কিশোরগঞ্জের শতবর্ষী সখিনা সাক্ষাত চান প্রধানমন্ত্রীর

Newsgarden-17-12-14নিউজগার্ডেন ডেস্ক : প্রায় শতবর্ষী বীর মুক্তিযোদ্ধা সখিনা বিবি রোগ-শোকে আক্রান্ত হয়ে অন্যের করুণা নিয়ে কোন মতে বেঁচে আছেন। একবার মাটিতে বসলে উঠে দাঁড়ানোর জোর নেই তার। অথচ মনের জোরেই লাঠিতে ভর করে ঘুরে বেড়ান এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি। ঘুরে বেড়ান কিশোরগঞ্জ জেলার হিলচিয়া বাজারে। দাদুসম নারী হিসেবে কিংবা উপহাসের অংশ হিসেবে অনেকেই তাকে কটকি বলে ডাকে। এ শব্দের অর্থ কী, তা তিনি জানেন না। জানার আগ্রহও নেই তার। তিনি প্রায়শই বলেন, ‘নিজে যা ভেবেছি, সত্য বলে মনে হয়েছে, সেখানেই গিয়েছি; সুতরাং কে কী বলল তা বিবেচনার বিষয় নয়।’ যোগ্যতার মাপকাঠিতে তিনি নিজেকে অনেকবার দাঁড় করিয়েছেন। অনেক রাজাকার, পাকহানাদার বাহিনীকে নিজের হাতে খুন করে নিজেকে বীরের পরিচয়ে পরিচিত করেছেন দেশের মানুষের কাছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত সেই ধারালো ‘রামদা’ মানুষকে সখিনার অদম্য সাহসিকতার কথা বারবার মনে করিয়ে দেয়। তার বিশ্বাস ইতিহাস ক্ষণিকের জন্য চাপা থাকতে পারে কিন্তু চিরতরে নির্মূল হবে না কখনও। শত বছর পরে হলেও নব উদ্যমে বেড়ে ওঠা কোনো তরুণ যখন নিজ হাতে গর্বিত ইতিহাস লিখবে তখন পরম ভালবাসায় সত্যকে তুলে ধরবে। বাজিতপুর উপজেলার বরমাপাড়া গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা লাল মিয়ার বাড়িতে থাকেন তিনি। তার বাবার নাম সোনাফর, মায়ের নাম দুঃখীবিবি। স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয় তার। যুদ্ধ শুরু হলে দায়বদ্ধ নাগরিক হিসেবে যোগ দেন মুক্তিবাহিনীতে। তার সঙ্গে যোগ দেন তার বোনের ছেলে মতিয়র রহমান। মতিয়র রহমান সরারচর গুরুইয়ে যুদ্ধে শহীদ হন। মতিয়রের মৃত্যু তাকে ভীষণ পীড়া দেয়। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নেমে পড়েন দেশদ্রোহী রাজাকার ও পাক-হানাদার হঠাবার কঠিন যুদ্ধে। করে যান একের পর এক সফল অপারেশন। এক পর্যায়ে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। কিন্তু উর্দু ভাষায় কথা বলে পাকবাহিনীর কাছে নিজেকে মুক্তিবিরোধী হিসেবে তুলে ধরে কৌশলে পালিয়ে আসেন তিনি। আসার সময় পাকবাহিনীর ক্যাম্প হতে একটি দা নিয়ে আসেন। এই দা দিয়েই ৫ জন রাজাকারকে কুপিয়ে হত্যা করেন তিনি। ওই দা বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে রক্ষিত আছে। দা’টিতে নামফলক হিসেবে সখিনা বিবি লেখা রয়েছে। সখিনা বিবি জানান, স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে ডাকাত বসু জেল থেকে ছাড়া পেয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। গড়ে তোলেন বসু বাহিনী। এই বাহিনী নিকলি বাজিতপুরে পাকবাহিনীর আতঙ্ক ছিল। সখিনা বিবি বসু বাহিনীর অধীনে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কাজ করতেন। সৈয়দ নজরুল ইসলামের পরিবারকে এই বাহিনী গার্ড অব অনার দিয়ে মেঘালয় দিয়ে সীমান্ত পার করে দিয়েছিল। দেশ স্বাধীন হলে বসু খুন হন। ৯৭ বছর বয়সী সখিনা বিবিকে যুদ্ধের কথা জিজ্ঞেস করলে অনর্গল কথা বলতে থাকেন। বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, ‘আমি বর্তমানে কেমন আছি তা কোনো বিষয় নয়। একজন বীরযোদ্ধা অন্যের বাড়িতে আশ্রিত আর সেই একই দেশে চলে অন্যের সম্পদ কেড়ে নেওয়ার মতো অনাচার আর অবিচার। এটা কি সহ্য করার মতো?’ এমনিতে স্বাভাবিক অবস্থায় থাকেন তিনি। কিন্তু রাজাকারদের নাম মুখে আনলে তেলে বেগুনে ক্ষেপে যান। তার কথা ‘এই দেশটাকে যারা পুঙ্গ করতে নিয়োজিত ছিল তাদের সঙ্গে কোনো আপোস নয়। হোক সে আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজন।’ জীবনের শেষ ইচ্ছা, নিজের চোখে দেখা এরকম অনেক ঘটনা তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলতে চান। তার এ ইচ্ছা পূরণ হবে কিনা, তা জানেন না মুক্তিযোদ্ধা সখিনা বিবি।

Leave a Reply

%d bloggers like this: