অ্যাডভেঞ্চার গ্রাম বাংলার

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ৩০ জুলাই ২০১৭, রবিবার: ইচ্ছা করেই ঝুঁকিটা নিলাম। অ্যাডভেঞ্চার বলে কথা! ক্লাস সিক্স থেকেই মাসুদ রানা সিরিজের বই পড়ার অভ্যাস ছিল। সে সময় থেকেই প্রতিটা ভ্রমণেই অ্যাডভেঞ্চারের ফ্লেভার নেয়ার চেষ্টা করতাম, এখনও করি। মাসুদ রানাতে এতটাই ডুবে থাকতাম যে, রাতে স্বপ্নেও দেখা দিতেন এই ব্যক্তি।
অলিয়ার স্যার। হ্যাঁ, আমাদের কামারগ্রাম কাঞ্চন একাডেমী স্কুলের বাংলার শিক্ষক প্রয়াত অলিয়ার মাস্টারের কথাই বলছি। বই পড়ার প্রচন্ড নেশা ছিল স্যারেরও। মাঝে মাঝে আমার সংগৃহীত বই থেকেও স্যার ধার নিয়ে পড়তেন। তবে তাঁর বই পড়া এবং আমার বই পড়ার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য ছিল। যেমন স্যারের যে বইটা পড়তে একদিন লাগতো সেখানে খুব ভাল করে বুঝে শুনে বইটি পড়তে আমার লাগতো তিনদিন।
মাধ্যমিক পরীক্ষার আগের রাতেও মাসুদ রানা সিরিজের বই পড়েছি। এই সিরিজের বইয়ের প্রতি এতটাই নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলাম যে, একদিন রমজান মাসে ইফতারের সময় হাত উঁচু করে প্রার্থনা করলাম- ‘হে আল্লাহ, মাসুদ রানা থেকে আমার মন উঠিয়ে নাও।’ শুনেছি ইফতারের সময় আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলে তা নিঃসন্দেহে কবুল হয়।
ঘড়িতে ঘণ্টার কাটা বলছে বিকাল পাঁচটা বাজে। কিছুক্ষণ পরেই নেমে আসবে সন্ধ্যা। যেতে হবে অভয়নগর থেকে নিজ এলাকা আলফাডাঙ্গায়। হিসাব কষে নিলাম পাঁচ ঘণ্টা লাগবে। ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। কোনো কিছুতেই হার না মানার বয়স। বাদামী রঙের মোবাইল প্যান্ট, গায়ে কালো টি শার্ট এবং কাঁধে আর্মি কালারের ব্যাগ। ছোট আপার সাবধানী উপদেশ ‘এমন অবেলায় যাওয়া ঠিক হবে না, রাস্তায় বিপদ হতে পারে।’ কিন্তু তাতে আমাকে টলানো গেল না। প্রতিকুল পরিস্থিতিতে নিজেকে উদ্ধার করা বা মানিয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম।
গোবরার ভিতর দিয়ে যখন নড়াইল এসে পৌঁছলাম তখন সবে সন্ধ্যা নেমেছে। বাস পাল্টিয়ে লোহাগড়ার বাসে চেপে বসলাম। দানবের মত দেখতে লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা বাস যেন চলতেই পারে না। বুঝতে পারলাম কপালে শনি আছে। কিন্তু এখন আর পেছনে ফেরার উপায় নেই, যেতে আমাকে হবেই। পেটের ভেতরে সিগন্যাল দিচ্ছে, হালকা কিছু খাওয়া দরকার। নড়াইল ফেরীঘাটে এসে সুযোগমত চা আর কেক খেয়ে নিলাম। সিগারেটে টান দিতে পারলে একটা ভাব আসতো কিন্তু তামাকে ঠাসা জিনিসটা কেন জানি কখনোই আমাকে টানে না। তারপরেও কেন যে মানুষ সিগারেট খায়? সবচেয়ে মজা লাগে যখন একজন স্মোকার অন্য একজনকে সিগারেট না খাওয়ার পরামর্শ দেন। গুনিজনদের বলতে শুনেছি, ‘তুমি ‘যা পারো না তা অন্যকে উপদেশ দিও না।’
লোহাগড়া যখন পৌঁছলাম তখন ঘড়িতে রাত প্রায় সাড়ে আটটা। আগে যতবার লোহাগড়া হয়ে গিয়েছি ততবারই দই-চিড়া খেয়েছি, সাথে রসগোল্লা। কিন্তু এবার মিস করলাম। কয়েকটি দোকানে কুঁড়ি বা পঁচিশ পাওয়ারের বৈদ্যতিক বাতি জ্বলজ্বল করছে। দোকানগুলোর পাশ দিয়ে টেম্পো স্ট্যান্ডে যেতে মিনিট পাঁচেক লাগলো। সৌভাগ্যবশত শিয়ারবর যাওয়ার একটা টেম্পো পেয়ে গেলাম। ‘লাস্ট টিব, লাস্ট টিব’ বলে চেচাচ্ছিল ড্রাইভার। ফাঁকা রাস্তা। বাড়ি ঘরের সংখ্যা খুবই কম। তারপর আবার চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অমাবশ্যা কিনা জানি না তবে টেম্পোর হেড লাইটের আলোর পাশ দিয়ে অন্ধকারটা একটু বেশীই কালো মনে হচ্ছিল। শুনেছি এই রাস্তায় নাকি প্রায় ডাকাতি হয়। লোকজনদের মেরে আহত করে সব কিছু কেড়ে নিয়ে যায়। কখনও কখনও মেরে ফেলতেও দ্বিধাবোধ করে না।
পটপট-পটপট টাইপ বিশ্রি ও বিকট শব্দে এগিয়ে চলছে টেম্পোটা। ভেজাল তেলের কারণে চোখ দুটো জ্বালা করছে। আচ্ছা, এখন যদি আমরা ডাকাতের কবলে পড়ি? এমনও তো হতে পারে যাত্রী বেশে কোন ডাকাত সদস্য আমাদের সাথেই যাচ্ছে? কর্কশ কণ্ঠে হঠাৎ কেউ একজন চিৎকার দিল ‘এই গাড়ি থামা।’ ভাবনার ভেতরেই কষে ব্রেক করলো চালক। মুহূর্তের মধ্যেই হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে গেল। বুকের ভেতরের ধকধক ধকধক শব্দটা যেন বাইরে বেরিয়ে আসছিল। কিছু বুঝে উঠার আগেই লাফ মেরে টেম্পো থেকে বেরিয়ে গেল পঞ্চাশোর্ধ এক লোক। সত্যি মনে হয় এবার ধরা পড়ে গেছি। জীবনে যত পাপ করেছি এবার তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে হয়তো। পকেটে দুই হাজার টাকা আর হাত ঘড়িটা ছাড়া কিছুই নেই কাছে। সব কিছু নিয়ে যাও শুধু জানটা থাকলেই হবে গুরু। কিন্তু কই, কেউ তো আসছে না! তাহলে? আবিষ্কার করলাম অন্যকিছু। রাস্তার পাশ থেকে বিশ্রি এবং পরিচিত একটা শব্দ কানে এলো। পঞ্চাশোর্ধ লোকটির আসলে বাথরুম চেপেছে, তাই রাস্তার পাশেই…।
রাত দশটা। মধুমতি নদীর শিয়ারবর ঘাটে এসে পড়লাম বিপাকে। যেমনটি ভেবেছিলাম আসলে তেমনটি নয়। ঘাট পার হওয়ার জন্য নৌকা বা ট্রলার কিছুই নেই। আশা করেছিলাম একটি ট্রলার অন্তত পাওয়া যাবে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। এখানে কোন আবাসিক হোটেল কল্পনাও করা যায় না। মনে মনে আল্লাহর নাম জপতে থাকলাম। যতটুকু ধারণা আছে এলাকাটা খুবই খারাপ। রাতের বেলা সর্বহারাদের আনাগোনা হয় এখানে। রাত দশটার পরে এখানে থাকাটা মোটেও নিরাপদ না। পাশেই ছোট্ট একটি মুদি দোকানে টিমটিম করে হারিকেন জ্বলছে। দুই তিন জন স্থানীয় লোক বসে বসে বিড়ি টানছেন। কেউ একজন উচ্চস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন- কই যাইবেন? বললাম-কামারগ্রাম। কামারগ্রামের নাম শুনে উপস্থিত লোকগুলো উৎসুক হয়ে আমাকে তাঁদের কাছে ডাকলেন। উৎসুক হওয়ারই কথা। অত্র এলাকার মধ্যে কামারগ্রামের মত এত শিক্ষিত, ভদ্র ও ধনী মানুষ আর কোন গ্রামে আছে? স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, অনেক বড় খেলার মাঠ- কি নেই এই গ্রামে? বড় বড় সরকারী কর্মকর্তাদের বাড়ি এই গ্রামে। একজন বয়োজোষ্ঠ্য আমার পরিচয় জানতে পেরে আমাকে কাঞ্চন মুন্সি সাহেবের কিছু অবদানের কথা শোনালেন। নিজেকে গর্বিত মনে হল যে আমি কাঞ্চন মুন্সি সাহেবের গ্রামেরই সন্তান।
এদিকে ঘড়ির কাটা যতদূর গেছে গ্রাম অঞ্চলে এটাই অনেক রাত। এতরাতে বাড়ি যেতে পারবো না ভেবেই দোকানদার তার বাড়িতে রাত্রিযাপনের অনুরোধ করলেন। উপায় নেই ভেবে আর কথা বাড়ালাম না। লজ্জায় খেতে না চাইলেও তাঁদের অনুরোধে রাতের খাবার খেতেও বাধ্য হলাম। নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছিল। একে তো থাকতে দিচ্ছে তার পর আবার খাবার!
ক্লান্ত শরীর। নতুন জায়গায় ঘুমের কোনো সমস্যা হয় না আমার। ভেবেছিলাম খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে চলে যাব। কিন্তু অভ্যাস তো দেরি করে ওঠার। অভ্যাস বললে ভুল হবে, বদ অভ্যাস। সারাটা জীবন আমার আব্বাকে দেখেছি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে। তিনি প্রায়ই বলতেন- ‘দিনে ঘুমায় রাতে জাগে, তাহার মৃত্যু সবার আগে।’
ঘুম থেকে উঠে দেখি ঘড়িতে সাতটা বাজে। তড়িঘড়ি করে রেডি হলাম। কিন্তু দোকানদার এবং তার বউ আমাকে কিছুতেই না খেয়ে আসতে দিলেন না। আমিতো তাঁদের কোনো আত্মীয় হইনা, কোনদিন দেখিনিও, তাহলে? দোকানদারি করে তাঁদের সংসার চালাতে হয় তাইতো আমার খুব বেশি খারাপ লাগছে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে এক এক করে আমার জন্য খাবার নিয়ে এলো। গরম ভাত, আলুভর্তা, বেগুনভর্তা, পটলভাঁজি, ডিম ভাঁজি এবং সম্ভাবত খুব ভোরে জবাই করা দেশি মুরগীর মাংস। মুরগীটা যে আমার সৌজন্যই জবাই করা হয়েছে বুঝতে বাকি রইলো না।
আমি অভিভূত, বাকরুদ্ধ। সত্যিই গ্রামের মানুষ বড়ই অতিথীপরায়ন। একেবারেই অচেনা একজন মানুষের জন্য আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই তাঁদের আচরণে। গতকালের দিন ও রাতের সমস্ত ক্লান্তি মুহূর্তের মধ্যে বিলিন হয়ে গেল গ্রাম বাংলার এই নিরেট মানুষগুলোর পরিবারে ক্ষণিকের অতিথি হয়ে। গ্রাম বাংলার এই দরিদ্র মানুষগুলোর কাছে রাস্তায় ঘটে যাওয়া অ্যাডভেঞ্চার সত্যিই ম্লান হয়ে গেল। অথচ গ্রামের এই সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলোকে শহরের ইট, বালু আর সিমেন্টের তৈরি বাড়িতে থাকা উঁচুতলার মানুষগুলো কতই না অবজ্ঞা করে!

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*