এখনো বর্তমান

মো: দিদারুল আলম, ১৫ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার: আকাশ খুবই মেঘাচ্ছন্ন মনে হচ্ছে। এই শীতকালে আকাশে মেঘ কিন্তু বের হয়ে দেখলাম না তো কুয়াশা। কুয়াশা দেখলে মনে হয় মনের গহীনে অজানা আশঙ্খা ভর করে। কারণ এই কুয়াশার মধ্যে কত কত দুঘর্টনা ঘটে যায়। অনেক দুর্ঘটনা হতে পারে, সেটা হতে পারে সড়ক দুর্ঘটনা, জীবনের কোন গুরুত্বপূর্ণ কিছু হারিয়ে ফেলার দুর্ঘটনা। 

– খুব তাড়াতাড়ি বের হতে হবে, কিছু খেতে দাও মা।
– শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, তুই নিজেই খেয়ে নেয়।
– ঠিক আছে, তুমি বিশ্রাম নাও, আমি বিকেলে আসার সময় ওষুধ নিয়ে আসব,
– তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসিস।
– ঠিক আছে বলে ফাহিম ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
ফাহিম ঘর থেকে বের হয়ে দেখল রাস্তায় অনেক জ্যাম। তাকে উঠতে হবে পাবলিক বাসে কিন্তু গাড়িতে যে ভরপুর মানুষ কীভাবে উঠবে বুঝে উঠতে পারছে না। তার কাছে খুব বেশি টাকা-পয়সা নেই যে সিএনজিতে কলেজে যাবে। সে ভাবে ইস্ টাকা – পয়সা থাকলে রিকসা বা সিএনজিতে যেতে পারতো।
ফাহিম কলেজে এসে দেখে কলেজটা খুব মনোরমভাবে সাজানো হয়েছে। সামনে কলেজের নবীন – বরণ অনুষ্ঠান। কিন্তু তার সেদিকে খেয়াল নেই। ক্লাস শেষ করে তাড়াতাড়ি টিউশনিতে যেতে হবে, আম্মার জন্য ওষুধ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে এবং সর্বশেষ নিজের পড়াশোনা নিয়ে বসতে হবে।
সে মাকে ওষুধ খেতে দিয়ে নিজে পড়াশোনা করতে লাগল কিন্তু কিছুতেই পড়াতে মন বসাতে পারছে না। সারাক্ষণ কলেজের বিশেষ একজনের কথা মনে পড়ে। বইয়ের পাতায় ঝাপসা – ঝাপসায় একজন দেখে। যার সাথে অল্প কথাবার্তা হয়েছে নাম, গ্রাম ও কোথায় বাড়ি এতটুকু পর্যন্ত কিন্তু অল্প সময়ে তাকে এত ভালো লেগেছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ফাহিমের সবসময় তার কথা মনে পড়ে, ঘুমুতে গেলে, পড়াশোনা করতে গেলে, বাইরে বের হলে।
অধরা কলেজের অনুষ্ঠানের জন্য নিজেকে খুব সুন্দর করে সাজিযেছে। মেয়েটি খুব শান্ত কিন্তু চাপা স্বভাবের। সবার সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রেখে চলে। দেখতে খুব সুন্দরী-মায়াবতী। ফাহিম তার সাথে টুকটাক কথাবার্তা বলে, এর বেশি সে কথা বলতে পারে না, বাস্তবতার কারণে সে এগুতে পারে না। বাস্তবতা হলো তার পরিবার খুব গরীব, বাবা নেই, নেই ভাই-বোনও, শুধু মা-ই আছে। তাকে টিউশনি করতে হয়। নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাতে হয়। তাইতো অধরাকে ভালোবাসার কথা বলতে পারে না। শুধু দুর থেকে তাকিয়ে থাকে আর সারাদিন মনে মনে ভাবে এবং নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করে। মাঝে মাঝে তাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় ঘর – সংসার পর্যন্ত। কিন্তু সম্ভিত ফিরে পেলে আগের জায়গায় ফিরে আসতে হয়। অভাব অনটন তার নিত্যসঙ্গী।
গরীব মানুষের জন্য ভালোবাসা আসেনি। ছেলে গরীব হলে মেয়ে বড় লোক হলে তো নয়-ই। তবে ব্যতিক্রম আছে কিন্তু এই ব্যতিক্রমই অনেক কষ্টের, এরা শুধু ভেতরে ভেতরে দহনে ভোগে। কাউকে বুঝতে দেয় না। এদের আরো একটি ভয থাকে হারানোর বা অপমানের।
অধরা বড় লোকের মেয়ে। তার বাবা বড় ব্যবসায়ী। তাদের অনেক টাকা-পয়সা। অভাব কখনো তাকে গ্রাস করেনি। কলেজে ছেলেদের পছন্দের তালিকায় এক নম্বরে। অনেক স্মার্ট ও বড় লোকের ছেলে তাকে ইতিমধ্যে ভালোবাসার প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখান হয়েছে। তার একটা বড় গুণ সে কারো সাথে খারাপ আচরণ করেনি। সেও একজনকে কাছে পেতে চায়, কিন্তু পারে না। পরিবার থেকে কড়া নিষেধাজ্ঞা আছে প্রেম – ভালোবাসায় না জড়ানোর জন্য। কারণ তার বড় বোন একজনের সাথে প্রেম করে ঘর ছেড়েছে। এখনো তার পরিবার তাদের বিয়ে মেনে নেয়নি। কারণ এটা ছিল অসম। তাই অধরাকে তার মাতাপিতা হারাতে চায় না।
আগামীকাল কলেজের অনুষ্ঠান। অধরা অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা পোশাক বানিয়েছে। কত পরিকল্পনা! সে অনুষ্ঠান উপস্থাপনার দায়িত্বে আছেন, তার বাচনভঙ্গি, উচ্চারণ ও স্টাইল এক কথায় চমৎকার। এ কারণে শিক্ষকরাই তাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন। সে অনেক প্রস্তুতি নিয়েছে ; যেমন – কীভাবে কথা বলবে, অনুষ্ঠান কীভাবে সাজাবে,
কোনটির পর কোনটি আসবে তা নিয়ে মহাব্যস্ত।
যা হোক, সকাল সকাল অধরা কলেজে চলে এসেছে। তখনো অনেকেই আসেনি। ফাহিমের মা কলেজের অনুষ্ঠানের দিন অসুস্থ বোধ করছে। সে যাবে কিনা ভাবছে। সে জানে অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করবে অধরা। নিশ্চয় সে খুব সুন্দর করে সেজেগুজে আসবে। তাকে দেখার লোভ সামলাতে পারছে না। একদিকে মা অসুস্থ অন্যদিকে অধরাকে এক নজর দেখার আকুতি। সে এখন বুঝতে পারছে না কী করবে। ঠিক সে সময় মা তাকে ডাকল ফাহিম আমার একটু ভালো লাগছে। তুই কলেজে যা তবে তাড়াতাড়ি ফিরবি।
সকাল ১০টায় অনুষ্ঠান শুরু হলো। শুরুতে প্রিন্সিপাল সাহেবের বক্তব্যের পর শুরু হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অধরার সাবলীল উপস্থাপনায় অনুষ্ঠান চলতে লাগলো। এদিকে ফাহিম দ্বিতীয় সারির মাঝখানে বসে অনুষ্ঠানের উপভোগ করছে, অনুষ্ঠান উপভোগের চেয়েও অধরার দিকে তাকিয়ে আছে। সে এমনভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে অধরার নিজেকে মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে। সেও মাঝে মাঝে তার দিকে তাকায়।
হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে মার কথা মনে পড়ে গেল ফাহিমের। তখনো অনুষ্ঠান শেষ হয়নি। সে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে গেল। মার কাছে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে জিজ্ঞেস করল মা আমাদের মতো গরীব ছেলেদের অভাব – অনটনের জন্য অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। অনেক কিছু সহ্য করতে হয়। কেন কী হয়েছে তোর এভাবে কথা বলছিস কেন, কী হয়েছে আমার ছেলের, না মা, তেমন কিছু না, এমনিই বললাম।
এদিকে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর অধরাকে ভালো উপস্থাপনার জন্য, গুচিয়ে কথা বলার জন্য, সুন্দর করে অনুষ্ঠান সাজিয়ে নেয়ার জন্য একে একে সবাই ধন্যবাদ জানাতে লাগল কিন্তু মনে মনে সে প্রত্যাশা করল ফাহিমকে। ফাহিমের জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চলে গেল। গাড়িতে বসে বসে সে ফাহিমের কথা ভাবল। ছেলেটি দেখতে অমায়িক। খুব গুচিয়ে কথা বলে। দূর থেকে তাকায় কেন যেন কাছে আসতে ভয় পায়, কথা বলে না।
আজ ফাহিম খুব তাড়াতাড়ি কলেজে এসেছে। টিউটোরিয়াল আছে। অধরাও তাড়াতাড়ি এসেছে। কলেজের বারান্দায় তাদের দেখা হয়ে গেল। অধরা জিজ্ঞেস করল-
-কেমন আছ
-ভালো, তুমি কেমান আছ?
– ভালো আছি।
– কাল তুমি তাড়াতাড়ি চলে গেছ কেন?
– মা, অসুস্থ ছিল, তাই তাড়াতাড়ি চলে গেছি তাই।
-এখন কেমন আছেন তিনি।
– ভালো আছে।
– আচ্ছা, তোমাকে সবসময় অস্থির-অস্থির মনে হয় কেন?
-কই নাতো, ফাহিম মনে মনে বলে তোমাকে দেখলে আমার অস্থিরতা বেড়ে যায়।
– ঠিক তেমন অবস্থা অধরারও।
তারা দু’জন দুজনকে এত ভালোবাসে কিন্তু কেউ বলতে পারছে না। দু’জনেই অদৃশ্য বাধাই বাধা। ক্লাস শেষে দুজন দুজনের পথে চলে গেল। বাসায় পরস্পর পরস্পরকে আরো বেশি অনুভব করলো।
পথ অনেক গড়িয়েছে। এখন দুজন দুজনের জায়গায় প্রতিষ্টিত। কিন্তু কেউ কাউকে ভুলতে পারছে না। কালেভদ্রে কথা হয়, শুধু সৌজন্যটুকু, অনুভব করে প্রচ-ভাবে। এভাবে চলছে তাদের জীবন। বাস্তবতার কথা ভেবে কেউ আগায় না। তবে মাঝে মাঝে তাদের ইচ্ছে হয় নিয়ম ভাঙতে কিন্তু পারে না। ওই ইচ্ছাটুকু পর্যন্ত।
তবে দু’জন দু’জনের এখনো বর্তমান।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গল্পকার

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*