চিকিৎসা সেবা মারাত্মক ঝুঁকিতে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক
চিকিৎসা সেবা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ ঝুঁকি থেকে উদ্ধার হওয়ারও কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কারণ যারা চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে সেবার মানসিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তারা শুধু তাদের পদপদবী নিয়ে ব্যস্ত, রোগীর কি হচ্ছে বা রোগীর সাথে থাকা লোকগুলোর কি অবস্থা হচ্ছে, এদিকে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই, সবাই অর্থের পিছনে হাজার মাইল স্পীডে দৌড়াচ্ছে। যে যার অবস্থানে আছে সেই অবস্থান থেকে এ কাজ করছে। এভাবে চলতে থাকলে অধূর ভবিষ্যতে এ পেশার প্রতি মানুষের ঘৃণা সৃষ্টি হবে। সে কারণে মেধাবীরা আর এ পেশায় আসতে চাইবে না, তখন এ পেশা হয়ে উঠবে বুর্জোয়াদের আড়তখানা। তখন চিকিৎসা নামে তাকবে, কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাই এখনই সময় সেই অবস্থা থেকে টেনে তুলে এ পেশাকে বাাঁচানো।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি এখনও পর্যন্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ ও মানুষের চিকিৎসা সেবার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে উঠেনি। হাসপাতালটির চতুর্দিকে গড়ে উঠা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসার নামে মানুষের গলা খাটছে। এক টাকার জিনিস পাঁচ টাকা, ১০ টাকার জিনিস ২০ টাকা, এভাবে প্রতিনিয়ত চিকিৎসা নিতে আসা মানুষগুলো তাদের খপ্পরে পড়ে সর্বশ্বান্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে জরুরী বিভাগের সামনে কোন রোগী এ্যাম্বুলেন্স বা গাড়ী থেকে নামলেই হাসপাতালের ড্রেস পরিহিত ওয়ার্ড বয়রা রোগীদের হাসপাতালের ওয়ার্ডের নেয়ার জন্য তাদের মধ্যে এক প্রকার দৌড় প্রতিযোগিতা চলে, রোগীর পয়সা আছে কি নাই, সেই দিকে না দেখে রোগীকে গন্তব্য স্থলে পৌঁছে দিয়েই তার পিছনে ঝোঁকের মত লেগে থাকে, অর্থ দেওয়ার জন্য, অর্থ না দিলে তার অবস্থা শোচনীয়। এভাবে চলছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, যেন হাসপাতালের এই অবস্থা দেখার কেউ নেই। অন্যদিকে বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াতে রোগীদের মোবাইল, টাকা, ঘড়িসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র চুরির ঘটনা ঘটছে অহরহ।
রোগী দেখার জন্য ডাক্তার যখন রাউন্ড দেয় তখন দারোয়ান রোগীর কোন ব্যক্তিকে ঢুকতে দেয় না, কোন রোগীর অভিভাবক বা কেউ ঢুকতে চাইলে তার কাছ থেকে ২০ ও ৩০ টাক নিয়ে তাদের ঢুকার ব্যবস্থা করে দেয়। আযেরা হাসপাতালগুলেঅ ধোঁয়া মোছার কাজ করার সময় রোগীদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে ও হইহুল্লোর করতে থাকে। তাদের এই সমস্ত কারণে রোগীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতি হয়। আবার অন্যদিকে কিছু কিছু ডাক্তার তাদের প্রাইভেট চেম্বারে গেলে রোগীকে ধরে তার সব কিছু জিজ্ঞাসা করে ঔষুধ দেয়, কিন্তু হাসপাতালে ভাল করে কোন কথাও জিজ্ঞাসা করে না, এজন্য রোগীরা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসতে চায় না।
গত ৭ ডিসেম্বর সকাল ৯ টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৪ নং ওয়ার্ডের ১৮ নং সীটে ভর্তি হন, এক সাংবাদিকের স্ত্রী সালমা বেগম, সাংবাদিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিকট দুরবস্থার কথা জাননোর জন্য কয়েকবার ফোন করেছেন কিন্তু তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি। কিন্তু এ মহিলার প্রেসার বেড়ে যাওয়ায় ভর্তি হন, কিন্তু তার সেই রোগের ঔষুধ না দিয়ে তাকে পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে অনেক পরীক্ষা দিয়ে তার অবস্থা শোচনীয় করে দেন।
প্রতিদিন বিভিন্ন বিভাগের রোগীর চাপে হাসপাতালে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। এতে পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করেছে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বাড়িতে প্রসব হওয়ার পর রোগীর অবস্থা জটিল হলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় অনেক রোগীকেই। মুমূর্ষু অবস্থায় এসব রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় সবাইকে সুস্থ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে অনেকেই মারা যান।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক মহিলা জানান, শয্যার চেয়ে রোগীর চাপ বেশি থাকায় ১ বেডেই ৩ থেকে ৪ জন শিশুকে রাখা হচ্ছে। এতে শিশুদের ওষুধ প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। কখন ভুল করে নার্সরা এক রোগীর ওষুধ অন্যজনকে দিয়ে ফেলে।
তিনি আরো বলেন, শিশুদের শ্বাসকষ্টের জন্য ব্যবহৃত নিবোলাইজার টাকার বিনিময়ে আয়ারা দিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় সঠিক পরিমাণ না দেখেই অনভিজ্ঞ আয়ারা তাড়াহুড়া করে কাজ চালিয়ে যান।
রোগীর এক এটেনডেন্স রেবেকা বেগম রেবু জানান, এখানে সব কিছুই টাকার বিনিময়ে করতে হয়। বাথরুমে যাওয়া ১০ টাকা, বাচ্চার কাপড় চোপড় পরিষ্কার করা ২০ টাকা, নিবোলাইজার দেওয়া ১০ টাকা সব মিলে দিনে ১০০ টাকার মত প্রতিটি রোগীর কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে আয়ারা হাতিয়ে নেয়। টাকা দিলে সিরিয়াল লাগে না, দ্রুত কাজ হয়ে যায়। হাসপাতালের বাথরুম ব্যবহারের অনুপযোগী। টয়লেটে বদনা নেই, সময়মত পানি পাওয়া যায় না। অনেক সময় বাথরুম করতে গিয়ে নিজেকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়।
চন্দনাইশের চিকিৎসা নিতে আসা এক ব্যক্তি বলেন, হাসপাতালে সেবার মান যাই হোক না কেন দালালদের অত্যাচারে সেই সেবা নেওয়াই কঠিন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নার্সরা সরাসরি দালালদের দেখিয়ে দিয়ে বলেন ওর সঙ্গে যান। তখন না গিয়ে কোনো উপায় থাকে না। রাতে আবার দায়িত্বরত আনসাররা টাকার বিনিময়ে হাসপাতালের ভেতরে লোক থাকতে দেয়।
ডাক্তারি পেশাটা অন্যসব পেশা থেকে আলাদা। এটি একটি মহৎ পেশা, কিন্তু সকাল থেকেই যখন বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের মোটরসাইকেলের পেছনে ডাক্তারদের ঘুরতে দেখি তখন মনে হয় সেবার চেয়ে মুনাফার দিকেই বেশি ঝুঁকছেন তারা। এটা ঠিক নয়।
প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সব সমস্যার সমাধান করে চিকিৎসা সেবায় চট্টগ্রামবাসীর দুর্ভোগ লাঘব করবে।
রোগিদের সঙ্গে বৈষম্যের এই আচরণ, কমিশন বাণিজ্যের লোভে পছন্দের ডায়াগস্টিকে একগাদা টেস্ট, বিভিন্ন কোম্পানি অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখা ইত্যাদি কাজগুলো কি মর্যাদাবান এই ডাক্তারি পেশাকে প্রশ্নদ্ধি করছে না? আবার ঢাকাসহ সারাদেশে ভুয়া ক্লিনিক, ডায়াগনিস্টিক সেন্টার, নার্সিং হোম, ল্যাবরেটরি ও হাসপাতালের নেপথ্যে ভুয়া ডাক্তারের দৌরত্ত্ব চিকিৎসা সেবার প্রতি মানুষের অনাস্থা তৈরি করছে না? খবরের কাগজে এই সংবাদ জেনে লোকেরা জিজ্ঞেস করছেন, ‘সব ডাক্তারই কি মানুষ’? সবাই কি মানবিক? ধর্ম ও নৈতিকতার প্রশ্নে ডাক্তারের এই কাণ্ড ধোঁকা ও প্রতারণা। অর্থ লোভ তো বটেই।
রোগির জীবন ডাক্তারের কাছে আমানত, নৈতিকভাবে ডাক্তার প্রতিশ্র“তিবদ্ধ রোগির সঙ্গে সে প্রতারণা করবে না। প্রতিশ্র“তির সূত্র ধরেই গড়ে ওঠে ডাক্তার ও রোগির নিবীড় সর্ম্পক। পরস্পর আস্থা ও বিশ্বাস। পরস্পর আস্থা ও বিশ্বাসই রোগি ও ডাক্তারের সম্পর্কের মূল ভিত্তি। এই আস্থা ও বিশ্বাসে চিড় ধরলে নচিকেতার গানের জন্ম হবে। সুরে সুরে বেড়িয়ে আসবে লাল আগুন! তিনি গেয়ে ওঠবেন, ‘ও ডাক্তার ও ডাক্তার/ ডাক্তার মানে সে তো মানুষ নয়/ আমাদের চোখে সে তো ভগবান/ কসাই আর ডাক্তার একই তো নয়/ কিন্তু দুটোই আজ প্রফেশনাল/ কসাই জবাই করে প্রকাশ্যে দিবালোকে/ তোমার আছে ক্লিনিক আর চেম্বার । ও ডাক্তার ও ডাক্তার!’
ডাক্তারকে অবশ্যই জানা থাকতে হবে, সুদ ঘুষ ও দুর্নীতির মতোই হারাম এই কমিশন বাণিজ্য। মুসলিম শরিফে আছে হজরত রাসুলে কারিম (সা.) বলেছেন, যে ধোঁকা দেয় সে আমার উম্মত নয়। প্রতারকের ওপর সারাক্ষণ ফেরেশতাদের অভিশাপের কথাও উল্লেখ আছে হাদিসে। কোরআন বলছে তোমরা প্রতিশ্র“তি রক্ষা করবে, কেয়ামতের মাঠে অবশ্যই প্রতিশ্র“তি সম্পর্কে জবাব দিতে হবে। (সুরা বনি ইসরাইল ৩৪) ব্যক্তিগত ভাবে এমন অনেক ডাক্তারকেই জানি, যাদের আন্তরিক ব্যবহার ও মানবিকতার কাছে নিজেকে ঋণি মনে হয়। শুধু বাংলাদেশে নয় পৃথিবী জুড়েই এখনও প্রধানতম সম্মানজনক পেশার নাম ডাক্তারি। যারা এই সম্মানজনক অধ্যায়ে কালিমা লেপন করতে চায় ওরা ডাক্তার নয়; কণ্ঠশিল্পি নচিকুর ভাষায় ওরা কসাই!
ইসলামসহ সকল ধর্মের সেবা, মানবতা, মানবপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সৃষ্টির কল্যাণ ভাবনায় আলোকিত হোক আমাদের ডাক্তারদের হৃদয়। ডাক্তার হয়ে ওঠোক মানবিক-দরদি মানুষ।

%d bloggers like this: