কিডনি রোগ হচ্ছে নীরব ঘাতক

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৩ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার: কিডনি রোগ হচ্ছে নীরব ঘাতক। এ রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, প্রথম দিকে এর কোনো উপসর্গ থাকে না। কিন্তু যখন উপসর্গ ধরা পড়ে, ততক্ষণে কিডনির প্রায় ৭৫ ভাগই বিকল হয়ে পড়ে। তবে, সচেতন এবং সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করলে রোগটির আক্রমণ থেকে বাঁচা সম্ভব। এ কারণেই মূলত নানা প্রতিপাদ্যে প্রতি বছর সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পালিত হয় বিশ্ব কিডনি দিবস। এতে কিডনি রোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে কিছুটা হলেও সচেতন করে তোলা সম্ভব হয়। তবে, কিডনি রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে বছরব্যাপী কর্মসূচি থাকা উচিত।
বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে আবার ৫০ লাখই শিশু। দেশে প্রতিবছর ২৫ হাজার লোকের কিডনি বিভিন্ন কারণে হঠাৎ করে অকেজো হয়ে যায়। প্রতিবছর কিডনিজনিত রোগে প্রায় ৪০ হাজার লোক মারা যায়। ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এ সংখ্যা। এর প্রধান দুটো কারণ হচ্ছে দেশে কিডনি রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা অপ্রতুল এবং নীরব ঘাতক এ রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ না করা পর্যন্ত রোগীরা চিকিৎসকের কাছে যান না। ৮৫ ভাগ রোগী কিডনি নষ্ট হওয়ার আগে আক্রান্ত কী না সেটা বুঝতেই পারে না। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে ৬০ ভাগ রোগীকে সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। নেফ্রাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের কারণে দেশের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ রোগীর ধীরে ধীরে কিডনি বিকল বা ক্রনিক কিডনি ডিজিস হয়ে থাকে। যাদের ক্রনিক ডিজিস আছে তাদের উচ্চ রক্তচাপসহ হার্টের নানা রোগের প্রবণতাও বেশি। কিডনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনি রোগ কখনো আগাম জানান দিয়ে আসে না। তবে কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে জানা এবং নিয়মিত পরীক্ষা করানো জরুরি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, বেশির ভাগ সময় রোগী রোগ জটিল হলে বা কিডনি বিকল হলে চিকিৎসকের কাছে যান। তখন হয় রোগীদের মৃত্যু পর্যন্ত ডায়ালাইসিস করে বাঁচতে হয় নইলে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হয়। দুটিই খুব শক্ত সমাধান। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ব্যথানাশকের মতো ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং খাবারে ভেজালের জন্য কিডনি রোগ হচ্ছে।
দেশে কিডনি রোগ চিকিৎসার সীমিত ব্যবস্থা থাকলেও তা খুব ব্যয়বহুল। প্রতিস্থাপন কার্যক্রম চালু থাকলেও সফলতার মাত্রা খুব বেশি সন্তোষজনক নয়। এই রোগের চাহিদা অনুযায়ী সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাও সীমিত। যা আছে তাও রাজধানীতে। সারাদেশের কিডনি রোগীরা চিকিৎসাসেবার জন্য রাজধানীতে গিয়ে অসহনীয় দুর্ভোগের শিকার হন। রাজধানীর বাইরে সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে কিডনি ইউনিট চালু হলেও যন্ত্রপাতি ও জনবল সংকট রয়েছে। জানা গেছে, দেশে ১৬ কোটি মানুষের জন্য রয়েছেন মাত্র ১০০ জন কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ এবং ২০ জন ট্রান্সপ্লান্ট সার্জন। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রত্যেক মেডিক্যাল কলেজে নেফরোলজি বিভাগ খোলা এবং নেফরোলজিস্টের পদ সৃষ্টি করা উদ্যোগ নেওয়া উচিত। আর যেহেতু জনসাধারণকে সচেতন করা গেলে এ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব, সেহেতু কিডনি রোগ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচি থাকা দরকার। প্রসঙ্গত, দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা ২ কোটি হলেও যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেয়া যায় মাত্র কয়েক হাজার রোগীকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে ৬০ ভাগ রোগীকে সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। এজন্য কিডনি রোগ হওয়ার আগে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। যে কোনো জ্বর বা ব্যথা হলে ওষুধ খাওয়ার আগে যদি শুধু রক্তের ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করা যায় এবং সে মোতাবেক ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করে রোগীকে পরামর্শ দেয়া হয়, তাহলে ১৫ থেকে ২০ ভাগ রোগীর আকস্মিক কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা সম্ভব। ঠিক তেমনি এনজিওগ্রাম করার আগে যদি আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা যায়, তাহলে আরও ১০ ভাগ ক্ষেত্রে এ রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে রক্তের চাপ কমে গিয়ে, সংক্রমণে যেমন খোস-পাচরা, অপারেশন পরবর্তী ইনফেকশন, অতিরিক্ত ব্যথানাশক ওষুধ ও এন্টিবায়োটিক সেবনে আকস্মিক কিডনি বিকল হয়ে যেতে পারে। এ রোগ প্রতিরোধে উচ্চরক্তচাপ বা ব্লাডপ্রেশারকে নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটা, অতিরিক্ত লবণ পরিত্যাগ, ফাস্ট ফুড, চর্বিজাতীয় ও ভেজাল খাবারসহ অবশ্যই ধূমপান বর্জন করতে পারলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়। এ রোগ থেকে বেঁচে থাকতে হলে নিরাপদ খাদ্য ও পানি পান করতে হবে, ব্যথ্যানাশক ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খাওয়া যাবে না। কিডনি রোগ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিকভাবে আটটি স্বর্ণালি সোপান কঠিনভাবে অবলম্বনের তাগিদ তৈরি হয়েছে। এগুলো হলো কায়িক পরিশ্রম ও নিয়মিত ব্যায়াম, উচ্চরক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, সুপ্ত উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান, ধূমপান থেকে বিরত থাকা, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন না করা এবং নিয়মিত কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা। এসবের সাথে সাধারণ স্বাস্থ্যবিষয়ক কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*