এই পাঠ্যবই সাম্প্রদায়িক করবে শিশুদের’

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : ২৫ জানুয়ারি,২০১৭

বর্তমান শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যবইয়ে যে পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে সেগুলো শিশুদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটাবে বলে আশঙ্কার কথা বলেছেন বিশিষ্টজনরা। তারা বলছেন, সরকার উগ্রবাদী হেফাজতে ইসলামের প্রতি নতি স্বীকার করেছে। এটা দেশকে একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে।

বুধবার রাজধানীতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এক গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়ে শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিশিষ্ট সাংবাদিকরা এসব কথা বলেন। গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। আলোচনায় পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করে এ বিষয়ে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সরকারের বক্তব্য জানতে চেয়েছেন আলোচকরা।

বর্তমান শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যবইয়ে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। পাঠ্যবইয়ে হিন্দুত্ববাদের প্রচার চলছে-উগ্রবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলাম এমন দাবি তুলে পাঠ্যবই থেকে কিছু আধেয় সরিয়ে নিতে সরকারকে তালিকা দেয়। আর পাঠ্যবইয়ে এমন কিছু বিষয় সংযোজন করা হয় যা হেফাজতের দাবির মধ্যে ছিল।

এ বছর সারা দেশে ৬৪০টি বইয়ের ৩৬ কোটি ২১ লাখ ৮১ হাজার বই ব্যাপক পরিবর্তনের পর ছাপা হয়। ব্যাপক পরিবর্তনের ফলে বইয়ে বিভিন্ন ভুলে ভরা। এ নিয়ে গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এক পর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রী সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বড় ভুলগুলো আঠা দিয়ে ঢেকে দিতে বলেন। তা নিয়েও গণমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

গোলটেবিল আলোচনায় বিশিষ্ট কলাম লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তকে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর সুপারিশ অনুযায়ী পরিবর্তন করা হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশে গড়া বাধাগ্রস্ত করবে এই পরিবর্তন। পাঠ্যপুস্তকে যা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তার কোনো ব্যাখ্যা দেয় নাই। যারা পাঠ্যপুস্তক বদলিয়েছেন তাদেরকে নিয়ে গণশুণানি করা উচিত।’

আবুল মকসুদ বলেন, ‘তারা যদি গণশুনানিতে বলে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তনে কোন যুক্তি নাই, শাপলা চত্বরের দাবি বাস্তবায়ন করেছি। তাও ভালো, অন্তত জানা যাবে। এই ঘটনায় যার জড়িত তাদেরকে জনগণের সামনে দাঁড় করানো উচিত।’

শিক্ষার মান এখন সর্বকালের নিম্নে নেমে গেছে উল্লেখ করে আবুল মকসুদ বলেন, ‘এবার তার সাথে যোগ হয়েছে সাম্প্রদায়িকতা।’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি নাছিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, ‘দেশ এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের সময় পার করছে। জঙ্গি হামলার পর পাঠ্যপুস্তকে আনা পরিবর্তন আমাদেরকে আতঙ্কিত করেছে। এই পাঠ্যবই জাতিকে সাম্প্রদায়িক করে বিভক্ত করবে। এখন বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িকতার উর্বর ভূমি দেখছি।’

নাট্য ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘হেফাজতের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে সরকার। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার জায়গায় সাম্প্রদায়িক চেতনা আজ ঢুকেছে পাঠ্যবইয়ে। হেফাজতের ১৭টি সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবার।’ তিনি বলেন, ‘পাঠ্যবইয়ে কোনটা কোনটা বাদ দিতে হবে তা হেফাজত বলেছিল এবং সেভাবেই এবারের পাঠ্যবই তৈরি করা হয়েছে।’

শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বিনষ্টের চেষ্টা চলছে। মৌলবাদী গোষ্ঠির একমাত্র লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নষ্ট করা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, অনেকের ফাঁসি হয়ে গেছে, কিন্তু তারা ঠেকাতে পারে নাই। হেরে গিয়ে তারা এখন সমাজ বদলে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে।’

শ্যামলী নাসরিন বলেন, ‘এখন তাদের টার্গেট শিশু কিশোরদের সাম্প্রদায়িক করে তোলা। সেই চক্রান্তের অংশ হিসেবে পাঠ্যবইয়ে হুমায়ুন আজাদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা, এমনকি লালনের ‘সময় গেলে সাধন হবে না’ বাদ দেয়া হয়েছে।’

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ‘সাম্প্রদায়িক চেতনার পাঠ্যপুস্তকের বিরুদ্ধে শিক্ষা আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। শক্তিশালী কমিটি গঠন করে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’ একমুখী শিক্ষা চালু করার দাবি তুলে তিনি বলেন, ‘তিনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা থাকলে জাতিও তিনমুখী হয়ে যাবে।’

সাংবাদিক কামাল লোহানী বলেন, হেফাজতের ১৩ দফা এবারের পাঠ্যবইয়ে বাস্তবায়ন হয়েছে। শিক্ষানীতিতে সবগুলো পরিবর্তন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উপেক্ষা করে তাদের সেই দাবিই আজকের পাঠ্য বইতে মুদ্রণ করা হয়েছে।

পাঁচ দফা দাবি

গোলটেবিল আলোচনায় পাঠ্যবই পরবর্তনের জন্য পাঁচটি দাবি তুলে ধরা হয়। প্রথমত, অবিলম্বে পাঠ্যবইয়ে নতুন সংযোজিত বা পরিবর্তিত পাঠ বাদ দিয়ে পূর্ববর্তী পাঠ প্রতিস্থাপন করা। দ্বিতীয়ত, পর্দার অন্তরালে পাঠ্যবই পরিবর্তনের যে চক্রান্তজাল বিস্তার করা হয়েছে তার স্বরূপ উন্মোচনে শিক্ষাবিদ, শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিশন গঠন। তৃতীয়ত, পাঠ্যপুস্তকে পূর্ববর্তী পাঠ সংযোজনে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ জারি এবং সংশোধিত পাঠ ডিজিটাল কনটেন্ট হিসেবে সকল প্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করা। চতুর্থত, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংস্কৃতিক চর্চার ব্যবস্থা নেয়া ও বার্ষিক সংস্কৃতি সপ্তাহ পালন বাধ্যতামূলক করা। পঞ্চমত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত করতে আগামী শিক্ষাবর্ষে আরও উন্নত বিকশিত করার লক্ষ্যে অলোচনা ও মতবিনিময় করা।

আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এসব দাবির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বক্তব্য চাওয়া হয় গোলটেবিল আলোচনায়। আবুল মকসুদ বলেন, ‘যদি সরকার বক্তব্য না দেয়, তাহলে ধরে নেবো আমাদের দাবি নয়, শাপলা চত্বরে হেফাজতের দাবিই শুনছে সরকার।’

Leave a Reply

%d bloggers like this: