কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে শুরু হয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের বর্ষাবাস উৎসব

অজিত কুমার দাশ হিমু, কক্সবাজার : কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের জলসিক্ত উর্মিমালা ও বিস্তীর্ণ ঝাউবনে শুরু হয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের দু’মাস ব্যাপী বর্ষাবাস উৎসব। এ উৎসবকে ঘিরে বিস্তীর্ণ সমুদ্র সৈকতে জৈষ্ঠ্য ও আষাঢ় মাসের প্রতি শুক্রবার এবং শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহে বসবে রাখাইন সম্প্রদায়ের নর-নারীদের মিলনমেলা। এ উৎসবে শুধু রাখাইন নয়, সম্প্রীতির বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করার প্রত্যয়ে যোগ দিয়েছে হিন্দু, মুসলিম ও খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের আবাল-বৃদ্ধা-বনিতা সকলেই। কবিগুরুর গানের মত ‘বাদল দিনের প্রথমও কদমও ফুল’ যদিও বর্ষার দেখা এখনও পাওয়া যায়নি। তবুও বর্ষা উৎসবের শুরু তো হবেই। ২৯ মে শুক্রবার সকাল থেকে তীব্র তাবদাহ উপেক্ষা করে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ পাশ্ববর্তী পার্বত্য জেলা থেকেও রাখাইন সম্প্রদায়ের নর-নারীরা এ উৎসবে যোগ দিয়েছেন। পুরোদিন উৎসবমুখর ছিল কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের শৈবাল পয়েন্ট ও ডায়াবেটিক পয়েন্টের বিস্তীর্ণ ঝাউবন। জানা যায়-জৈষ্ঠ্য’র শেষ শুক্রবার ও আষাঢ় মাসের প্রতি শুক্রবার এবং শ্রাবণ মাসের প্রথম শুক্রবার পর্যন্ত চলবে রাখাইন সম্প্রদায়ের এ বর্ষাবাস উৎসব। তারা নিজ ঘর থেকে রান্না করে আনা, নানাজাতের খাবার খেয়ে দিনটি পালন করে। বাড়ি থেকে সঙ্গে আনা খাবারের সাথে থাকে নিজস্ব rakhaine-borsha-utshob-29-05-2015তৈরি পানীয় ‘প্রায়ইং’ (এক প্রকার চোলাই মদ)। এ সময় দেখা দেয় তাদের মাঝে বাঁধভাঙ্গা আনন্দ-উচ্ছ্বাস। তরুণ-যুবাদের কলকাকলিতে মুখরিত হয় পুরো সমুদ্রতীর ও তীরবর্তী ঝাউবনে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঝাউবীথিতে সময় কাটায় তারা। এসময় স্থানীয় অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতিও হয় তুলনামূলক বেশি। প্রতিবছর বৌদ্ধদের অন্যতম ধর্মীয় অনুষ্ঠান প্রবারণা পূর্ণিমার আগে দু’মাসব্যাপী সমুদ্র সৈকতে রাখাইনরা বর্ষা উৎসব পালন করে থাকে। এ সময় তারা হেসে খেলে ও নানা ধর্মীয় গানের মধ্য দিয়ে সময় পার করেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের দৃষ্টিকোণ থেকে রাখাইনরা এ দু’মাসের প্রতি শুক্রবারকে বিশেষ মর্যাদায় পালন করে থাকে। সে হিসাবে সমুদ্র পাড়ের ‘বর্ষাবাস উৎসব’ উপজাতি সম্প্রদায়ের মিলন মেলায় পরিণত হয়। বৌদ্ধ ধর্মের রীতিতে এ উৎসব আত্মত্যাগ অর্থাৎ সংযমের উদ্দেশ্যেই ‘বর্ষা বাস’ কে তারা বিগত দিনের পাপ তাপ ধুয়ে মুছে নিজেকে আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে নিতেই এ উৎসব পালন করেন রাখাইনরা। রাখাইনদের বিশ্বাস এ বর্ষাবাস উৎসবের মাধ্যমে দূর হবে সকল পাপ, পঙ্খিলতা, রোগব্যাধিসহ সকল সমস্যা। এ উৎসবে সকলের আশা আকাঙ্খা পূর্ণ হবে এমন কামনায় শুরু হয়েছে এই বর্ষা উৎসবের। বর্ষা অনুষ্ঠানে আসা রাখাইন তরুণ ক্যজ অং বলেন, রাখাইন সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান হচ্ছে ‘সাংগ্রাং পোয়ে’ বা ‘জলকেলি উৎসব’। পুুরোনো বছরকে বিদায় জানাতে এবং নতুন বছরকে বরণ করে নিতেই মূলত এই উৎসব। কিন্তু ‘বর্ষা উৎসব’ কেবলই অনাবিল আনন্দের উৎসব। বৃষ্টি যত বাড়ে আনন্দের মাত্রাও তত বেশি হয়। যেহেতু এ বছর এখনো বৃষ্টির দেখা মেলেনি, তারপরও এ উৎসব চলবে শ্রাবন মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। বর্ষা উৎসবে যোগ দিতে ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন অনেক রাখাইন তরুণ-তরুণী। সবাই মিলে সমুদ্রের জলে øান করে আনন্দ করার মজাটা তাঁদের কাছে আলাদা। উৎসবে যোগ দেওয়া একজন তরুণী বলেন, ‘এই উৎসব কেবল কক্সবাজার সৈকতেই হয়। সমুদ্রের জলে ভিজে সবাই মিলে নাচ-গানে মেতে উঠতে ভীষণ ভালো লাগে। তরুণদের কাছে এই দিনটির তাৎপর্যই আলাদা। অনেকে সারা বছর দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন।’ উৎসবে আসা অংসা প্র“ রাখাইন জানান, এটা ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ নয়, তবে ধর্মীয় একটি রীতি পালনের পূর্ব প্রস্তুতির অংশ জৈষ্ঠ্যের শেষ শুক্রবার ও আষাঢ় মাসের প্রতি শুক্রবার কক্সবাজার সৈকতের ঝাউ বাগানে উপজাতি সম্প্রদায়ের মিলন মেলা বসে। বৌদ্ধ ধর্মের রীতিতে শ্রাবণের দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হয় বর্ষাবাস। ধর্মীয় রীতি অনুসারে খাবার থেকে শুরু করে নানা বিষয়ে সংযমের উদ্দেশ্যে এ বর্ষাবাস পালন করা হয়। এ বর্ষাবাসের আগে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সপ্তাহে শুক্রবার অতি আনন্দ প্রকাশের মাধ্যম এটি পালন হয়ে থাকে। মংথেহ্লা রাখাইন নামে এক তরুণ জানান, এ উৎসব এক ধরনের ‘প্রীতিভোজ’। পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের মাধ্যমও। হাজারো ব্যস্ততার কারণে অনেক স্বজনের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাওয়া যায় না। এ উৎসবে সে সুযোগ করে দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*