আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে হার্ডলাইনে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ০২ ডিসেম্বর ২০১৮ ইংরেজী, রবিবার: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হ্যাটট্রিক জয়ের মিশনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের দমন করতে হার্ডলাইনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। রোববার (২ ডিসেম্বর) থেকে একই আসনে দুই জনকে মনোনয়নের চিঠি দেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে একজনকে রেখে আরেকজনের কাছে যাবে হাইকমন্ডের পক্ষ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্দেশনা।
এরপর বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দলীয় নির্দেশনার কথা জানিয়ে দেবে দলটি। এবার বিদ্রোহী প্রার্থী দমাতে কোন আশ্বাস নয় বরং আজীবন বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের অটলে আছে টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতাসীন দলটি।
শনিবার (১ ডিসেম্বর) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক বৈঠক হয়। বৈঠকে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় এবং দলীয় নেতাদের কার কি করণীয় বুঝিয়ে দেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র এতথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সূত্রটি জানায়, ইতোমধ্যে দেশের ৮টি বিভাগে ৯০ জনের বেশি প্রার্থী দলের মনোনয়ন না পেয়ে জানিয়েছেন যে তারা স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। তারা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ কেউ স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সারাদেশে ৭৩জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে চিহ্নিত করেছে আওয়ামী লীগ। রোববার থেকে দলের পক্ষে একই আসনে দুইজনকে চিঠি দেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে একজন বাদে বাকিজনকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করার নির্দেশ যাবে হাইকমান্ডের। এসব প্রার্থীদের প্রার্থীতা প্রত্যাহারের জন্য কোন দলের পক্ষে পরবর্তীতে কোন প্রতিশ্রুতি বা আশ্বাস দেওয়া হবে না। কেবলমাত্র দলীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে প্রত্যাহার করার জন্য আহ্বান জানানো হবে।
এরপর মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। আর কেউ দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তাকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘আমরা শিগগিরই কাজ শুরু করবো।’

তবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ৮ নভেম্বর। তার মধ্যেই কাজগুলো সম্পন্ন করা হবে।’
এখন পর্যন্ত কতটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী চিহ্নিত করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘৭৩টি আসনের মতো চিহ্নিত করেছি। আগামীকাল অনেকগুলো বাতিল হয়ে যাবে। যেগুলো ডাবল জমা দিয়েছে সেগুলো বাতিল হয়ে যাবে। আর যারা বঞ্চিত হয়ে বিদ্রোহী হয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন তাদের ব্যাপারে ৮ তারিখের মধ্যেই প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেবো।’
এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ থেকে ২৪৭টি আসনে একক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এবিষয়ে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারাদেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৬৪টি আসনে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন জমা দিয়েছে। বাকি ৩৬টি আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে কেউ মনোনয়নপত্র জমা দেয়নি। এই ২৬৪টি আসনের মধ্যে ২৪৭টিতে আওয়ামী লীগ একক প্রার্থী দিয়েছে এবং বাকি ১৭টি আসনে দুইজন করে প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। আর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মোট ২৮১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন । মনোনয়নপত্র জমা না দেওয়া বাকি ৩৬টি আসনে জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হবে। এদিকে ইসি সূত্র জানায়, সারাদেশে ৩০০ আসনে ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছ থেকে মোট ৩ হাজার ৬৫টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী আছে ১৭টি আসনে। আসনগুলো হলো এগুলো রংপুর-৬; নওগাঁ-৫; নাটোর-১; নড়াইল-১; বরগুনা-১; পটুয়াখালী-২; টাঙ্গাইল-২; জামালপুর-১ ও ৫; কিশোরগঞ্জ-১; ঢাকা-৫, ৭ ও ১৭; চাঁদপুর-১, ২ ও ৪ ও লক্ষ্মীপুর-২।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হলেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা আগেই ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলের নির্দেশ অমান্য করলে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করার পাশাপাশি সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও দলীয় অবস্থান থেকে বঞ্চিত করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এমনকি কারও কারও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এবিষয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বিভিন্ন সভায় বলেছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিদ্রাহী প্রার্থী হলেই স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে। তিনি যত বড় প্রভাবশালী হোন না কেন, কোনো ধরনের দয়া দেখানোর সুযোগ নেই। দল করতে হলে সিদ্ধান্ত মানতে হবে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে নৌকার পক্ষে কাজ করতে হবে।
এছাড়াও গত ১৪ নভেম্বর গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী চার হাজার ২৩ জন নেতা। সে সময় দীর্ঘ সোয়া ঘণ্টার আবেগঘন বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন না করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি কঠোর বার্তা দেন তিনি।
তবে এবারও দলের বার্তা উপক্ষো করে প্রার্থী হয়েছেন অনেকে। ইতোমধ্যে একাধিক আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন। এতে কোন সংসদীয় এলাকায় প্রকাশ্য বিরোধ প্রকট হয়ে উঠছে। রোববার থেকে দলের পক্ষ থেকে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংকট নিরসনে কাজ শুরু করবে আওয়ামী লীগ।
এজন্য গত বৃহস্পতিবার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বিএম মোজাম্মেল হক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, এস এম কামাল হোসেন গণভবনে গিয়ে দলীয় সভাপতির সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং নির্দেশনা নিয়ে আসেন। সে ধারাবাহিকতার শনিবার ধানমন্ডিতে দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠক করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। বৈঠকে কেন্দ্রীয় নেতারা ছাড়াও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সভাপতি আবুল হাসনাত, অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আসলামুল হক উপস্থিত ছিলেন।
ইসির ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ২রা ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর ৯ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: