আগামী ছয় মাসেও জ্বালানী তেলের দাম কমার সম্ভাবনা নেই

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৭ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার: জ্বালানি তেলের দাম কমবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন সরকারের দুই মন্ত্রী। কিন্তু ভেতরের খবর হলো, আগামী ছয় মাসেও তেলের দাম কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এর প্রভাব পড়েছে সারা বিশ্বে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। তাই চাইলেও সরকার এখনই জ্বালানি তেলের দাম কমাতে পারছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার জানান, ‘শীতকালে সাধারণত তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। এ বছর মধ্যপ্রাচ্যে তেলের দাম বেড়েছে। এসব বিবেচনায় এখনই তেলের দাম কমানো সম্ভব নয়।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কবে নাগাদ কমবে সে বিষয়েও বলা যাচ্ছে না। কারণ এটি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়।’
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে এ খাতে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় যেমন বেড়ে যাবে, তেমনি অন্য পণ্যের দামেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হারও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা। তারা মনে করেন, এতে তেল আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। ফলে রিজার্ভের ওপরও চাপ বাড়বে।
গত ১৭ নভেম্বর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ঘোষণা দিয়েছিলেন, খুব শিগগির জ্বালানি তেলের দাম কমবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, “আগের বারের চেয়ে এবার অধিক হারে জ্বালানি তেলের দাম কমানো হবে। ফার্নেস ওয়েলের দাম কমিয়ে দিয়েছে সরকার। অন্যগুলোর দাম একটুখানি কমানো হয়েছিল। অতি সামান্য। আমরা বলেছি আরেকটু বেশি কমালে ইট ইজ গুড ফর ইকোনমি। এখন আমরা কাগজপত্র প্রস্তুত করছি। করে এটা এনার্জি মন্ত্রণালয়ে দেব। এটা নিয়ে আলোচনা করব। ডিসেম্বরের ২ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব”।
২৯ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু মেঘনা পেট্রলপাম্পে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা উপলক্ষে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, অক্টোবরের মধ্যেই আরেক দফা জ্বালানি তেলের দাম কমানো হবে।
চলতি বছর ২৫ এপ্রিল সর্বশেষ সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম কমায় সরকার। এর মধ্যে অকটেন ও পেট্রল প্রতি লিটারে ১০ টাকা এবং ডিজেল ও কেরোসিন প্রতি লিটারে তিন টাকা করে কমায়। এর ফলে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ৬৫ টাকা, কেরোসিনের দাম ৬৫ টাকা, অকটেনের দাম ৮৯ টাকা ও পেট্রলের দাম ৮৬ টাকা করে বিক্রি হয়। এরও আগে গত ৩১ মার্চ ফার্নেস তেলের দাম প্রতি লিটার ৬০ টাকা থেকে ৪২ টাকায় নামিয়ে আনা হয়।
এদিকে গত ৩০ নভেম্বর জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সংগঠন ওপেক ভিয়েনায় এক বৈঠকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। ওই সিদ্ধান্ত নেয়ার পরদিনই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১০ শতাংশ বেড়ে যায়।জানুয়ারিতে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, নতুন বছর থেকেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকবে। ফলে নতুন বছরে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে তারা।
ওপেকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারি থেকেই তারা প্রতিদিন ১২ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওপেক মনে করে, ২০১৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বেড়ে গেছে। ফলে দাম পড়ে গেছে। এ কারণে তারা তেলের সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে গত বছরের শেষ দিকে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম কমে সর্বনিম্ন ২৬ ডলারে কিছু দিন অবস্থান করে। এর পর থেকে দাম বাড়তে থাকে। গত মাসে এর দাম বেড়ে ৪৫ ডলারে দাঁড়ায়।
গত আট বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো তারা জ্বালানি তেলের উত্তোলন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংগঠনটি প্রতিবছর তেলের উত্তোলন ১০-১২ শতাংশ হারে বাড়িয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানিও ব্যবহার হচ্ছে। ফলে তেলের ব্যবহার কমছে। এ কারণে তেলের চাহিদা কমায় এর দাম পড়ে গেছে। এতে তেল রপ্তানিকারক দেশ ও উত্তোলনকারী কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, জ্বালানি তেলকে বলা হয় নির্দেশক পণ্য। এর দাম ওঠানামা করলে অর্থনীতির অনেক সূচক ওঠানামা করে। ফলে তেলের দাম বাড়লে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়বে। ফলে মূল্যস্ফীতির হার বাড়বে। আর কমলে সেটির প্রভাবও পড়ে। এটিই স্বাভাবিক।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেহেতু আগে থেকেই পূর্বাভাস পাওয়া গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে, সে কারণে আগে থেকেই অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির আঘাত কম আসবে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: