আর কত বড় দুর্ঘটনা ঘটলে টনক নড়বে ঢামেক হাসপাতালের

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৫ জানুয়ারী ২০১৭, বুধবার: আর কত বড় দুর্ঘটনা ঘটলে টনক নড়বে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল প্রশাসনের? অ্যাম্বুলেন্সের চাপায় হাসপাতাল চত্বরে মা ও গর্ভের শিশুসহ পাঁচজন নিহত হওয়ার দুঃসহ স্মৃতি এখনো টাটকা। অথচ এরই মধ্যে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলো আবার হাসপাতালের নানা জায়গা দখলে নিয়েছে। সক্রিয় হয়েছে পুরনো দালালচক্র।
২০১৬ সালের ১৫ অক্টোবর সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পুলিশ ক্যাম্পের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চাপায় মা ও তার গর্ভের শিশু এবং মা-ছেলেসহ পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রশাসন হাসপাতাল চত্বরে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। সেই ঘোষণা যে শুধু মুখের কথা ছিল, তা প্রমাণ করতে বেশি সময় নেয়নি দালালচক্র।
প্রশ্ন উঠেছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আসলে কতখানি আন্তরিক। কর্তৃপক্ষের সামনেই যে ফিরে এসেছে পুরনো নৈরাজ্য। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলো হাসপাতালের বিভিন্ন গেইটের ভেতরে পুরনো কায়দায় যে যার মতো জায়গা দখলে নিয়েছে। রোগীদের পক্ষে তাদের স্বজনরা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে গিয়ে হেনস্থা হচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালে এসে রোগীরা আর কত দিন বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের মালিক, চালক আর দালালচক্রের হাতে জিম্মি থাকবে, প্রশ্ন ভুক্তভোগীদের।
অ্যাম্বুলেন্স-চাপায় পাঁচজনের নিহতের ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স যত্রতত্র পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে মৌখিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে দুর্ঘটনা ঘটার অব্যবহিত পরে সাময়িকভাবে হাসপাতাল প্রশাসন অ্যাম্বুলেন্সগুলো হাসপাতাল ফটক থেকে সামান্য দূরত্বে সরিয়ে দিয়েছিল। ব্যাস ততটুকুই। এরপর আবার পুরনো চেহারায় ফিরে যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।
অ্যাম্বুলেন্স চাপা দিয়ে গর্ভের সন্তানসহ মা এবং আরও চারজনকে হত্যার ঘটনায় অসাধু চক্র দমে যাওয়ার বদলে উল্টো অঘোষিত ধর্মঘট পালন শুরু করে মালিক ও চালকরা; নেপথ্যে কাজ করে হাসপাতালের দালাল ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি সিন্ডিকেট।
সে সময় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশ করতে পারলেও হাসপাতাল থেকে রিলিজ পাওয়া রোগীদের ঢাকা মেডিকেল থেকে নেওয়ার জন্য কোনো অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রশাসনকে দুর্বল প্রমাণ করার জন্য অসাধু চক্র রোগীদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলে। সৃষ্টি করে কৃত্রিম অ্যাম্বুলেন্স সংকট। তাদের দাবি, হাসপাতালের যেখানে সেখানে অ্যাম্বুলেন্স রাখার কাজে কোনো বাধা দেয়া যাবে না!
প্রশাসন কিছুদিন চেষ্টা করে ক্ষান্ত দেয়। হাসপাতালে তীব্র সংকট দেখা দিলে অ্যাম্বুলেন্স স্বাভাবিকভাবে চলাচলে বাধা দেওয়ায় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত তানভীর হোসেন ও মো. আবীর নামের দুজন দালালকে ছয় মাসের কারাদণ্ডও দেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অসহায় প্রশাসন হাল ছেড়ে দেয়। পুরোদমে নিয়ন্ত্রণ নেয় সিন্ডিকেট।
অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনার হওয়ার দুইদিন পরেই ১৭ অক্টোবর রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু হয়। তখন পুলিশের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির সমঝোতা হয় যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চত্বরে কোনো অ্যাম্বুলেন্স পার্কিং করতে পারবে না। শুধু হাসপাতালে প্রবেশ করে রোগী বহন করে দ্রুত হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ত্যাগ করবে। তবে ঘটনার চার মাস পার হতে না হতেই সেসব শর্ত ভঙ্গ করছেন বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকরা।
জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট ৮০টির মতো বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণ করে। মালিক সমিতির সভাপতি ওসমান ও সাধারণ সম্পাদক দীনা এই অ্যাম্বুলেন্সগুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। হাশেম নামের এক লাইনম্যান প্রতিদিন অ্যাম্বুলেন্স প্রতি থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা চাঁদা তোলে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সগুলোর মালিকও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোনো না কোনো চাকরিতে নিয়োজিত।
এ ব্যাপারে বেসরকারী অ্যাম্বুলেন্স চালক এলাহী বক্স বলেন, গাড়ি পার্ক করার জন্য নির্দিষ্ট একটা জায়গা থাকলে ভালো হতো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির এক নেতা বলেন, বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স পার্কিং সংক্রান্ত একটি মৌখিক কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো স্থায়ী সুরাহা হয়নি।
মালিক সমিতির এই নেতা বলেন, ‘আমাদের অ্যাম্বুলেন্স রাখার কোনো জায়গা নেই। তবে হাসপাতালের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স রাখা, রোগীদের কাছ থেকে চড়া দামে গন্তব্যে পৌছানোর মতো কাজকে আমি অনৈতিক মনে করি। তবে হাসপাতালের পরিচালক স্যার আমাদের কথা চিন্তা করছেন। তিনি আমাদের গাড়ি পার্কিং একটি নির্দিষ্ট জায়গা করে দেবেন বলে আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন।’
জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. খাজা আবদুল গফুর বলেন, ‘আমরা সব সময়ে ওদের অ্যাম্বুলেন্স পার্কিং করতে নিষেধ করি। বিভিন্ন সময়ে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা তাদের তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তারা আবারও সেখানে পার্কিং করছে। তবে বিষয়টি আমি গুরুত্ব সহকারেই দেখছি।’
রবিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ এলাকায় দেখা যায় পুরনো সেই নৈরাজ্যের নানা চিত্র। দুপুর একটায় আবদুল কাদের নামের একজন এসেছেন তার একজন রোগীকে নিয়ে যাবেন গাজীপুর চৌরাস্তা ভাওয়াল কলেজের কাছে। অ্যাম্বুলেন্স চালক তার কাছে ভাড়া চাইলেন তিন হাজার টাকা। এর চেয়ে এক টাকাও কম হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন।
আরেক দৃশ্যে দেখা গেল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পুলিশ ক্যাম্পের পাশের খালি জায়গায় রাখা হয়েছে ছয়টি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স। টিকিট কাউন্টারের পাশের খালি জায়গায় রাখা হয়েছে পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স, বার্ন ইউনিটের সামনে রাখা হয়েছে বেশ কয়েকটি খালি অ্যাম্বুলেন্স। এছাড়াও বার্ন ইউনিটের পিছনেও রয়েছে কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স।
দুপুর ১২ টার সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ উপপরিদর্শক বাচ্চু মিয়া উর্দি পরিহিত অবস্থায় আনসারের এক সহকর্মীকে নিয়ে একটি লাঠি হাতে একজন অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এক যুবককে বললেন, সে যেন অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এখান থেকে দ্রুত চলে যায়। তিনি জানালেন, এখানে অ্যাম্বুলেন্স পার্কি করা নিষেধ।
যুবকের তাতে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। পুলিশকে সে পাল্টা জবাব দিল- ‘আপনি অ্যাম্বুলেন্সের দালালদের কিছু বলতে পারেন না। শুধু আমাদের বলেন কেন? কাজ হবে না দেখে পুলিশ কর্মকর্তা বাচ্চু মিয়া সেখান থেকে চলে আসেন।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনেই কথা হয় উপপরিদর্শক বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে। তিনি ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা এভাবেই বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকদের তাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু তারপরেও তারা এখানে সেখানে গাড়ি রাখে। কী করব বলেন! যতক্ষন পারি ততক্ষন ওদের তাড়াই, পরে আবারও রাখে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*