আসুন : দোহাজারীর উন্নয়ন ও অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হই

কামরুল হুদা : অগ্রযাত্রায় বাধা আসবে, সে বাঁধা অতিক্রম করতে সকলকে kamrul Huda picএকযোগে কাজ করতে হবে। অধিকার দাও-অধিকার দাও বললে হবে না। কেউ অধিকার ছাড়তে চায় না, অধিকার আদায় করে নিতে হয়। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে আন্দোলন করেই অধিকার আদায় করে নিতে হবে। দোহাজারীবাসীর উন্নয়ন ও অধিকার আদায়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। নিজেদের অধিকার আদায় করে নিতে দোহাজারীবাসীকে সোচ্চার হতে হবে। সকল প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরে তা মোকাবেলা করেই এগিয়ে যেতে হবে। দোহাজারী আমার প্রিয় উপশহর। এখানেই প্রোথিত আছে আমার জন্মনাভী। আমার শৈশব, কৈশরের পুরো অধ্যায়ই এখানে রচিত। আমার বেড়ে ওঠা, প্রকৃতির প্রথম স্বাদ এখানেই। এখানেই আমি হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতে শিখি। তাই দোহাজারী উপশহরের নাম কোথাও দেখলে আমি ব্যাতিবস্ত হয়ে ওঠি। আহা! দোহাজারী, প্রিয় দোহাজারী আমার। আমি দোহাজারী ছেড়ে এসেছি তিন দশক আগে। এ তিন দশক ধরে ওখানকার আলো-বাতাসের সান্নিধ্যবঞ্চিত আমি। মনের জানালায় যদিও আমি দোহাজারীকে প্রতিনিয়ত দেখি। আর দেখে দেখে ক্লান্ত হই এ ভেবে, এই কি আমার প্রিয় দোহাজারী? এতো ক্লিষ্ট কেন এর অবয়ব, এতো রুগ্ন কেন সে? আমি ভাবতে পারি না। ভাবতে পারি না বলেই দোহাজারীকে নিয়ে নানা স্বপ্ন দেখে যাই এখনো। পাহাড়, নদী বেষ্টিত মনোলোভা আমার দোহাজারী আজ এতো হতশ্রী কেন? দোহাজারীতে কী নেই? প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে শুরু করে বনজ-সম্পদ, নদী, পাহাড় পরিবেষ্টিত এ উপশহরকে নিয়ে গর্ব করার মত অনেক কিছুই রয়েছে। এতো সম্পদশোভিত দোহাজারী নিয়ে আমরা কি আসলেই গর্ব করতে পারছি? পারছি না। এর কারণ, দোহাজারীর প্রতি প্রতিটি প্রশাসনিক সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ। দোহাজারীর উন্নয়ন না হবার বড় সমস্যা কোথায়? আমার কাছে মনে হয়েছে, সবচেয়ে বড় সমস্যা রাজনৈতিক। আমাদের উপশহরের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এমনভাবে বিভক্ত যে, তারা সবকিছুতেই রাজনীতি খোঁজেন। এই রাজনীতি খোঁজার ইঁদুরদৌঁড়ে দোহাজারী পিছিয়ে আছে। অন্য তা আমাদের দোহাজারীর চেহেরা আজ অন্যরকম হতো। দোহাজারীর প্রতিটি প্রশাসনিক কেন্দ্রেই রয়েছে রাজনৈতিক বিভক্তি। স্কুল-কলেজ, এলাকার উন্নয়ন ভাবনা, সামাজিক সংঘটন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এমন কি সামাজিক নিরাপত্তা ভাবনায়ও রাজনৈতিক বহুরৈখিকতার কারণে দোহাজারীর এই দূরাবস্থা। আমাদের এতো বড় উপশহরে একটি স্কুল কলেজ আজ অবধি জাতীয়করন হলো না, এর পেছনের কারণও রাজনৈতিক। কারণ, কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি সরকার আÍীকরন করে, তাহলে সেখানে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের উজির-নাজির হবার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এ পথ উম্মুক্ত রাখতেই বর্তমান বা অতীতেও ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করনের উদ্যোগ নেয়নি। দোহাজারীবাসীর জন্য এ বড় দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। দোহাজারীর মত এত সুন্দর উপশহর বাংলাদেশে আর একটিও নেই। তবুও দোহাজারীতে পৌরসভা, থানা,Dohazari School উপজেলা ও জেলা হলো না কেন? এর পেছনের কারণও রাজনৈতিক। রাজনৈতিক ভোট ব্যাংকের হিসাব-নিকাশ কষতে গিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এ পথ মাড়াতে চায়নি কখনও। এর ফলে এ দোহাজারী উপশহরে নেমে এসেছে উন্নয়ন বিপর্যয়। এতো বড় উপশহরের আইনশৃংখলা রক্ষা করে সীমিত উন্নয়ন বরাদ্দ যথাযথ বণ্টন করে এর অগ্রগতি নিশ্চিত করা প্রায় অস¤ভব ব্যাপার। তাই যতো দ্রুত সম্ভব দোহাজারীকে উপজেলায় রূপান্তর করে প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় এনে এর উন্নয়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আদৌ কী তা সম্ভব হবে? আমাদের দোহাজারী উপশহরের নেতৃবৃন্দ কি এ ধরনের একটি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবী নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামে এগিয়ে আসবেন? তারা কি একবারও ভাববেন, দোহাজারী উপশহরের উন্নয়নের জন্য এগিয়ে আসবেন। দোহাজারীর প্রায় সব দলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অবস্থান রয়েছে। তাই তারা প্রশাসনিক বিকেন্দ্রিকরণের পদক্ষেপ হিসেবে দোহাজারীতে উপজেলা হোক তা কখনো মাথায় নেন না। আর এ না নেয়ার কারণেই দোহাজারী এতোটা পিছিয়ে। দোহাজারী উপশহরে একটি উপজেলা হলে সমস্যা কোথায়? এ উপজেলা আদৌ হবে কি? হবে না কেন? তা নিয়েও আছে নানা রাজনীতি। এ রাজনীতি ভাতৃঘাতি এবং অপরাজনীতি। আমাদের অদূরদর্শীতার কারণেই উপজেলা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া কেবলই বিলম্বিত হবে। এর ফলে এলাকার অগ্রগতি পিছিয়ে যাবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব এ ব্যাপারে একটি স্থির সিদ্ধান্তে এসে উপজেলা বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। দোহাজারী উপজেলা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র হলে দোহাজারীর চেহেরা আগামী এক দশকের মধ্যে আমূল পরিবর্তিত হবে-এতে কোন সন্দেহ নেই। এর ফলে এলাকার আইন শৃংখলা পরিস্থিতির যেভাবে উন্নতি হবে অনুরূপ এতদ্বাঞ্চলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও ঘটবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।Dohazari School photo
দোহাজারী উপশহরে শিল্প-ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়নের আভাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দোহাজারীতে খুব দ্রুতই একটা শিল্প বিপ্লব ঘটবে- এতে কোন সন্দেহ নেই। দোহাজারীতে একটা পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে। এতোগুলো পাহাড়-নদী থাকা সত্ত্বেও এখানে কেন যে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি তা ভাবতে গেলেই অবাক লাগে। এতো সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কী কারণে আমরা এ ধরনের একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারলাম না? পাহাড়ি প্রাকৃতিক ঝর্ণা থেকে এখানে কী নেই?
দোহাজারীতে আমরা এ ধরনের একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে পারি। এলাকায় তো বিত্তশালী লোকের অভাব নেই। প্রয়োজন কেবল উদ্যোগের। এ ব্যাপারে বিত্তশালীরা এগিয়ে আসতে পারেন। স্থানীয় কেউ এ উদ্যোগে এগিয়ে না এলে, আমরা পর্যটন অধিদপ্তরের দ্বারস্থ হতে পারি। আমার বিশ্বাস, আমাদের এখানে গড়ে ওঠা পর্যটন কেন্দ্র দ্রুতই লাভজনক শিল্পে পরিণত হবে।
দোহাজারীতে এখন কোন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই। অথচ এক সময় এখানে সারা বছর বিভিন্ন অনুষ্ঠান লেগেই থাকতো। নাটক, গান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখরিত থাকতো দোহাজারী। শীত মৌসুম এলেই বেড়ে যেতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের। এ ধরনের অনুষ্ঠান আজ এখানে তো কাল ওখানে। প্রায় প্রতিটি স্কুল কলেজে হতো বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক। আজ কোথাও তার ছিটেফোঁটা নেই। আমরা সকলেই এতো ভোগবাদী হয়ে উঠেছি যে, চিত্তের খবর আর কেউ নিতে চাই না।
এছাড়া দোহাজারীতে শীত মৌসুমে বিভিন্ন ইভেন্টে ফুটবল খেলা, ক্রিকেট খেলা, ব্যাডমিন্টন খেলার আয়োজন হতো। স্কুল কলেজে তো এ ধরনের আয়োজন ছিলই। এছাড়া বিভিন্ন ক্লাব পর্যায়ে খেলাধুলার উদ্যোগ চোখে পড়তো হার-হামেশা। মাইক বাজিয়ে এ ধরনের আয়োজনের খবর প্রচার করা হতো। পোষ্টারিং করা হতো। আজকাল কি এসব চোখে পড়ে আর? দোহাজারীর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এখন স্থবির। নেই কোথাও খেলাধুলা। আমাদের সময় প্রায় প্রতিটি স্কুল থেকে বার্ষিক ম্যাগাজিন বেরুতো। আমরা দেয়ালিকা বের করতাম। কবিতা-ছড়া লিখতাম। গান লিখতাম। নাটক করতাম। বিতর্ক করতাম। কবি-সাহিত্যিকদের জন্মবার্ষিকী, মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতাম। আজ এর কিছুই আর দোহাজারীতে নেই। দোহাজারী কেমন যেন শুকনো কাঠ হয়ে ওঠেছে। এখানে কোন প্রাণ নেই। চঞ্চলতা নেই। উদ্দাম নেই। সকলেই দিন দিন টাকার মেশিনে পরিণত হচ্ছি। দোহাজারীর মানুষ কি তাহলে বস্তুতান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে দ্রুত? এখানে কি এক সময় প্রাণের কোলাহল থেমে যাবে? মানুষ হিংস্র হয়ে যাবে? মানবিকগুণ হারিয়ে ফেলবে দোহাজারীর মানুষ? এখানে আর উৎসব হবে না? আনন্দ হবে না? কোথায় হারিয়ে গেলেন আমাদের দোহাজারীর প্রিয় মানবিক মানুষগুলো?
দোহাজারীতে স্থলবন্দর হবার সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। দোহাজারীর সাঙ্গু নদীর উপর এ স্থলবন্দর হতে পারে। দোহাজারী হতে চট্টগ্রাম শহরের সাথে আগে থেকেই ট্রেন যোগাযোগ রয়েছে। দোহাজরীতে স্থলবন্দর বাস্তবায়িত হলে এর মাধ্যমে এতদ্বাঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। দোহাজারীবাসী সোচ্ছার হলেই স্থলবন্দর দ্রুত বাস্তবায়ন হতে পারে। আমি আশা করবো, দোহাজারী উপশহরের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব, সংগঠক, সাংবাদিক ও সুশীলসমাজ আমার কথাগুলো একবার ভেবে দেখবেন এবং আমরা যেন আমাদের মাথা থেকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক বিভেদ, স্থানীয় বিভক্তি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে এলাকার উন্নয়নে একত্রিত হই। আমরা যেন মনে রাখি, আগামী পঞ্চাশ বছর পর আমরা কেউই আর এখানে থাকবো না। পঞ্চাশ বছর পর আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা যেন একটি সুন্দর দোহাজারী রেখে যেতে পারি। সেই লক্ষ্যে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করি।
বাংলাদেশের সমৃদ্ধ জনপদের অন্যতম দোহাজারী। আমরা চাই সবার মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সমঝোতার স্পৃহা। দোহাজারীবাসীর কল্যাণে ভেদাভেদ ভুলে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
আমাদের কৃষ্টি, কালচার, ঐতিহ্য হাজার বছরের। সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে শুধু বেচেঁ থাকার জন্যই দুনিয়াতে পাঠান নাই। আমাদের কর্মের মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। সৃজনশীলতাকে এলাকার উন্নয়নের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। সুসমাজ বির্নিমাণে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। যদিও এ এলাকার সম্ভাবনাময় তরুণ ও যুবসমাজকে নিয়ে আমাদের অনেক আশা, তারাই এগিয়ে আসবে দোহাজারী উপশহরের সঙ্কট নিরসনে। কেননা এ দোহাজারীর সার্বিক উন্নয়ন আগামী দিনের তরুণদের হাতেই। দোহাজারীর এই তরুণ সমাজকে সকলপ্রকার অবক্ষয়ের হাত থেকে মুক্ত রেখে দোহাজারীর সার্বিক উন্নয়ন, নতুন নতুন পরিকল্পনা, সততা, অভিজ্ঞতা ও দেশপ্রেম দিয়ে দোহাজারীর অধিকার আদায়ে এগিয়ে আসতে হবে। অতীতের সকল প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে দোহাজারীর উন্নয়নই আমাদের সকলের প্রত্যাশা। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ এই বাণীকে বুকে ধারণ করে আমরা সকলে দোহাজারীকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব।
আল্লাহ্তায়ালা প্রদত্ত অনেক প্রাকৃতিক সম্পদও আমাদের দোহাজারী উপশহরে রয়েছে, যা এ দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করার অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে। আর সবচেয়ে বড় যে সম্পদ এই দোহাজারীতে রয়েছে, তাহলো বিশাল জনগোষ্ঠী। এ জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করে দেশের অর্থনীতির চিত্রও পাল্টে দেয়া সম্ভব।
একটি অসাম্প্রদায়িক, ন্যায় ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার সংগ্রামে দল-মত নির্বিশেষে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসবে, এটিই আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ০১৮১৯-৮০১৯৮৫ kamrul.j85@gmail.com 

Leave a Reply

%d bloggers like this: