আদর্শ কমিটি হবে ছাত্রলীগ

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ০৮ জুন ২০১৯, শনিবার: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ এই ছাত্র সংগঠনের চলমান কমিটিতে বিবাহিত, মাদক ব্যবসায়ী, বিএনপি-জামায়াত পরিবারের সদস্য, শিবিরকর্মী থেকে শুরু করে নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িতরা কোনো না কোনোভাবে ঠাঁই পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠে। তাদের বাদ দিয়ে যোগ্যদের পদায়ন করার জন্য টানা ১৩ দিন ধরে আন্দোলনও করে যাচ্ছেন পদবঞ্চিতরা। এদিকে, রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীর নেতৃত্বাধীন কমিটিতে ১৯ জন বিতর্কিতদের নামহীন তালিকা দিয়ে পদশূন্য করার পরও সেই তালিকায় আরো কয়েকজন যোগ হয়েছেন। এমনকি সংখ্যাটি এই মুহূর্তে ৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ইতিমধ্যেই ১৯ জনের পদ শূন্য করেছেন। কিন্তু আমরা আরো ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সুস্পষ্টভাবে তদন্ত সাপেক্ষে প্রমাণ পেয়েছি যে, তারা বিতর্কিত। প্রথমধাপের এই ১৯ জনের সঙ্গে আরো ১৬ জনের পদও একই দিন শূন্য করা হবে।
কবে নাগাদ এই পদগুলো চূড়ান্তভাবে শূন্য ঘোষণা করে সেখানে যোগ্যদের পদায়ন করা হবে এমন প্রশ্নের জবাবে জাহাঙ্গীর কবির নানক আরো বলেন, আমাদের নেত্রী (শেখ হাসিনা) দেশে ফেরার পরদিনই তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা হবে। এরপর নেত্রীর অনুমোদন নিয়ে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যেই বিতর্কিতদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হবে।
আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ৩৫ জনের পদ শূন্য করা হবে। এই ৩৫ জনের নাম প্রকাশের মাধ্যমেই কাজ শেষ হয়ে যাচ্ছে না আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের। কমিটিতে আরো যারা বিতর্কিত রয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসা মাত্রই সেগুলো যাচাই বাছাই করে প্রমাণ মিললে পদটি শূন্য ঘোষণা করা হবে। এক্ষেত্রে এই শুদ্ধি অভিযান চলমান একটি পক্রিয়া হিসাবে উল্লেখ করে জাহাঙ্গীর কবির নানক আরো বলেন, আমাদের নেত্রী (শেখ হাসিনা) যে দায়িত্ব দিয়েছেন তা হচ্ছে কলংকমুক্ত একটি ছাত্রলীগ উপহার দেয়া। যেকোনো মূল্যে নেত্রীকে আমরা কলংকমুক্ত পরিচ্ছন্ন ক্লিন ইমেজের একটি ছাত্রলীগ উপহার দিতে চাই।
এদিকে, পদবঞ্চিতদের কোনো খোঁজ নিচ্ছেন না আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এমন অভিযোগের জবাবে জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, আমরা তাদের বলেছি নেত্রী আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। তাদের জন্য ঈদের সালামি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। অনেকে সেটি গ্রহণও করেছে। তখন তারা বলেছিল যে, ঈদ করতে বাড়ি যাবেন। কিন্তু পদবঞ্চিতরা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুরোধ বা নির্দেশ কোনটাই মানেননি। ছাত্রলীগের সভাপতি শোভন ও সাধারণ সম্পাদক রাব্বানী কয়েকবার ঈদের আগে তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। এমনকি আমি নিজেও তাদের সঙ্গে টেলিফোনে দীর্ঘআলাপ করেছি। কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথাই শুনেননি।
সম্মেলনের এক বছর পর গত ১৩ মে ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হলে তা পুনর্গঠনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিত পদ না পাওয়ারা। তাদের অভিযোগ গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বয়সসীমা অতিক্রম করা, বিবাহিত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী, চাকরিজীবী ও বিভিন্ন মামলার আসামিসহ নানা অভিযোগবিদ্ধ অনেককে পদ দেয়া হয়েছে। বঞ্চিত করা হয়েছে অনেক ত্যাগী নেতাকে।
ছাত্রলীগের গত কমিটির মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপ-সম্পাদক আল মামুন যিনি পদবঞ্চিত হওয়ায় আন্দোলন করছেন তিনি বলেন, নেত্রীর নির্দেশ অমান্য করে কমিটি পুনর্গঠন ছাড়াই বিতর্কিতদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বেঈমানি করেছে বর্তমান সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। বিতর্কিতদের নাম প্রকাশের মাধ্যমে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে যোগ্য ও পদবঞ্চিতদের পদায়ন না করা পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। ঈদের দিন দলের দায়িত্বশীল কেউ এসে আমাদের খোঁজ নেয়নি।
আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র গত কমিটির কর্মসূচি ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক রাকিব হোসেন বলেন, আমরা জোর দাবি জানিয়েছিলাম ঈদের আগেই যেন বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। আমাদেরও ইচ্ছা ছিল পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার। কিন্তু তারা (কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ) আন্তরিক ছিল না। বিতর্কিতদের ঈদ করার সুযোগ দিয়ে আমাদের পরিবারের বাইরে করালো। আমরা আমাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাবো। এমনকি যে ১৯ জনের পদ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র না মেনেই শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের নাম কেন প্রকাশ করা হচ্ছে না। এর পেছনে কি উদ্দেশ্য রয়েছে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রাকিব হোসেন। তিনি বলেন, আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল ছাত্রলীগের সর্বোচ্চ অভিভাবক শেখ হাসিনা। উনি যে সিদ্ধান্ত দিবেন তা আমরা মাথা পেতে মেনে নিবো। কিন্তু ছাত্রলীগে মাদকাসক্ত, বিবাবিহ, জামায়াত-বিএনপি পরিবারের সদস্যরা যখন কমিটিতে ঠাঁই পায়; তখন আমাদের লজ্জা লাগে। আমরা শুধু বিতর্কিতের বিরুদ্ধে কথা বলছি, তাদের অবশ্যই এই কমিটি থেকে বাদ দিয়ে যোগ্য, যাদের পরিবারিক আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত তাদের ঠাঁই দিতেই হবে। আমরা বিশ্বাস করি, শেখ হাসিনা (আপার) ছাত্রলীগে স্বাধীনতা বিরোধী, বিএনপি-জামায়াত পরিবারের কেউ ঠাঁই পাবে না। এ বিষয়ে আমরা নেত্রীর সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছি।
এদিকে, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, পদবঞ্চিত ছাত্রলীগ নেতাদের পাশে আমরাও আছি। ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের সব সময় খোঁজ খবর নিচ্ছি। গণতান্ত্রিক উপায়ে তাদের অবশ্যই আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু কয়েকবার গিয়েও আমরা তাদের বুঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। ১৯ জনের পদ শূন্য করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী দেশে ফেরার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় ৪ নেতার সঙ্গে আলোচনা করেই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে বলেও আমরা পদবঞ্চিতদের ঈদের আগেই জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমার কথা না শুনে কোনো বিশেষ সিন্ডিকেটের কথায় এই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। রাব্বানী আরো বলেন, শেখ হাসিনার ছাত্রলীগকে বারবার বিতর্কিত করতে একটি মহল সব সময়ই তৎপর রয়েছে। কিন্তু তাদের শক্তভাবে মোকাবিলা করার ক্ষমতা রয়েছে বর্তমান ছাত্রলীগের এমন প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিয়েছেন ছাত্রলীগের মানবিক ছাত্রনেতা হিসাবে পরিচিতি পাওয়া গোলাম রাব্বানী। আন্দোলনকারীদের উচিত ছিল আমাদের সবার নেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করা এবং এই আন্দোলন স্থগিত করে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পরিবার পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করা। কিন্তু তারা সেটি কেন, কার বুদ্ধিতে করেনি; তা সময়মতো প্রকাশ হবে। এই আন্দোলনের পিছন থেকে যদি কেউ কলকাঠি নাড়তে থাকেন, তাহলে তার বিষয়েও আপার (শেখ হাসিনা) কাছে তা জানানো হবে বলেও জানান ছাত্রলীগের মেধাবী এই সাধারণ সম্পাদক। এদিকে, ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে এ বিষয়ে জানার জন্য কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও তিনি তার প্রতিউত্তর করেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*