছে, শুধু আসমাই নন, তাঁর মতো খেটে খাওয়া অনেককে বিএনপির কর্মী সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্বজনদের দাবি, তাঁরা নির্দোষ ও কোনো দল করেন না।
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গতকাল বিএনপির কর্মী সন্দেহে ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগে আটক ৬২ জনকে রাজধানীর বিভিন্ন থানার নাশকতা, ভাঙচুর, তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি আইনে করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগের দিন সোমবার বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী সন্দেহে রাজধানীর বিভিন্ন থানার নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো ৫৮ জনকে কারাগারে পাঠান আদালত।
গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, জামিন নাকচ হওয়ার পর আসমাকে হাজতে নেওয়ার সময় তাঁর স্বামীর কোলে থাকা তিন বছরের শিশু আবির মায়ের কাছে যেতে চিৎকার করে কাঁদছিল। এ সময় আসমাও কেঁদে ফেলেন। এক পর্যায়ে তিনি পুলিশকে জানান তাঁর ডায়াবেটিস। ওষুধের দোকান থেকে তাঁকে যেন ওষুধ কেনার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু পুলিশ সে সুযোগ না দিয়ে হাতে বাঁধা দড়ি টেনে তাঁকে প্রিজন ভ্যানে তোলে। আসমার স্বামী মকবুল হোসেন রিকশাচালক। তিনি ছেলের কান্না থামানোর চেষ্টা করেন। শিশু আবিরের কান্না থামাতে না পেরে তার নানি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন।
আসমার স্বামী মকবুল হোসেন বলেন, তিন সন্তানসহ পাঁচজনের পরিবার চলে তাঁদের দুজনের আয়ে। তাঁর স্ত্রী নির্দোষ, কোনো দল করেন না। তাঁর স্ত্রী নিউমার্কেট থেকে কেনা লেসফিতা দেখালেও পুলিশ শোনেনি।
সুমাইয়ার মা হালিমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর মেয়ে ধানমন্ডি ড. মালিকা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ে। সুমাইয়া পুলিশকে কলেজের পরিচয়পত্র দেখিয়েছিল। এ ছাড়া কলেজের অধ্যক্ষ সুমাইয়াকে ছেড়ে দিতে পুলিশকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ তা শোনেনি। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের হার্টের রোগ। নিরপরাধ মেয়ে জেলে গিয়ে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে।’ সোমবার বিকেলে কদমতলী থানার পুলিশ জুরাইনে বাসার সামনে থেকে মোহাম্মদ রানা (৩১) নামের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে। গতকাল তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়। রানার মা সালেহা বেগম বলেন, ‘পুলিশ আমার সামনে থেইকা ওঠ বলে রানাকে গাড়িতে তোলে। রানাকে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে পুলিশ ধমক দিয়া কয় বেশি কথা কইবেন না। থানায় নিয়ে গ্যালাম, ছাইরা দিমু। কিন্তু পুলিশ তাকে ছাড়ে নাই।’ তিনি বলেন, তাঁর ছেলে কোনো দল করে না। রানার স্ত্রী সাথী আক্তার বলেন, ছোট্ট ছেলে মিষ্টি খাওয়ার বায়না ধরলে রানা বাসা থেকে মিষ্টি কিনতে বের হওয়া মাত্রই পুলিশ তাঁকে আটক করে। পরে ভাঙচুরের মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। সোমবার শাহবাগ থানার পুলিশ মুক্তাঙ্গনের সামনে থেকে গেঞ্জি বিক্রেতা মো. সেলিমকে আটক করে নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়। সেলিমের দূরসম্পর্কের আত্মীয় শেফালি বেগম ও আবুল কালাম আদালতে আসেন। তাঁরা বলেন, সেলিম কোনো দল করেন না। তবু পুলিশ তাঁকে আটক করে নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। শেফালি বেগম ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘স্ত্রী ছাড়া সেলিমের ঢাকায় কেউ নাই। দেড় মাস আগে ওর স্ত্রীর বাচ্চা হইছে। এ অবস্থায় আদালতে আসতে পারেনি। সেলিম ছাড়া না পাইলে ওর বউবাচ্চার না খাইয়া মরতে অইবে।’
২৩ ডিসেম্বর রাতে পুরান ঢাকার সুতির খালের পাশ থেকে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ বিএনপির কর্মী সন্দেহে আয়নাল হক (৪০) নামের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে। যাত্রাবাড়ী থানার নাশকতার মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল আদালতে হাজির করে।
আয়নালের শ্বশুর ইসমাইল হোসেন বলেন, আয়নাল কোনো রাজনীতিই করেন না। তবু পুলিশ তাঁকে বিএনপির কর্মী সাজিয়ে গ্রেপ্তার দেখাল। জামিন নাকচ হওয়ার পর আয়নালকে আদালতের হাজতে নেওয়া হচ্ছিল। এ সময় সেখানে উপস্থিত তাঁর স্ত্রী ও ছোট দুই সন্তান কান্নায় ভেঙে পড়ে। একপর্যায়ে আয়নাল শিশু আদিয়ানের কান্না থামাতে তাকে চুমু দেন। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মো. মাসুদুর রহমান বলেন, মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। নিরপরাধ কাউকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*