আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব ও একুশে ফেব্র“য়ারি

আবছার উদ্দিন অলি, ১১ ফেব্রুয়ারী ২০১৯ ইংরেজী, সোমবার: ভাষার জন্য আন্দোলনের অর্ধ শতাব্দীকাল পরেও বাংলা ভাষার শহীদরা সেদিন যে স্বপ্ন দেখে নিঃশেষে প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন তার কতটা পূরণ হয়েছে, সেই প্রশ্ন উচ্চারিত হয়ে আসছে জনে জনে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা সংবিধান অনুযায়ী বাংলা ভাষা হলেও তার কতটুকু জাতীয় জীবনে প্রবর্তিত হয়েছে বা তার প্রাপ্য মর্যাদা অর্জন করেছে এ প্রশ্ন এখনো অমিমাংসিত। বাংলা ভাষাকে তৎকালীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণার দাবিতে সেদিন পূর্ববঙ্গের সরকার প্রধান সমীপে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে শত শত নাগরিকের স্বাক্ষর সম্বলিত যে স্মারকপত্র পেশ করা হয়েছিল বাংলা ভাষা ভারতবর্ষের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সম্পদশালী ভাষা এবং বিশ্বে প্রধান প্রধান ভাষাগুলোর মধ্যে একটি বিশিষ্ট স্থানের অধিকার। এ ভাষা প্রাণের ভাষা। সমগ্র বাংলাদেশের প্রায় ২০ কোটি লোক বাংলা ভাষা ব্যবহার করে এবং হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকলেই এর বিকাশ ও সমৃদ্ধিতে সাহায্য করে এটিকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে উন্নীত করেছে।
যুগের হাওয়া বাংলা ভাষার উপরে আকাশ সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে। এর মূল কারণ জাতিগতভাবে আমাদের মানসিকতা এখনও পরিবর্তন ঘটেনি। আমরা সবকিছুতে নিজেদের কু-রুচিপূর্ণ মনোভাবকে জাগিয়ে তুলছি। শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-বিনোদন কিংবা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় এমনকি ব্যক্তি জীবনেও ভাষার ব্যবহারকে যেনতেন ভাবে উপস্থাপন করে চলেছি। এক্ষেত্রে আকাশ সংস্কৃতির অশুভ প্রতিযোগিতা আমাদেরকে চরম ভাবে আঘাত করছে। অন্য ভাষার প্রতি আসক্তি বাড়িয়ে তুলেছে আকাশ সংস্কৃতির বিশ্বব্যাপী অসুস্থ প্রতিযোগিতা। চাকচিক্য ও বাহারি রূপ, রং ও অন্য ভাষার প্রতি বেশি কর্তৃত্ব দেখাতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলছি নিজের অজান্তে। এই আগ্রাসন শুরু অনেক বছর থেকে। একে রোধ করার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আকাশ সংস্কৃতির উপর গুরুত্ববহ নীতিমালা প্রয়োজন। যা করতে হবে রাষ্ট্রীয় ভাবে।
বিশ্বের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজ নিজ মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশের বিষয়টি তাদের রাজনৈতিক অধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আমাদের এই দেশেও সংখ্যার দিক থেকে ছোট ছোট অনেক জনগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন মাতৃভাষা রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির পাশাপাশি সব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির স্বকীয় পরিপুষ্টির সুযোগ অবারিত রাখা অত্যন্ত জরুরি। শুধু আনুষ্ঠানিকতায় মাতৃভাষায় মর্যাদা নেই, সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রচলন ঘটলেই কেবল তার মর্যাদা পায়। শিক্ষাসহ জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমে প্রয়োজন একটি জাতীয় ভাষা পরিকল্পনা। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন কিছু স্থায়ী প্রতিষ্ঠান ও মানুষ, যাঁরা বাংলা ভাষার বিকাশের লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে যাবেন।
শিশুদের শিক্ষাক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমের প্রসার ঘটে চলেছে, সাধারণ বিদ্যালয়গুলোয় বাংলার প্রতি অবহেলা বাড়ছে। শুধু আনুষ্ঠানিকতায় মাতৃভাষার মর্যাদা নেই; সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রচলন ঘটলেই কেবল তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা পায়। শিক্ষাসহ জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন একুশ আমার অস্তিত্ব ফাগুনের কত কথা, একুশ আমার বাঙালীত্বের সোচ্চার বাস্তবতা। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা আমাদেরকে দিতে হবে। সম্মান করতে হবে বাংলা ভাষাকে। কারণ যে ভাষায় ‘মা’ ডাকতে শিখেছি সে ভাষার আদর কদর আমাদের অবশ্যই এগিয়ে নিতে হবে। মহান ভাষা শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। একুশে ফেব্র“য়ারিকে মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার মাধ্যমে পৃথিবীর সকল মাতৃভাষাকে একটি সম্মান জনক স্থান প্রদানের বিষয়টি আন্তর্জাতিক গুরুত্ব লাভ করেছে।
বাংলা ভাষাকে আরো উন্নত করতে বাংলা ভাষার স্বপ্নবিহারী অধ্যাপক আবুল কাসেম ছাত্রদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। ফেব্র“য়ারি মাসে সপ্তাহব্যাপী একটি প্রধান কর্মসূচি থাকতো। কর্মসূচির নাম ছিল বাংলা ভাষা প্রচলন সপ্তাহ। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে এ কর্মসূচি শুরু করতো। কর্মসূচির জন্য মধ্যে দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, দপ্তর, সংগঠনের সাইনবোর্ড বাংলা লেখার জন্য প্রণোদনা ও প্রতিরোধ অভিযান। ঢাকা শহরে আগে থেকেই কিছু বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে বাংলা লেখা ছিল। এসব দৃষ্টান্ত দিয়ে ছাত্ররা প্রণোদনা ও প্রতিরোধ অভিযান শুরু করেছিলেন। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে তারা পথসভা করতেন। দোকানে দোকানে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে মানুষকে বোঝাতেন। মাঝে মধ্যে এ নিয়ে চলতো নানা তর্ক-বিতর্ক। তারপরও তারা থেমে থাকেননি। মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহার, চর্চা ও সমৃদ্ধির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল তাদের নিত্যসঙ্গী। আমাদের পূর্বসূরীরা জানতেন ভাষা কেবল রাষ্ট্রভাষা হলেই সব শেষ হয় না। এ ভাষা তো আর পৃথিবীর অন্য ভাষাগুলোর মতো নয়। মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারার অধিকারের জন্য কেউ আন্দোলন করেছে এমন ইতিহাস পৃথিবীতে নেই।
‘ম’ দিয়ে মা, ‘ম’ দিয়ে মাতৃভাষা, ‘ম’ দিয়ে মাতৃভূমি। মা, মাতৃভাষা, মাতৃভূমি এই তিন ‘ম’ এর শক্তি অনেক বড়। এই তিন ‘ম’-এ রয়েছে সাহস, শক্তি, অনুপ্রেরণা আর উৎসাহ। বাংলা মায়ের ভাষা, প্রাণের ভাষা। এর প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা আমাদের অহংকার, আমাদের গৌরব, আমাদের গর্ব। মহান একুশে ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ভাষা শহীদদের প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষ এগিয়ে যাবে তা দোষের কিছু নয়। তবে নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে নয়। আকাশ সংস্কৃতির ভালো দিকটা গ্রহন করবো, মন্দ দিকটা বর্জন করবো। এই মানসিকতা জন্ম নিলে তখনই মঙ্গল বয়ে আনবে। নয়তো ভাষার প্রতি চরম অবহেলা ও অপমান হবে। অবহেলিত হবে বাংলা ভাষা। ভাল কিছু জানা থেকে, শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে তরুন প্রজন্ম। তথ্য প্রযুক্তির যুগে পৃথিবীকে জানা কঠিন বিষয় নয়, তবে সে জানার মধ্যে শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং দেশীয় মূল্যবোধ থাকতে হবে। মাতৃভাষাকে সম্মান জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ মায়ের ভাষার প্রতি আমাদের আদর-কদর সবার আগে থাকতে হবে। কে কি করলো, কে কিভাবে চললো, সেটি আমাদের বিষয় নয়। ভাষাকে বিকৃত না করায় আমাদের আদর্শ হওয়া উচিত। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব থাকবে, তাই বলে মন্দ নিয়ে লাফালাফি কেন করবো। আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসে এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব। কেননা, ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৭১’র মুক্তিযুদ্ধে শহীদের তাজা রক্ত আর আত্মত্যাগ আমাদেরকে সব অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার অনুপ্রেরণা যোগায়। লেখক: সাংবাদিক ও গীতিকার

Leave a Reply

%d bloggers like this: