আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা দিবস

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১ জুলাই: আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা দিবস। ১৯১২ সালে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের নিকট নাথান কমিটির প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতেই ১৯২১ সালে ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। অত্যন্ত গৌরবের বিষয় এ বিশ্ববিদ্যালয় আজ ৯৪ বছর জ্ঞান বিতরণ করে ৯৫ বছরে পদার্পণ করল। ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার শতবর্ষে পদার্পণ করবে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই জ্ঞান ও বিদ্যাচর্চার খ্যাতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ উপমহাদেশের একটি শ্রেষ্ঠ উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। শিক্ষাদান, বিদ্যাচর্চা এবং ছাত্র-শিক্ষকদের জ্ঞান-গবেষণা আর পা-িত্যের খ্যাতি শুধু এ উপমহাদেশে ছিল না, এর গ-ি পেরিয়ে ইউরোপ-আমেরিকাসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা শিক্ষা জগৎকে আলোকিত করেছিল।du
পরবর্তী সময়ে অক্সফোর্ডের আদলে এর পঠন-পাঠন ও শিক্ষাদান কার্যক্রম পদ্ধতি পরিচালিত হয়েছিল বলেই এটাকে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড। তবে উল্লেখ করার বিষয়, এ উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীনতম এবং খ্যাতিমান নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনসেপ্টে রাজধানী ঢাকায় আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটাকে গড়ে তোলা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীরা আবাসিক হলে থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে, পাঠদান নেবে এবং জ্ঞানার্জনের নানা প্রয়োজনে লাইব্রেরিসহ শিক্ষকের সাহচর্য লাভ করবে। প্রাচীন ভারতবর্ষের বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞানার্জনের ধরনও ছিল সেরকম। তাইতো বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞানদানে নালন্দার এত গৌরব ও এত খ্যাতি। শুধু ভারতবর্ষ নয়, প্রাচ্যের চীন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আসতেন নানা শাস্ত্রে জ্ঞার্নার্জন ও বিদ্যা শিক্ষার জন্য। এমনকি ইউরোপ এবং পাশ্চাত্যের নানা দেশ থেকেও। তখনও ইউরোপ অথবা আমেরিকায় অক্সফোর্ড কিংবা ক্যামব্রিজ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই তো বলি নালন্দা এত অতি একটি প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়, যার খ্যাতি এ উপমহাদেশ তো বটেই এমনকি ইউরোপ ও পাশ্চাত্যের নানা দেশেও এর প্রভাব পড়েছিল।
বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার ফলে প্রথমে পূর্ববঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট হিসেবে। ১৯১২ সালের ২৭ মে বেঙ্গল গভর্নমেন্ট কর্তৃক গঠিত রবার্ট নাথান কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পটভূমি তৈরি হয়। এর প্রস্তাবক ছিলেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ও শেরেবাংলা একে ফজলুল হক। প্রথমে কলা, বিজ্ঞান ও আইন এই তিনটি অনুষদ নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। প্রথম ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নেন স্যার পি জে হার্টগ। প্রথমে কলা অনুষদে ছিল সংস্কৃত, বাংলা, উর্দু, ফার্সি, আরবি, ইসলামিক স্টাডিজ, ইতিহাস, ইংরেজি, দর্শন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও শিক্ষা বিভাগ। পালি পড়ানো হতো সংস্কৃতের সঙ্গে। বিজ্ঞান অনুষদে ছিল গণিত, পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন। আইন অনুষদে ছিল শুধু আইন বিভাগ। সর্বমোট বিভাগ ছিল ১২টি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পাঠদান করতেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিত মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, সত্যেন বসু, হরিদাস ভট্টাচার্য, জি এইচ ল্যাংলী, রাধা গোবিন্দ বসাক, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, বিএম সেনগুপ্ত, গণেশচরণ বসু, রাজেন্দ্র চন্দ্র হাজরা, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ খ্যাতিমান পণ্ডিত।
শুরু থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি এদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নানা আন্দোলনে বেশ অবদান রেখেছে। যেমন- বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা, স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল অসামান্য। খেলাধুলা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা ছিল গৌরবের। এখনও তা অব্যাহত আছে।
ঢাকার রমনা সিভিল স্টেশন এলাকার প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর প্রথম এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান এর মোট জমির পরিমাণ ৩২০.৮২ একর। প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য হলেন স্যার পি জে হার্টগ (১৯২০-১৯২৫)।
দ্বিতীয় উপাচার্য ছিলেন জিএইচ ল্যাংলী (১৯২৬-১৯৩৪)। তৃতীয় উপাচার্য ছিলেন এদেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ স্যার এএফ রহমান (১৯৩৪-১৯৩৬)। প্রথম চ্যান্সেলর ছিলেন লওরেন্স জন লামলে ডানডাস (১৯২১-১৯২২)। এরপর ছিলেন জর্জ আর. বুলওয়ার লিটন (১৯২৩-২৬)। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনের বক্তাও ছিলেন। প্রথম রেজিস্ট্রার ছিলেন খান বাহাদুর নাজির উদ্দিন আহমদ (১০.০৪.২১-৩০.০৬.৪৪)। খ্যাতিমান এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ডক্টর অব লজ উপাধি পান দি রাইট অনারেবল দি আর্ল অব রোনাল্ডসে জি সি আই (১৯২২ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি)। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম পরিবর্তন হয় চারবার। প্রথম ১৯২১-১৯৫২, দ্বিতীয় ১৯৫২-৭২, তৃতীয় ১৯৭২-১৯৭৩ এবং চতুর্থ ১৯৭৩ থেকে বর্তমান এটি চলমান। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এর বর্তমান চ্যান্সেলর, ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি পূর্ব মেয়াদেও ছিলেন।
সুদীর্ঘ ৯৪ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ দেশকে অনেক কিছু দিয়েছে। দিয়েছে দেশ-বিদেশে অনেক খ্যাতি ও গৌরব। অর্জন করেছে অনেক দুর্লভ সম্মানও। প্রতিষ্ঠিত করেছে দেশ-বিদেশে আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান প-িত ও গবেষক। আজ দেশের নানা প্রশাসনে, হাইকোর্ট ও সুপ্রিমকোর্টে এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও অতীতের ছাত্র-শিক্ষকরা। এছাড়া আন্তর্জাতিকভাবেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র-শিক্ষকরা। বোসের থিউরি আজ বিশ্ব অভিনন্দিত। তিনি ফিজিক্সের শিক্ষক ছিলেন। বিশ্বের সেরা সম্মান নোবেল বিজয়ও এনেছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র প্রফেসর ড. ইউনূস। এছাড়া রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা জায়গায় বেশ কৃতী ও কীর্তিমান হয়ে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও আগেকার তুখোড় ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা। এটি আজ আমাদের জন্য বেশ আনন্দের ও শ্লাঘার বিষয়।
দুঃখজনক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের সেই গৌরব এখন আর নেই। মানের দিক থেকে এমনকি এশিয়ার তালিকায়ও অনেক নিচে। এর কারণ বিদ্যা, জ্ঞান, গবেষণা ও পঠন-পাঠনের গতিধারা অনেক কমে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞান ও বিদ্যাচর্চা এবং জ্ঞান-বিদ্যা বিতরণের সর্বোচ্চ স্থান। কিন্তু এর ব্যতিক্রম এটি কখনও শুভ লক্ষণ নয়। বুঝতে হবে এটি দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ, যেখানে সৃষ্টি হবে সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম মেধা, বোধ, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা এবং জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, আর মূল্যবোধের আলো। এর সঙ্গে থাকবে সদাচরণ ও নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা ও আদর্শ। কিন্তু আজ এগুলো প্রশ্নবিদ্ধ। এ অবক্ষয় কেন ভাবতে বেশ কষ্ট হয়। আমরা এও জানি উচ্চশিক্ষায় চিত্ত প্রসারিত হয়, জ্ঞানের দুয়ার খুলে যায়; বিবেকবোধ জাগ্রত হয়, আর ভেতরে জ্ঞানের আলো জ্বলে ওঠে। একথা আজ কারও অজানা নয়। এমনকি শিক্ষিতজনদের সব কাজে আগে-পরে ভাবতে হয়, করণীয়-অকরণীয় বুঝতে হয়। এখানকার ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী হবে দেশের উচ্চতম আদর্শের প্রতীক, আর তা হবে সবার জন্য অনুকরণীয়। বর্তমান আমরা আদর্শিক সে জায়গা থেকে অনেক দূর সরে গেছি। জাতির বিবেক হিসেবে আমাদের এসব বিষয়ে ভাবা উচিত। তাহলে অচিরেই আমাদের এ দুর্নাম ঘুচে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় আবার ওই গৌরব ও খ্যাতিতে ফিরে আসবে। তবে বর্তমান কর্তৃপক্ষ অনেক ভালো কাজে হাত দিয়েছেন যা প্রশংসার দাবি রাখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাব ও আঙ্গিনার বহু নতুনত্ব আনা হয়েছে। এজন্য কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের জানাই ধন্যবাদ।
প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর এই দিনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব ছাত্র-শিক্ষকরা অবদান রেখেছেন, যারা প্রয়াত ও শহীদ হয়েছেন তাদের আমি আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। তাদের পারলৌকিক শান্তি কামনা করি। কামনা করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবার সেই আগের গৌরবে ফিরে আসুক, জ্ঞান ও বিদ্যাচর্চার ক্ষেত্র প্রসারিত হোক এবং মেধা, যোগ্যতা ও গবেষণার মান ও মূল্য বৃদ্ধি পাক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অমর হোক।

Leave a Reply

%d bloggers like this: