খুলনায় বিএনপির অগোছালো অবস্থা

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৩ জানুয়ারী ২০১৭, সোমবার: বিভাগীয় প্রতিনিধি সভার মাধ্যমে খুলনা থেকেই আওয়ামী লীগ আগাম নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করলেও দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি একেবারেই অগোছালো অবস্থা। সব দ্বন্দ্ব ও বিভেদ ভুলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একাট্টা হয়ে বিএনপির দুর্গখ্যাত খুলনা নিজেদের দখল নিতে চাইছেন। অন্যদিকে নগর বিএনপির সম্মেলনকে কেন্দ্র করে চরম অস্থিরতা ও বিরোধে খুলনা বিএনপির জেরবার। ক্ষোভ ও হতাশার মধ্যে নেতাকর্মীরা। আন্দোলন ব্যর্থ হওয়া ও দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় নেতাকর্মীদের হতাশা আরও প্রলম্বিত হয়েছে।
এ অবস্থায় দলকে সংগঠিত করতে না পারলে সামনে সরকারবিরোধী আন্দোলন ও জাতীয় নির্বাচন কোনোটাতেই দাঁড়াতে পারবে না খুলনা বিএনপি। সবটাতেই ভরাডুবি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দলের স্থানীয় শীর্ষ পর্যায়ের হাতেগোনা কয়েকজন নেতার চরম বিরোধেই এ অবস্থা চলছে বলে জানিয়েছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
খুলনায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের দ্বন্দ্বের কারণে গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হয়। এরপর ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে খুলনায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বলতে গেলে বিনা বাধায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময়ও নেতাদের বিরোধ ছিল চরমে। তবে বিএনপি এ নির্বাচন প্রতিহত করার ডাক দিয়ে বর্জন করায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা সে যাত্রায় পার পেয়ে যান। স্থানীয় সরকারের অধীনে সম্পন্ন হওয়া নির্বাচনেও সেই বিরোধের জের দেখা গেছে। ফলে কয়েকটি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদ হারাতে হয় আওয়ামী লীগকে। তবে সেই সব পরিস্থিতিকে সামাল দিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য কেন্দ্র থেকে বিশেষ নির্দেশনা থাকায় জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গড়ে তুলতে পারেনি কেউই। সর্বশেষ গত ১৯ জানুয়ারি খুলনায় অনুষ্ঠিত বিভাগীয় বিশেষ প্রতিনিধি সমাবেশের মাধ্যমে খুলনায় বিএনপির দুর্গকে একেবারেই ভেঙে নিজেদের দখলে নেয়ার সংকল্প করেছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা।
অপরদিকে শুধু এক সম্মেলনকে কেন্দ্র করেই বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে নগর বিএনপির দুটি গ্রুপ। ইতোমধ্যে দুটি পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে হুমকি-ধামকি, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন করে একেবারে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে আছেন নগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু এবং সাধারণ সম্পাদক ও খুলনা সিটির মেয়র মনিরুজ্জামান মনি। দলের মধ্যে তারা মঞ্জু-মনি গ্রুপ নামে খ্যাত। অপর গ্রুপের নেতৃত্বে আছেন নগর বিএনপির সহ-সভাপতি শাহারুজ্জামান মোর্ত্তজা ও নগর কমিটির কোষাধ্যক্ষ আরিফুর রহমান মিঠু। এ দুই গ্রুপের চরম বিরোধ ও দ্বন্দ্বে একেবারে লেজেগোবরে অবস্থা দাঁড়িয়েছে খুলনা বিএনপির। নগর কমিটির মেয়াদ পাঁচ বছর আগে শেষ হলেও নানা অজুহাতে সম্মেলন করতে পারেনি তিনবার ক্ষমতায় থাকা দলটি। কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালিত হচ্ছে পৃথক পৃথকভাবে। ফলে নেতাকর্মীর অংশগ্রহণও কমে গেছে।
দলের একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, খুলনা নগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু চাইছেন তিনি তার ওয়ার্ড পর্যায়ে যে কমিটি করেছেন, তাদের মাধ্যমেই থানা ও নগর কমিটির সম্মেলন সম্পন্ন করতে। অন্যদিকে মঞ্জুবিরোধীরা চাইছেন, নতুন করেই সবকিছু করতে। কাউন্সিলের মাধ্যমে ওয়ার্ড পর্যায় থেকেই কমিটি গঠনের দাবি তাদের। দুই গ্রুপের এই দ্বন্দ্বের কারণেই গত দেড় বছরেও সম্মেলন সম্পন্ন করতে পারেনি খুলনা নগর বিএনপির নেতারা। বর্তমানে কেন্দ্রীয় কর্মসূচি খুলনায় পালিত হচ্ছে পৃথক পৃথকভাবে।
এ সবকিছুর জন্য বিএনপির একটি গ্রুপকে দায়ী করেছেন নগর বিএনপির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘দলের সম্মেলনের বিষয়ে আমরা কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। দলের ভেতর স্বার্থান্বেষী কিছু নেতার কারণে সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। তারা দলটিকে কুক্ষিগত করতে চায়। কেন্দ্রকে ভুল বুঝিয়ে তারা কেন্দ্র থেকে কমিটি গঠন করে আনতে চাইছে। এদের কোনো কর্মী সমর্থন ও জনসমর্থন নেই। এমনকি আন্দোলনেও অংশগ্রহণ নেই।’ তিনি বলেন, ‘তারা তদবির, লবিং ও গ্রুপিং করেই কেন্দ্র থেকে কমিটি করে এনে নেতা হতে চান। আমরা চাপিয়ে দেয়া কোনো কমিটি গ্রহণ করবে না খুলনা বিএনপির নেতাকর্মীরা।’
নজরুল ইসলাম মঞ্জুর এ বক্তব্যের বিরোধিতা করে তার প্রতিপক্ষ গ্রুপের শীর্ষ নেতা এসএম আরিফুর রহমান মিঠু ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘নিজ স্বার্থের কারণেই তিনি (মঞ্জু) বিএনপিকে কুক্ষিগত করে রাখতে চাইছেন। মঞ্জু তার পছন্দের লোকজন দিয়ে পকেট কমিটি গঠন করে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে চান। দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা তা হতে দেবে কিছুতেই।’
মিঠু বলেন, ‘স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্নভাবেই সবকিছু করতে হবে। বিএনপিকে কারো ব্যক্তিগত দলে পরিণত করতে দেয়া হবে না। কেন্দ্র যে সিদ্ধান্ত দেবে তাই মেনে নিয়ে কাজ করতে হবে সবাইকে।’
বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শীর্ষ কয়েকজন নেতার কারণেই খুলনা বিএনপির দুর্গ হিসেবে যে পরিচিতি ছিল তা আর থাকবে না। নিজেদের মধ্যে হানাহানি বন্ধ করে সুস্থ ধারার রাজনীতিতে নেতাকর্মীরা ফিরে না এলে মারাত্মক ক্ষতি হবে দলের।

Leave a Reply

%d bloggers like this: