কাশ্মিরের রাজনৈতিক ইতিহাস

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৩ জুলাই ২০১৭, বৃহস্পতিবার: গুলমার্গে ঈদের দিন পাকিস্তান জিন্দাবাদ স্লোগান শুনে যখন হোটেলে ফিরে আসলাম, তখন কাশ্মিরের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে ভাবতে লাগলাম। প্রিয়তম লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা ধার করে বলা যায়, আমি ইতিহাস-আশ্রিত লোক। যখনই কোনো এলাকায় যাই, তার ইতিহাস না জেনে আমি সাধারণত কোনো কথা বলতে চাই না। তাই, কাশ্মিরে এসে কাশ্মিরের রাজনৈতিক পরিবেশের ইতিহাসটাও সবার সাথে শেয়ার করতে চাই।
কাশ্মিরের মানুষ অসম্ভব শান্তিপ্রিয়, ঘরকুনো, আয়েশি, অলস এবং সৌন্দর্যের পূজারী। কাশ্মির মানে পরীদের দেশ। ফুলে, ফলে, প্রকৃতিতে ও আতিথেয়তায় মাখামাখি ছবির মতো একটা দেশ। কাশ্মির মানে অশান্ত মনের শান্ত হওয়ার ঠিকানা, অতৃপ্ত মনের তৃপ্ত হওয়ার আশ্রয়। সেই কাশ্মিরে খুনাখুনি এখন একটা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশভাগের ক্ষত
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যখন এদেশ ছেড়ে চলে যায়, রক্তের হোলি খেলা শুরু চতুর্দিকে। বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগ হলো, হিন্দু-মুসলমান একে অন্যের গলা কাটল। বিশাল ভারতবর্ষে ৫৬২ টা ব্রিটিশ আশ্রিত ছোট বড় রাজ্য ছিল। ভৌগোলিক ভূখ- অনুযায়ী তারা সবাই নবসৃষ্ট ভারত-পাকিস্তানের সাথে যোগ দিল। কোনো কোনো রাজ্য এতই ছোট ছিলো যে-কয়েক পরিবার মিলেই রাজ্যের পরিসীমা ছিল। আবার কোনো রাজ্যের আয়তন ছিলো অনেক বিশাল।
চারটি এলাকা নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি হলো। তারা সহজে ভারত-পাকিস্তান কারো সাথেই মিশতে চায়নি। আজকের কাশ্মির সমস্যার মূলেও রয়েছে সেদিনের সেই সব জটিলতা।
প্রথমেই বলা যায়-হায়দারাবাদের নিজামের কথা। বর্তমান ভারতের পুরো তেলেঙ্গানা ও সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে ছিলো নিজামের বিশাল সাম্রাজ্য। নিজাম রাজ্যের শাসনকর্তারা ছিলেন মুসলিম, কিন্তু প্রজারা অধিকাংশই ছিল হিন্দু। ব্রিটিশ শাসকদের সাথে নিজামরা ট্যাক্স দিয়ে চরম বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। ব্রিটিশের শক্তি পেয়ে নিজাম তার শক্তি বৃদ্ধি করেন।
ব্রিটিশ আমলে অন্যান্য রাজ্যের রাজারা রাণী ভিক্টোরিয়ার দরবারে গেলে তাঁদের সন্মানে ১৫ বার কামানের তোপ দাগানো হতো, কিন্তু নিজামের বেলায় ১৯ বার। দেশভাগের সময় নিজাম তাঁর সাম্রারাজ্য নিয়ে স্বাধীন থাকতে চাইলেন। তখনকার কংগ্রেস নেতা ও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল নিজামকে এক বছর সময় দেন। নিজাম ভারতের সাথে যোগ দিতে চাইলেন না। লৌহমানব প্যাটেল এবার খেপে উঠলেন। ভারতীয় সেনাবাহিনী চতুর্দিক থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিজামের সাম্রাজ্যে। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান নিজাম। এভাবে নিজামের সাম্রাজ্য কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
দ্বিতীয় ঝামেল বাঁধলো পর্যটন নগরী গোয়ার বেলায়। প্রাচ্যের লাস ভেগাস খ্যাত এই ছোট্ট রাজ্য ছিল পর্তুগীজদের দখলে। পর্তুগীজরা ৪০০ বছর যাবত গোয়া শাসন করে। ভারত স্বাধীন হলেও গোয়া থাকে পর্তুগীজ দখলে। ভারত সরকার আলটিমেটাম দেয় গোয়ার পর্তুগীজ শাসনকর্তাদের। আলটিমেটামের মেয়াদ পেরিয়ে যায়, পর্তুগীজরা ক্ষমতা ছাড়ে না। সেখানেও ছোটখাটো এক সামরিক অপারেশনে গোয়াতে ভারত সরকারের কর্তৃত্ব কায়েম হয়।
তৃতীয় বিরোধপূর্ন এলাকা ছিলো গুজরাটের জুনাগড়। ৬০০ বছর যাবত জুনাগড়ে ছিল মুসলিম শাসন। দেশভাগের সময় জুনাগড়ের শাসক নবাব মহব্বত খান রসুল জুনাগড়কে পাকিস্তানের অংশ বলে ঘোষণা দেন। আবারো সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেলের তৎপরতায় জুনাগড়ের দখল নেয় ভারতীয় প্রশাসন। নবাবের ছিলো কুকুর পালার শখ। আড়াইশর বেশি পালিত কুকুর নিয়ে নবাব পাকিস্তান পালিয়ে যান।
চতুর্থ বিরোধপূর্ণ এলাকা হচ্ছে কাশ্মির। কাশ্মিরে আসলে সব ধর্মের প্রসার ঘটেছে যুগে যুগে। জম্মু-কাশ্মির-লাদাখ; এই তিন ভাগে বিভক্ত হচ্ছে কাশ্মির। জম্মু হিন্দু অধ্যুষিত, কাশ্মির মুসলিম অধ্যুষিত আর লাদাখ বৌদ্ধ অধ্যুষিত। সব মিলিয়ে মুসলমানরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। লোকজনের চেহারা, বেশভুষা ও আচার আচরণ পাকিস্তানের লোকজনের সাথেই মিল বেশি। ১৩৩৯ সালে শাহ মীর প্রথম মুসলিম শাসনের সূচনা করেন কাশ্মিরে
শত শত বছর মুসলমান শাসন প্রথমে ধাক্কা খায় পাঞ্জাবের বীর কেশরী রণজিৎ সিংহের আমলে। তিনি ১৮৩২ কাশ্মির দখল করে শিখ শাসন কায়েম করেন। শিখ শাসন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৮৪৫ সালে ব্রিটিশরা শিখদের পরাজিত করে কাশ্মির দখল করে। ব্রিটিশরা জম্মুর রাজা গুলাব সিংকে কাশ্মিরের রাজা মনোনীত করে জম্মু ও কাশ্মিরের শাসনকাজ পরিচালনার দায়িত্ব দেন। কাশ্মিরিদের দুঃখ দুর্দশার সূচনা বোধহয় সেদিন থেকেই হলো
দেশভাগের সময় কাশ্মিরের রাজা ছিলেন হরি সিং। তিনি প্রথমে ভারত-পাকিস্তান কারো সাথেই যোগ দিতে চাইলেন না। কিন্তু পাকিস্তানের তর সইছিল না। কাশ্মিরের দখল নেয়ার জন্য আচমকা আক্রমণ শুরু করে। হরি সিং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেুরুর সাহায্য চাইলেন। পাকিস্তান যদি আগে আক্রমণ না করে হরি সিংয়ের সাথে আলাপ আলোচনা করত, তাহলে ইতিহাস হয়ত অন্যরকম হতো। কারণ, কাশ্মিরের অধিকাংশ লোক পাকিস্তানের সাথেই থাকতে চাইত নিঃসন্দেহে।
নেহেরু সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন। পূর্ণ শক্তির ফৌজ পাঠালেন কাশ্মিরে। পাকিস্তানকে পিছু হটাতে বাধ্য করলেন। কাশ্মির হারালো তার পূর্ণ স্বাধীনতা লাভের সুযোগ। না পারল পুরোপুরিভাবে এক রাষ্ট্রের সাথে থাকতে।
কাশ্মির নিয়ে প্রথম পাক-ভারত যুদ্ধ হয় ১৯৪৮ সালে। তারপর ১৯৬৫ সালে ও ১৯৯৯ সালেও কাশ্মির নিয়ে যুদ্ধ হয় এই দুই রাষ্ট্রের মাঝে। কাশ্মির হয়ে উঠে ভারত-পাকিস্তানের রণভূমি।
যো করে খোদাকে খপ, উঠালে কালাশনিকভ
অর্থাৎ হে আল্লাহ বিশ্বাসীরা, হাতে হাতে তুলে নাও কালাশনিকভ। দেশভাগের পরও কাশ্মিরের পরিবেশ শান্তই ছিল। কাশ্মিরের অনেক জনগণ ভারতের সাথে অন্তর্ভুক্তি মেনে নিতে না পারলেও কেউ সশস্ত্র বিপ্লব করেনি। রক্তাক্ত সংগ্রাম শুর হয়েছে আশির দশকে। দুটি বৈশ্বিক ঘটনা কাশ্মিরের মানুষকে নাড়িয়ে দেয়। আফগানিস্তানে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে আমেরিকা-পাকিস্তানের ছত্রচ্ছায়ায় হাজার হাজার জিহাদী মুজাহিদ তৈরি হয়। এই জিহাদী মুজাহিদরাই আজকের অশান্ত মুসলিম বিশ্বের অন্যতম কারণ।
এই মুজাহিদরাই পরবর্তীতে কাশ্মিরের তরুণদেরকে ভারতবিরোধী জিহাদে উৎসাহ যোগায়। অন্য ঘটনা হচ্ছে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের তৎপরতা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ হাতছাড়া হওয়ার ঘটনা কোনোদিন ভুলতে পারেনি পাকিস্তান। আশির দশকে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জিয়াউল হক একটি তত্ত্ব দিয়েছিলেন। সেটি হলো ঃযড়ঁধহফং পধঃ থিওরি। মানে ভারতের জায়গায় জায়গায় যেখানে আঞ্চলিক বিরোধ আছে, সেগুলোতে ইন্ধন দিয়ে ভারতকে অস্থির করে ক্ষতবিক্ষত করে তোলা। কাশ্মিরি জনগণ যাতে ভারতের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে নামে সে ব্যাপারে ব্যাপক ভূমিকা রাখে পাকিস্তান। কাশ্মিরি লোকজন অনেকেই ভারতীয় পরিচয় ভুলে হয়ে গেল ‘কাশ্মিরিয়ত’।
অন্য প্রদেশের লোকজন কাশ্মিরে বেড়াতে গেলে তাদেরকে প্রশ্ন করত, ‘আপ ইন্ডিয়াসে আয়ে, আপ হামারা মেহমান হ্যায়।’ লোকজন যখন প্রশ্ন করত, ‘কিউ? আপ ইন্ডিয়ান নেহি?’
কাশ্মিরিরা সেই প্রশ্ন শুনত আর হেসে বলত, ‘হাম কাশ্মিরি’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*