কর জিডিপি বাড়ছে না

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২২ নভেম্বর: অর্থনীতির আকার, মাথাপিছু আয় ও জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে তাল রেখে দেশের কর জিডিপির হার বাড়ছে না। করজাল বাড়াতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কলাকৌশল নির্ধারণ এবং প্রয়োগেও আছে দুুর্বলতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কর কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণেও বহু করদাতা প্রকৃত আয় ও সম্পদ গোপন করার সুযোগ নিচ্ছেন। এতে সরকার বিপুল অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি কর প্রশাসনের দুর্বলতা, তদারকির অভাব, মূসক খাতের সঙ্গে আয়কর খাতের সমন্বয় না থাকাও কর জিডিপির হার না বাড়ার কারণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।Aikar
এছাড়া বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রত্যক্ষ করের (আয়কর) চেয়ে সহজলভ্য পরোক্ষ কর (মুসক ও শুল্ক ) আদায়েই বেশি মনোযোগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। ফলে প্রায় বাজেটেই দেখা যায় করারোপ প্রক্রিয়া সুষম হওয়ার পরিবর্তে বৈষম্যমূলক নজির। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর মধ্য দিয়ে সক্ষম জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ যেমন করজালের বাইরে থেকে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, তেমনি যারা দিচ্ছেন তাদের ওপরই বারবার করের বোঝা চেপে বসছে। আবার প্রত্যক্ষ কর হার বাড়ানোর উদ্যোগে প্রশাসনিক অদক্ষতা থাকায় রাজস্ব আদায়ে আয়কর খাত সর্বোচ্চ অবদান রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
সূত্র বলছে, দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী এখনও করজালের বাইরে রয়ে গেছে। কর প্রশাসনের হয়রানি শুধু যারা কর দিচ্ছেন তাদের প্রতিই বাড়ছে। অথচ যারা কর দেন না তাদের কোনো হয়রানির মুখে পড়তে হয় না। যারা রিটার্ন দাখিল করছেন তাদের কর নথিই বিভিন্ন অজুহাতে অডিট বা তদন্তের মুখে পড়ছে।
এদিকে দেশে আয়করের বড় অংশের জোগান দিচ্ছে উৎসে কর হার, যেখানে মুষ্টিমেয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এর জোগানদাতা। ফলে সরকারি ব্যয়ের প্রয়োজনীয় অর্থের সরবরাহের ক্ষেত্রে চালকের ভূমিকায় থাকে মূসক ও শুল্ক খাত। এতে করে পরোক্ষ করের আওতা বেড়ে যাচ্ছে। যার বোঝা সরাসরি জনগণের আয়ের ওপর গিয়ে পড়ছে। এটি চলমান অর্থনীতিতে বৈষম্যও উসকে দিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমাদের কর ব্যবস্থায় প্রশাসনিক দক্ষতার যথেষ্ট সীমাবদ্ধতা আছে। এছাড়া যারা কর দিচ্ছেন এমন করদাতার সঙ্গে কর আদায়কারীর সুসম্পর্ক তৈরি না হওয়া, হয়রানি-ভোগান্তি এবং কর সংক্রান্ত নিয়মাবলী সহজ না হওয়াও এর জন্য দায়ী। এসব কারণে কাক্সিক্ষতমাত্রার রাজস্ব আদায় করা যাচ্ছে না। এর থেকে উত্তরণে করদাতাদের উৎসাহিত করতে সর্বজনীন উদ্যোগ থাকা দরকার বলেও তিনি মনে করেন।
এ প্রসঙ্গে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ যুগান্তরকে বলেন, কিছু লোকের হাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুকায়িত অবস্থায় রয়েছে। কর কর্মকর্তারা তাদের কাছে পৌঁছতে পারছে না কিংবা খুঁজে বের করতে পারছে না। এটি সুষম ও ন্যায়ভিত্তিক কর ব্যবস্থা নির্দেশ করে না।
এনবিআরের তথ্যমতে, ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে টিআইএনধারী রয়েছে মাত্র ১৮ লাখ। এটি অতি নগণ্য। এর চেয়ে নগণ্য হচ্ছে কর দেয় মাত্র ১২ লাখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। যদিও খোদ এনবিআারের বার্ষিক প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২ কোটি টাকার ওপর সম্পদ থাকা মাত্র ৫ হাজার ৩২৯ জন কর প্রদান করেছে। অথচ ২০১৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে কমপক্ষে ১ কোটি টাকা কর দিতে সক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ১৭৭ জন।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৪০ বছরে বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বেড়েছে মাত্র ১০ শতাংশ। বর্তমানে এ হার দাঁড়িয়েছে ১৩.৪ শতাংশে। অথচ ভারতে কর জিডিপির হার ১৭.৭ শতাংশ, শ্রীলংকায় ১৫.৫ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৪.৬ শতাংশ। এসব দেশে প্রত্যক্ষ করের অবদান ৩৩-৩৫ শতাংশের মধ্যে। তবে উন্নত দেশগুলো সংগৃহীত কর রাজস্বের সিংহভাগই আসছে আয়কর খাত থেকে। সেখানে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ করের অবদান মাত্র ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে বেশি ব্যয় করা দেশগুলোতে কর-জিডিপির অনুপাত অনেক বেশি। যেমন ডেনমার্কে এ হার ৪৭ শতাংশ। এক্ষেত্রে যেসব দেশের জিডিপি বেশি তাদের কর-জিডিপি অনুপাত গড়ে ২২ শতাংশ। আর মধ্যম ও নিু মধ্যআয়ের দেশগুলোয় গড় কর-জিডিপি যথাক্রমে ১৮ ও ১৪ শতাংশ। তবে সার্বিকভাবে বিশ্বব্যাপী গড় কর-জিডিপি অনুপাত ১৯ শতাংশ। অথচ ৪০ বছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বেড়েছে মাত্র ১০ শতাংশ। এ হার বর্তমানে ১৩.৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যে কোনো দেশে সুষম হারে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সর্বোচ্চ আয়কর কমপক্ষে ৪০ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশে সংগৃহীত কর রাজস্বের প্রায় ৭৬ শতাংশের জোগান আসে পরোক্ষ কর থেকে। যেখানে ভারতে ২ থেকে ১২.৫ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় শূন্য শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৭ শতাংশ ও কানাডায় ৫ শতাংশ রাজস্ব আসে পরোক্ষ কর থেকে।
এক প্রশ্নের জবাবে ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, করের আওতা বাড়ানোর সব রকম সম্ভাবনাই বিদ্যমান অর্থনীতির রয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক দুর্বলতা এখনও কাটিয়ে উঠতে না পারায় সবার কাছে কর দেয়ার বার্তা নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ড. আজিজুল ইসলাম মনে করেন, অর্থনীতি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আয়ও বাড়ছে। তবে সে অনুযায়ী সবাই কর প্রদান করছে না এটাই হল বাস্তবতা। এতে সময়ের উন্নয়ন চাহিদা ও সরকারি ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান পেতে কিছু লোকের ওপরই বারবার করের বোঝা চাপানো হচ্ছে। অথচ দেশে কর প্রদানের সক্ষম ও সামর্থবান ব্যক্তির গণ্ডি এখন রাজধানীসহ বিভাগীয় ও জেলা শহর ছাড়িয়ে উপজেলাস্তর এমনকি গ্রামীণ পর্যায়েও বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু সেসব করদাতার কাছে পৌঁছানোর মতো বিস্তর পরিসরের কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এতে কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতাও বাড়ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, দেশে আয়কর আদায়ের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির মাত্র ১ শতাংশ। এর থেকে বোঝা যায়, দেশে করজাল বিস্তৃত হচ্ছে না। আবার ধনী ও সামর্থ্যবানরাও ঠিকমতো কর দিচ্ছে না। করজাল বাড়ানো গেলে সরকারের রাজস্ব যেমন বাড়ত, তেমনি ধনীরা সঠিকভাবে কর দিলে বিদ্যমান বৈষম্যও দূর হতে পারত। একই সঙ্গে দেশে করবান্ধব পরিবেশেরও অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটি নিশ্চিত করা গেলে শুধু আয়কর খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের মধ্যদিয়েই বর্তমান কর জিডিপির হার কমপক্ষে সাড়ে ৩ শতাংশে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: