উদ্বোধনের চার বছরেও বাস্তবায়ন হলো না কক্সবাজারের স্বপ্নের রেল লাইন প্রকল্প

অজিত কুমার দাশ হিমু, কক্সবাজার : উদ্বোধনের চার বছর অতিক্রম হয়েছে দোহাজারি থেকে কক্সবাজার হয়ে ঘুমধুম সীমান্ত পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণ কাজের। উদ্বোধন, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন সবRal-Line-pic-03-04-2015ই হয়েছে। কিন্তু কক্সবাজার জেলা বাসী আজো দেখা পেল না স্বপ্নের সেই রেল লাইনের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ রেল লাইনের শুভ উদ্বোধন করেন ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল। তিনি প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন তার সরকারের মেয়াদেই এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। আশায় বুক বাঁধে কক্সবাজারবাসী। গতকাল ৩ এপ্রিল এ প্রকল্পের চার বছর পূর্ণ হলোও এখনো সেই ভিত্তিপ্রস্তরেই আটকে গেল জেলাবাসীর স্বপ্নের প্রকল্পটি। কক্সবাজারের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের পার্শ্বে ঝিলংজা নারিকেল বাগানের সামনে সেই ভিত্তি প্রস্তরের ফলকটি শোভা পাচ্ছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আমলাতান্ত্রিক জঠিলতায় থমকে গেছে এ প্রকল্পের কাজ। তবে সর্বশেষ গত ২৮ জানুয়ারী এ বিষয়ে একটি চিঠিও দিয়েছেন রেল মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন ও পরিকল্পনা অনুবিভাগের সিনিয়র সহকারী প্রধান মোঃ আতাউর রহমান খান। চিঠিতে তিনি রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন। সূত্র জানায়, ২০০১ সালে কানাডা ও ফ্রান্সের ২টি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ ১ বছর ধরে এশিয়ার ৬টি দেশের উপর দিয়ে সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপন নিয়ে ব্যাপকভাবে যাচাই করে একটি অত্যন্ত লাভজনক বলে প্রথম রিপোর্ট দাখিলের পর বাস্তবায়নে পৃথক ২টি প্রস্তাবনা জমা পড়ে। পরে সরকারের পরিবর্তন হয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় ঐক্যজোট সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসলে এ প্রকল্পটি স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে আওয়ামীলীগ সরকার আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষতায় আসলে দোহাজারি হতে রামু উপজেলা হয়ে উখিয়া দিয়ে ঘুমধুম মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটার রেল লাইন প্রকল্পে কক্সবাজারকে অন্তর্ভূক্ত করে। দেশ-বিদেশ হতে আসা পর্যটকদের যাতায়ত সুবিধার্থে রামু হতে কক্সবাজার শহরের কলাতলী পর্যন্ত গৃহিত রেল লাইন প্রকল্পে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দোহাজারী থেকে রামু, কক্সবাজার ও ঘুমধুম পর্যন্ত মিটার-গেজ রেলপথ নির্মাণের একটি প্রকল্প গ্রহণ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে; যাতে দোহাজারী থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটারের রেলপথ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। ১২৮ কিলোমিটারের মধ্যে দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত রেলপথের দূরত্ব হবে ৮৯ কিলোমিটার। রামু থেকে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত রেল লাইন সম্প্রসারণ করা হবে অতিরিক্ত আরও ১১ কিলোমিটার। আবার রামু থেকে দক্ষিণ দিকে মিয়ানমার সীমান্ত উখিয়ার ঘুমধুম পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণ করা হবে আরও ২৮ কিলোমিটার। এ ১২৮ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, কক্সবাজারের চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ঈদগাঁও, রামু, কক্সবাজার সদর ও উখিয়ায় নির্মাণ করা হবে নয়টি রেল স্টেশন। এ রেলপথে নির্মাণ করতে হবে ৪৭টি সেতু, ১৪৯টি বক্স কালভার্ট ও ৫২টি পাইপ কালভার্ট। প্রায় ২ হাজার একশ কোটি টাকার এ প্রকল্প ২০১০ সালের ৬ জুলাই একনেকে অনুমোদন পায়। ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল দোহাজারী-ঘুমধুম রেল লাইন নামের এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে শুরুতেই অর্থ সংকটে পড়েন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, প্রকল্পের জন্য ২০১১-১২ অর্থবছরে মাত্র ২২ লাখ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে মাত্র ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে; যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এ কারণে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সুত্র মতে, তুরস্ক থেকে শুরু করে পূর্ব এশিয়ার ৬টি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে গৃহিত ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এতে বাংলাদেশ হবে গেটওয়ে। এশিয়ান মালেশিয়া, সিঙ্গাপুর, লাউস, কম্বোড়িয়া, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার হয়ে প্রবেশ করে বাংলাদেশের টেকনাফের কাছে ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে। পরে ৬টি দেশের যশোর, রাজশাহীর দর্শনা হয়ে ভারত ও পাকিস্তান যাবে। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে এ প্রকল্পটি যথার্থ বাস্তবায়নে শুধু দেশে নয়; পূর্ব এশিয়ার ৬টি দেশেও ব্যাপকভাবে তোড়জোড় চললেও কার্যত কবে নাগাদ এ কাজ শেষ হয়ে মানুষের আশা আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাবে। দিন বদলের সনদ নিয়ে গঠিত আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের কাছে কক্সবাজারবাসীর প্রত্যাশাও এটি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মিয়ানমার, চীনসহ ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের করিডরে যুক্ত হবে বাংলাদেশ। ২৭টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের রেল নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। তখন পর্যটন খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পর্যটন শহর কক্সবাজারে দেশি-বিদেশি পর্যটক বাড়বে। এ ব্যাপারে কক্সবাজার সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নূর-ই আলম জানান, ‘প্রকল্পটি প্রথমে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভূক্ত ছিল। পরবর্তীতে আলাদা রেল মন্ত্রণালয় গঠন হওয়ায় প্রকল্পটি আমাদের হাতে নেই। তাই এ বিষয়ে আমাদের বলার কিছু নেই।’ এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, ‘বিষয়টি রেল কর্তৃপক্ষই দেখেন। এতে আমাদের সম্পৃক্ত বেশী একটা নেই।’ এরপরও অগ্রগতির বিষয়ে কাগজপত্র দেখে বলতে পারবেন বলে তিনি জানান। চট্টগ্রাম রেলওয়ে ব্যবস্থাপক মোজাম্মেল হক বলেন, এ প্রকল্পভুক্ত জমি অধিগ্রহণ বাবদ তিনশ ১২ কোটি টাকা মত পরিশোধ করা হয়েছে। অন্যান্য আনুসাঙ্গিক কাজ এগিয়ে চলছে। আগামী এক বছরে মধ্যেই প্রকল্পের কাজ শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: