আধুনিক সংবাদপত্র শিল্পের সংগ্রামী নায়ক আবদুল্লাহ আল সগীর স্মরণে

এডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান, ২৮ মার্চ ২০১৯ ইংরেজী, বৃহস্পতিবার: ২৯ মার্চ। ১৯৯১ সানের এদিনে চট্টগ্রামের সংবাদপত্র শিল্পের অন্যতম দিকপাল দৈনিক নয়াবাংলার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আবদুল্লাহ আল সগীর চট্টলবাসীকে শোক সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ধর্মপ্রাণ, সদালাপী, বন্ধুবৎসল, নিঃস্বার্থ সমাজসেবক, রাজনীতিবিদ ও পরোপকারী ব্যক্তিত্ব হিসাবে এতদঅঞ্চলে তাঁর প্রচুর সুখ্যাতি রয়েছে। বিশেষ করে তাঁর সম্পাদিত পত্রিকায় হাতে কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি অসংখ্য সংবাদ কর্মী সৃষ্টি করেন। যারা আজ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে অবদান রেখে যাচ্ছেন ।
সদ্য স্বাধীন দেশে ১৯৭৮ সালের ২ আগষ্ট থেকে মরহুম আবদুল্লাহ আল সগীরের উদ্যোগে ও সম্পাদনায় দৈনিক নয়াবাংলা প্রকাশিত হয়। তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এ দৈনিকটি চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের মন ও মানসের পত্রিকায় পরিণত হয়। তাঁর মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত এ দৈনিকটি চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের মন ও মানসের পত্রিকায় পরিণত হয়। অঢেল অর্থের মালিক না হয়েও তিনি আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করে কঠোর পরিশ্রম, সৃজনশীল মেধার মাধ্যমে একটি আধুনিক অফসেট মুদ্রণ শিল্পশৈলী সমৃদ্ধ দৈনিকের জন্ম দিয়ে চট্টগ্রামের সংবাদপত্র জগতকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। তাঁর এ মহত্ত্ব¡ ও ঋণ শোধ করার মতো নয়। তাই চট্টগ্রামবাসী তাকে যুগে যুগে স্মরণ করবে হৃদয়ের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও গভীর অনুভূতি দিয়ে। তিনি ছিলেন নিরলস সমাজকর্মী ও দুঃখী মানুষের সংগ্রামী বন্ধু। ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সৈনিক মরহুম আবদুল্লাহ আল সগীরের মধ্যে একাধিক গুণের অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি একাধারে রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক, সাংবাদিক ও মুসলিম উম্মার বৃহত্তর ঐক্যের স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। পবিত্র কলেমার পতাকাতলে ইসলামের সকল পথ ও মতকে এক ধারায় আনতে তিনি তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়েছে। তাঁর ৬২ বছরের হায়াতে জিন্দেগীর শুরু হয় রাজনীতি দিয়ে, শেষ হয় সাংবাদিকতা দিয়ে। তিনি শূণ্য হাতে নিজ অধ্যবসায় গুণে শ্রম ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অতি অল্প সময়ে সাংবাদিক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ দৈনিক নয়াবাংলা পত্রিকার সম্পাদনা, প্রকাশনা এবং ব্যবসায়িক গুরু-দায়িত্ব সফলতার সাথে নির্বাহ করেন। তিনি ব্যতিক্রমধর্মী সাংবাদিক কুশলতার পরিচয় দেন তার পত্রিকায়। যখন চট্টগ্রামের অন্য কোন কাগজ পত্রিকার সৌষ্টব নিয়ে তেমন ভাবেনি তখন আবদুল্লাহ আল সগীর শিল্পী নিয়োগ করে গল্প কবিতার সংস্করণ চালু করেছিলেন। পত্রিকায় যে একজন শিল্পীর ভূমিকা জরুরী তিনি সেটা বুঝেছিলেন। চট্টগ্রামে সাংবাদিকতাকে পেশাদারী মর্যাদা প্রদানে যে ক’জন পত্রিকা মালিক বিশেষ অবদান রেখে গেছেন তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ আল সগীর অন্যতম। এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ কষ্টের কথা তুলে ধরার ব্যাপারে তাঁর মন ছিল সজাগ।
আবদুল্লাহ আল সগীর দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী থানার অন্তর্গত ¯্রােতস্বিনী হালদা নদীর তীরে গড়দুয়ারা গ্রামে ১৯৩০ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সুফি আবদুল গণি এবং মাতা ফজিলাতুন্নেসা খানম। ছোট বেলা থেকেই আবদুল্লাহ আল সগীর খুব ভদ্র, বিনয়ী, মুরুব্বীদের সামনে লাজুক, শ্রদ্ধাশীল, সমাজ হিতৈষী ছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ও মেধা ছিল প্রখর। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে তিনি ১৯৪৬ খৃষ্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলা মুসলিম লীগ এর একজন সংগঠক নেতৃত্বে গ্রামে-গঞ্জে মুসলিম লীগের সংগঠন গড়ে তুলেন। ১৯৬২ সালে তিনি চট্টগ্রািম জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলে জেলা প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর প্রচেষ্টায় উত্তর চট্টগ্রামে বহু রাস্তা-ঘাট, সেতু,স্কুল, মাদরাসা তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। গড়দুয়ারা মাদরাসা, জ্ঞানতাপস ড. শহীদুল্লাহ একাডেমী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি তাঁর বিদ্যুৎসাহী মনোভাব ও শিক্ষানুরাগিতার পরিচয় দেন। চট্টগ্রামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিক রাখেন। ১৯৬২ সালের ৯ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক লালদীঘির ময়দানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায় প্রতিষ্ঠার দাবীতে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায় বাদশা মিয়া চৌধুরী, এডভোকেট ইউ. এন. সিদ্দিকী, অধ্যাপক আহামদ হোসেন, ড. এম এ মন্নান, অধ্যাপক এ. বি. এম সুলতানুল আলম চৌধুরী, রফিকুল্লাহ চৌধুরী প্রমুখের সাথে মরহুম আবদুল্লাহ আল সগীরও তেজোদীপ্ত ভাষণ দেন এবং জনগণকে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেন। সেদিনের বিশাল জনসভায় তিনি দল মত নির্বিশেষে সকলকে চট্টগ্রামের বৃহত্তর স্বার্থে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অবদান রাখতে আহবান জানান। দুঃস্থ মানবতার সেবক আবদুল্লাহ আল সগীর ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামে জলোচ্ছ্বাস পরবর্তী সময়ে জনমানুষের কল্যাণে ব্যাপক অবদান রাখেন। ১৯৬৩ সালে প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিঝড়ে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর নেতৃত্বে এলাকায় তৎকালীন ত্রাণ কমিটি গঠিত হয়। ওই কমিটি ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা চালায়। ১৯৮৬-১৯৮৭ সালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে বর্তমানে জামালখান সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল প্রেসক্লাব ভবনের জায়গার ব্যাপারে (তৎকালীন প্রেসক্লাবের অন্যান্য কর্মকর্তাসহ) চন্দ্রঘোনা ব্যাপিস্ট মিশনের কর্মকর্তাদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের মাধ্যমে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। তৎকালে তাঁর নির্দেশে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করেন।
মরহুম আবদুল্লাহ আল সগীর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুব চরিত্র গঠনে নিজ গ্রামে অবদান রাখায় ১৯৬৫ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান সরকার তাঁকে চট্টগ্রাম পৌর সভার সদস্য মনোনীত করেন। তিনি ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কাউন্সিল পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
পারিবারিক জীবনে পাঁচ ছেলে তিন কন্যার জনক আবদুল্লাহ-আল-ছগীর ১৯৮৬ সালে পবিত্র হজ্ব পালন করেন। জীবনে ধনী হওয়া তার বাসনা ছিল না, কিন্তু মানসিক ঐশ্বর্যে তিনি প্রচুর ধনী ছিলেন। একটি সুন্দর সদালাপী ¯েœহ বৎসল মানুষের মুখ আবদুল্লাহ আল সগীর।
এতিম, আলেম-ওলামা পীর মাশায়েখ বুজর্গদের তিনি বেশী ভালবাসতেন। মেহমানদারীতে তিনি প্রচুর আনন্দ পেতেন। তাঁর বাসা থেকে তাঁর উপস্থিতিতে বা জানামতে খালি মুখে ফিরে আসতে পেরেছেন এ রকম লোকের সংখ্যা খুবই কম। এতিমদের জন্য মরহুম আবদুল্লাহ আল সগীরের মনটা সবসময়ই ছিল ব্যাকুল। তিনি বিভিন্ন এতিমখানায় বিশেষ করে তাঁর পাথরঘাটা বাসায় যাওয়ার পথে তনজিমুল মুসলেমিন এতিমখানায় নিয়মিত ছুটে যেতেন। তাদের খবরা খবর নিতেন। অনেক সময় নিজ থেকেই তাঁর পত্রিকায় এতিমদের জন্য বিনামূল্যে শীত বস্ত্র আহবান করে বিজ্ঞাপন দিতেন। এজন্য মরহুম আবদুল্লাহ আল সগীরের জানাযায় অগণিত মানুষের কাতারে শামিল হতে দেখেছি বহু এতিম শিশু কিশোরকে। হয়তো পিতৃহারা এ শিশুগুলোকে পিতার মত ভালবাসেছিল এ দরদী মানুষটিকে।
চট্টগ্রামে একটি জাতীয় মানের ঈদগাহ ও কবরস্থান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে ব্যাপক অবদান রাখেন। চট্টগ্রাম হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিস্ঠার আন্দোলনে মরহুম আবদুল্লাহ আল সগীর এর অবদান চট্টগ্রামবাসী কখনো ভুলবেন না। আইনজীবিরা চট্টগ্রামে হাইকোর্ট স্থাপনের আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি চট্টগ্রাম সফরের প্রক্কালে দৈনিক নয়াবাংলার প্রথম পৃষ্ঠায় মরহুম আবদুল্লাহ আল সগীর চট্টগ্রামে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপনের দাবী জানিয়ে জোরালো ভাষায় বিশেষ সম্পাদকীয় লিখেন যা রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। রাষ্ট্রপতি সফর শেষে রাজধানীতে ফেরত যাওয়ার পূর্বেই ঘোষণা দিতে বাধ্য হলেন চট্টগ্রামে হাইকোর্ট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা করা হবে। চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন হাইকোর্টের সুফল ভোগ করলেও দুঃখের বিষয় আজ চট্টগ্রামে হাইকোর্টের কোন বেঞ্চ নেই। চট্টগ্রামের বিচারপ্রার্থী মানুষের প্রাণের দাবী দেশের ২য় বৃহত্তম নগরীতে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন করা, অথচ কে রাখবেন আজ মরহুম আবদুল্লাহ আল সগীর এর মত দুঃসাহসী ভূমিকা? তাঁর সাহসী বক্তব্য বিরাজমান পরিবেশে পরিবর্তন আনতে সাহায্য করেছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
মরহুম আবদুল্লাহ আল সগীর পত্রিকার মাধ্যমে মানুষের সেবার পথকে বেছে নেন। তিনি ছিলেন সংবাদপত্রের প্রতি সত্যিকারের একজন দরদী ও মহান সেবক। দেশ ও দেশের মানুষকে ভালবাসতেন বলেই অন্যকোন লাভজনক পেশায় নিজেকে নিয়োজিত না করে গণমানুষের দুঃখ-দুদর্শর খবর তুলে ধরার মানসে আবদুল্লাহ আল সগীরের সুদীর্ঘ ৬১ বছরের বর্ণিল কর্মময় জীবনে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাষ্ট্রীয় গুরুদায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন সাংবাদিকতার মতো মহান পেশায়। ১৯৭৮ সালের ২ আগষ্ট প্রথম প্রকাশিত হয় দৈনিক নয়াবাংলা। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আবদুল্লাহ-আল-ছগীর চট্টগ্রামের পিছিয়ে পরা মানুষের আনন্দ-বেদনার চিত্র তুলে ধরেছেন তাঁর পত্রিকায়, লেখনিতে। দৈনিক নয়াবাংলায় সাংবাদিকতার হাতেখড়ি-এমন বহু সাংবাদিক আজ প্রথিতযশা প্রবীণ তুখোড় পেশাদার সাংবাদিক। দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকে কর্মব্যস্ত। বলাচলে আবদুল্লাহ-আল-ছগীর ছিলেন সংবাদপত্র শিল্পের কারিগর। আর ১০১, মোমিন রোডের দৈনিক নয়াবাংলা কার্যালয় সাংবাদিক তৈরির কারখানা। সংবাদপত্র শিল্প বিকাশেও তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁর উৎসাহে আমি নিজেও নিয়মিত নয়া বাংলায় নিজ নামে বা ছন্দনামে লিখা লিখি করতাম ।
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সভাপতি ছাড়াও একাধারে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদের সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)’র পরিচালক, বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম সংবাদপত্র পরিষদের প্রথম আহবায়ক, সরকার ঘোষিত প্রেস কমিশনের সদস্য, জাতীয় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কমিটির সদস্য, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আজীবন সদস্য, হাটহাজারী ড. শীহদুল্লাহ একাডেমী এবং গড়দুয়ারা দারুল উলুম মহিউল ইসলাম মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রতিষ্ঠাতা। এছাড়া সংবাদপত্র শিল্পের এই পথিকৃৎ নানা সামাজিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন সরকার আঞ্চলিক পত্রিকার মধ্যে দৈনিক নয়াবাংলাকে ‘মেজর ডেইলী’ হিসেবে ঘোষণা করে।
স্বীকৃতিও পেয়েছেন আবদুল্লাহ-আল-ছগীর। ২০০৫ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। আর ২০১৬ সালের ২৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব তাঁকে দেয় কৃতী সাংবাদিক (মরণোত্তর) সংবর্ধনা।
ছোটবেলা থেকে আবদুল্লাহ-আল-ছগীর তেজর্ষীয়ভাবে ভীষণ মেধাবী ছিলেন। প্রখর মেধাশক্তির কারণে শিক্ষায় আলোর স্ফুরণ ছড়িয়েছেন। ১৯৩৫ সালে রাউজান বিনাজুরী প্রথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে মেধাবৃত্তি লাভ করেন। গহিরা এ জে ওয়াই এম.এস হাই স্কুল থেকে অষ্টম শ্রেণিতে মেধাবৃত্তি লাভ করেন। একই স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে ১৯৪৬ ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে আই.এ পাশ করেন। ছাত্রজীবনের প্রতিটি ধাপে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন ও গুণি ব্যক্তি।
এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ কষ্টের কথা তুলে ধরার ব্যাপারে তিনি সর্বদা সজাগ থাকতেন। তিনি তার পত্রিকার মাধ্যমে যে বলিষ্ট ভূমিকাগুলো রেখেছিলেন তার আরো একটি কাজ বেশী মনে পড়ছে বিশেষ করে চট্টগ্রামের ৩৫০ বছরের ঐতিহ্রবাহী চট্টগ্রাম শাহী জামে মসজিদের বেহাত হয়ে যাওয়া বিপুল পরিমাণ সম্পদ পুনরুদ্ধার করে মসজিদের আধুনিক রূপদান করতে তাঁর ভূমিকার কথা চট্টগ্রামবাসী সবসময় স্মরণ করবে। শাহী জামে মসজিদের শাহী মর্যাদাকে পুনরুদ্ধার করতে চট্টগ্রামের তদানিন্তন জেলা প্রশাসক জনাব ওমর ফারুকের মহান উদ্যোগ ও কর্মসূচিকে জোরালো সমর্থন দেন নয়াবাংলা পত্রিকার মাধ্যমে আবদুল্লাহ-আল-ছগীর। তিনি সে সময় জামে মসজিদের ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পত্তির বিবরণ বলিষ্ঠভাবে প্রশাসন ও দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। চট্টগ্রামের সার্বিক উন্নয়নের জন্য তিনি তাঁর পত্রিকার মাধ্যমে যে অবদান রেখে গেছেন চট্টগ্রামবাসী তা শ্রদ্ধাভরে আজো স্মরণ করে।
আবদুল্লাহ-আল-ছগীর আর জাগবে না। সূতীর পাঞ্জাবী পায়জামা পরিহিত সুন্দর মানুষটি চট্টগ্রামের আনাছে-কানাছে এখন আর পায়চারী করেন না। তিনি কর্ণফুলীর আদুরে কন্য হালদা নদীর তীরে বাল্য স্মৃতিতে ভরপুর সবুজ শ্যামলী গড়দুয়ারা গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে ঘুমিয়ে আছেন। তাঁর মৃত্যুর দিন ছিল সুন্দর একটি দিন। তিনি পবিত্র রমজানমাসের জুমাবার ভোর রাত ২ টা ৪৫ মিনিটে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। ২৯ মার্চ ৯১ জুমাবার বাদ জুমা ঐতিহাসিক লালদীঘির ময়দানে তাঁর বিশাল জানাযা ও নিজগ্রামে ২য় জানাযা শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আবদুল্লাহ-আল-ছগীরের মৃত্যুতে জাতীয় সংসদে সর্বসম্মত শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। শোক প্রস্তাব গ্রহণের আগে তাঁর কর্মময় জীবন নিয়ে আলোচনা, দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন ও মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। দেশের গণমাধ্যম প্রকাশ করে বিশেষ প্রবন্ধ-নিবন্ধ। জাতীয় নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাতেও তাঁর ছবি না দেখে অনেকে অবাক হন। কর্মবীর ও আত্মপ্রচার বিমুখ মহান ব্যক্তিত্বটি মৃত্যুর ক’দিন আগে নিজেই নিষেধ করে গেছেন তাঁর ছবি না ছাপাতে।
জীবিতকালে এসব মহান কর্মবীররা সম্মান পায় না কিন্তু মত্যির পরও যদি তাদের অবদানের কদর না হয় তাহলে গুণী জন্মানোর সম্ভাবনা থাকে না। আজ প্রচারমুখী মানুষের কদর সবচেয়ে বেশী। কিন্তু যাদের জন্য তিনিসবচেয়ে বেশী অবদান রেখেছেন তারও তার অবদানকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন না। এ ধরনের বিস্মৃতির কারণে আজ আমরা চরম আদর্শহীন পরিবেশের দিকে ধাবিত হচ্ছি দ্রুত। যা থেকে আমরা কেউই রেহাই পাবো বলে মনে হয় না।
মরহুম আবদুল্লাহ-আল-ছগীর যে বিশ্বাস, প্রত্যয়, মূল্যবোধ ধারণ করেছিলেন এবং সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে যে সংগ্রামী অবদান রেখে গেছেন তা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে যুগ যুগ ধরে এদেশবাসীকে অনুপ্রাণিত করবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেন তাঁর ভাল কাজগুলোর বিনিময়ে তাঁকে জান্নাত নসীব করেন। তাঁর মৃত্যু বার্ষিকীতে এটাই লেখকের কামনা। লেখকঃ আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসন কর্মী।

Leave a Reply

%d bloggers like this: