এসএসসি’র পর ভর্তি উদ্বেগ ডিপ্লোমাতে বাড়–ক এই গতিবেগ

মো. আবুল হাসান, সভাপতি, খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব, ০৮ জুন ২১০৭, বৃহস্পতিবার: এবার এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষা পাস করেছে গড় ৮০.৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। গত বছর পাসের গড় ছিল ৮৮.২৯ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় কমেছে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা, কমেছে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। কোনো কোনো সংবাদ মাধ্যমে একে ফলাফল বিপর্যয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে ফলাফলে। পাসের হার কমলেও সৃজনশীল এবং প্রকৃত মেধাবীরাই এই পদ্ধতিতে উত্তীর্ণ হয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডসহ ১০ বোর্ডের অধীনে ২০১৭ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৯৬২ জন। এর মধ্যে পাস করেছে ১৪ লাখ ৩১ হাজার ৭২২ জন। মোট জিপিএ ৫ পেয়েছে এক লাখ। এবার শতভাগ পাস করা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্ইু হাজার ২৬৬, গত বছর যা ছিল চার হাজার ৭৩৪ । একজনও পাস করেনি এমন প্রতিষ্ঠানও গত বছরের তুলনায় বেড়েছে ৪০টি। গত বছর ছিল ৫৩টি, এবার হয়েছে ৯৩টি। দেখা গেছে, গত ১৬ বছরেই এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার হু হু করে বাড়ছিল। ২০০১ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৩৫.২২ শতাংশ আর গত বছর সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৮৮.২৯ শতাংশ। এমনকি ২০১৪ সালে পাসের হার উঠেছিল ৯১.৩৪ শতাংশে।
এবার এসএসসির ফল গতবারের চেয়ে খারাপ হওয়ার কারণ হিসেবে তিনটি বিষয় উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা । এগুলো হলো- নতুন পদ্ধতিতে উত্তরপত্র মূল্যায়ন, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ এবং পরীক্ষা কেন্দ্রে কড়াকড়ি। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করা ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেশি। এই ফেল করা ছাত্রছাত্রীদের কেউ কেউ হতাশা, গ্লানি, ক্ষোভে আতœহত্যা করছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। কৈশোরে-তারুণ্যে আত্মহত্যার একটি অন্যতম কারণ পরীক্ষায় ফেল করা। জীবন কখনো কারও জন্য কেবলই কমেডি ছিল বা থাকবে তেমনটি নয়, মাঝেমধ্যে ট্রাজেডিও নেমে আসে। এই বোধ তাদের মধ্যে এখনো জেগে উঠেনি।
এবারের ফল বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশিত হওয়ার যে নিয়ম রয়েছে, এবারও  সে ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ রাখা হয়েছে। বিষয়টি প্রশংসনীয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, দ্রুত ফল ঘোষণা শিক্ষার্থীদের পরবর্তী ধাপের শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এসএসসি পরীক্ষা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের জীবনের বড় ধরনের একটি বাঁকে ফেরার কেন্দ্র। এ পরীক্ষার ফলের ওপর শিক্ষার্থীর পরবর্তী ধাপের শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি অনেকাংশে নির্ভর করে। কাজেই ভাল ফলের জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকমণ্ডলীসহ সংশ্লিষ্ট সবার যতœবান ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অনুত্তীর্ণদের সংখ্যা শূন্যের কাছাকাছি আনার চ্যালেঞ্জও গ্রহণ করা দরকার।
বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে অরাজকতা জন্মলগ্ন থেকেই। প্রায় অর্ধশত বছরেও আমরা সে অরাজকতা থেকে জাতিকে মুক্ত করার পথসন্ধান করিনি। বরং একের পর এক গিনিপিগের মতো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর আত্মঘাতি পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছি। ২০১৭ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর অদ্ভুত সব কাণ্ড নজরে আসে দেশবাসীর। পরীক্ষার গড় পাসের হার গত বছরের ৮৮.২৯ শতাংশ থেকে ৭.৯৪ শতাংশ কমে এবার হলো ৮০.৩৫ শতাংশ। রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার সর্বোচ্চ (৯০.৭), আবার কুমিল্লা বোর্ডে পাসের হারের পার্থক্য ২১.৩২ শতাংশ। সর্বোচ্চ হারে পাস করা রাজশাহী বোর্ডের সঙ্গে কুমিল্লা বোর্ডের পার্থক্য ৩১.৬৭ শতাংশ। শিক্ষায় অধগতির যে চিত্র দীর্ঘদিনের তার পরিস্ফূটন হলো মাত্র।
২০০৯ সালে ঘটা করে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে যুযোপযোগী একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু সেই নীতি মাঠে থাকা সত্ত্বেও কে বা কারা পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ওপর প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা চাপিয়ে দেয়। ২০১০ সাল থেকে অষ্টম শ্রেণিতেও জুনিয়র সার্টিফিকেট পরীক্ষা নামে আরও একটি পাবলিক পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের একমাত্র দেশে পরিণত হয়েছে, যেখান ১২ বছরের শিক্ষাজীবনে শিক্ষার্থীদের চার-চারটি পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। আর তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সম্পূর্ণ শিক্ষা হয়ে পড়েছে পরীক্ষামুখী।
এসএসসি ও সমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শুরু হয় কলেজে ভর্তির লড়াই। একাদশে ক্লাস শুরু ১ জুলাই। এদিকে ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কলেজ আসন সঙ্কটের নানা খবরে প্রতিবছরই ভীতি ছড়িয়ে পড়ে পাস করা শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মাঝে। আমরা লক্ষ্য করছি মাধ্যমিক শিক্ষা ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার মধ্যে গভীর সর্ম্পক গড়ে উঠেছে। মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের একই ছাতায় উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এই সূত্র ধরে ক্যাডেট কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, নৌ, বিমান, বিজিপি, পুলিশ পরিচালিত প্রতিষ্ঠানসমূহে মাধ্যমিক শিক্ষার সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। রাজধানী, বিভাগ, জেলা, উপজেলায় অধিকাংশ স্কুলে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে বেকার তৈরি কারখানা পাকাপোক্ত করা হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মানুষের অভ্যন্তরের মানুষটিকে পরচর্যা করে খাঁটি মানুষ বানানোর প্রচেষ্টাই শিক্ষা’, শিক্ষা হলো বাইরের প্রকৃতি ও অন্তঃপ্রকৃতির মধ্যে সমন্বয় সাধন। এ কথা বলা অত্যুক্তি নয় যে, বিশ্বব্যাপি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ-সুবিধার সাথে ডিপ্লোমা শিক্ষা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার দেশব্যাপী ১০০টি বিশেষায়িত শিল্পজোন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই সমস্ত শিল্পজোনে সফলভাবে শিল্পস্থাপন ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য আমাদের দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে ডিপ্লোমা শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের ডিপ্লোমা শিক্ষার সমস্ত কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ঢাকাকেন্দ্রিক। আমাদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই প্রথা ভেঙে দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে উন্নয়নের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। ঢাকা আমাদের ঢেকে রেখেছে। আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হলে ঢাকার ঢাকনা সরিয়ে উঠে আসতে হবে। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার ঘটছে। বলা যায় বিশ্বায়ন বর্তমানে সুদৃঢ় প্রযুক্তিগত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। বর্তমানে দেশের বহুল আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। শিক্ষা তথা ডিপ্লোমা শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি। ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থিতিশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বহুমাত্রিক শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার যথোপযুক্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে থাকে। এভাবে উপযুক্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত শিক্ষাব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত ও তথ্য বিপ্লবের সুযোগ গ্রহণ করে শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী মানবসম্পদে পরিণত করে।  বিগত বছরগুলোর শ্রম চাহিদা বৃদ্ধি, ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এ দুইয়ের ভিত্তিতে দেখা যায়, প্রাক্কলিত শ্রম চাহিদা সরবরাহের তুলনায় বেশি হয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে ধরে রাখতে পারলে এ অতিরিক্ত চাহিদা বেড়ে সব বেকার ও অর্ধবেকারের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে। এ চাহিদা সৃষ্টির জন্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন করতে হবে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে মোট ১ কোটি ৪০ লক্ষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ শ্রমশক্তি প্রয়োজন হবে। বিপুল সংখ্যক এই ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদ তৈরির জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সম্প্রসারণ ও প্রশিক্ষণদান পরিকল্পিতভাবে এগুতে হবে। এটি সুচিন্তিভাবে ও পর্যায়ক্রমে করতে হবে। শিল্প ও সেবা খাতের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় রেখে এটা করতে হবে।
বিপুল সংখ্যাক ডিপ্লোমা প্রযুক্তিবিদ তৈরি করতে হলে যেখানে হাই স্কুল আছে, তাঁরই পার্শ্বে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট নির্মাণ করতে হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সমান্তরালে ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের বিকল্প চিন্তা হবে আত্মগাতি। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভর্তি উদ্বেগ দূরীকরণের দায়িত্ব এক্ষেত্রে ডিপ্লোমাকে প্রাধ্যান্য দিতে হবে। লেখক: ডিপে¬ামা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।

Leave a Reply

%d bloggers like this: