অশনিসঙ্কেত ব্যাংকিং খাতে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৮ মে ২০১৭, রবিবার: ব্যবসাবাণিজ্যে স্থবিরতায় নেতিবাচক হয়ে পড়েছে চলতি আমানত। কমে গেছে মেয়াদি আমানতও। এতে সামগ্রিক আমানত কমে গেছে। অর্থনীতির সর্বশেষ সূচক দিয়ে তৈরী বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) ব্যাংকের সামগ্রিক আমানতের হার কমে ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশে নেমেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ১২ শতাংশ।
সামগ্রিক আমানত কমে যাওয়ায় ব্যাংকিং খাতের জন্য অশনিসঙ্কেত হিসেবে দেখছেন ব্যাংকাররা। কারণ, বর্তমানে বিনিয়োগ চাহিদা নেই। এর কোনো প্রভাব আপাতত পড়ছে না; কিন্তু বিনিয়োগ চাহিদা বেড়ে গেলে তখন বিনিয়োগ করার মতো অর্থ তাদের হাতে থাকবে না। একই সাথে বিনিয়োগ করতে না পারায় বিনিয়োগ থেকে আয় কমে গেছে। কিন্তু ব্যয় বাড়ছে না, বরং মূল্যস্ফীতির সাথে পাল্লা দিয়ে ব্যাংকের সামগ্রিক ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। সব মিলে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে গেলে ব্যাংকিং খাতের জন্য খারাপ ফল বয়ে আনবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, ব্যবসাবাণিজ্যে যখন স্থবিরতা নেমে আসে তখন চলতি আমানত নেতিবাচক হয়ে পড়ে। কারণ, এ সময়ে ব্যবসায়ীরা আগের মতো লেনদেন করতে পারেন না। তাদের হাতে টাকা থাকে না। সব সময় ব্যবসায়ীরা টানাাটানির মধ্যে থাকেন। আর মেয়াদি আমানত কমে যাওয়ার অর্থ হলো সাধারণ মানুষ আর আমানত রাখতে পারছেন না। আয়ের সাথে ব্যয় সঙ্কুলান করতে পারছে না নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নির্ধারিত আয়ের মানুষ। এ কারণে এখন ভবিষ্যতের জন্য জমানো অর্থে হাত দিয়েছেন। মেয়াদপূর্তির আগেই ব্যাংকে জমানো স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ডিপিএস ভেঙে ফেলছে। সঞ্চয় ভেঙে খাওয়ায় কমে যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর আমানত।
এ দিকে, বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদহার দীর্ঘ দিন ধরে কমানো হচ্ছে। একসময় ১০০ টাকার আমানতের জন্য ১৪ টাকা ব্যয় করত ব্যাংকগুলো। এখন আমানতের গড় সুদ হার ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। আমানতের সুদ হার কমে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি গিলে খাচ্ছে তাদের আয়। বর্তমানে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতির হার রয়েছে ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ; কিন্তু আমানতের গড় সুদ হার রয়েছে ৫ শতাংশ। ফলে মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় ব্যাংকের আমানতকারীদের নিট আয় ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ এখানে প্রকৃত সুদ শূন্য বা নেগেটিভ হয়ে পড়েছে। এ কারণে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
অর্থনীতির সর্বশেষ সূচক দিয়ে তৈরী বাংলাদেশ ব্যাংকের মাসিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চলতি আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ৪ দশমিক ৫৭ ভাগ। যেখানে আগের বছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ দশমিক ৭০ ভাগ। একই সাথে মেয়াদি আমানতও কমে নেমেছে ৬ দশমিক ৯৪ ভাগে। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ১২ দশমিক ৪৩ ভাগ।
ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, নানা কারণে আমানতের প্রবাহ কমে যাচ্ছে। ব্যবসাবাণিজ্যের স্থবিরতার পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার এখনো ডাবল ডিজিটে রয়েছে। এ কারণে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সঞ্চয়পত্রের ঋণ। চলতি অর্থবছরে সরকারের বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা; কিন্তু দুই মাস বাকি থাকতেই অর্থাৎ ১০ মাসে তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, মেয়াদি আমানতে সরকারি ব্যাংকগুলো এখন সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। বেশির ভাগ ব্যাংকের সুদহার প্রায় একই রকম। সব মিলিয়ে গত মার্চে ব্যাংকগুলোর আমানতের গড় সুদহার নেমে এসেছে ৫ দশমিক শূন্য ১ শতাংশে। অথচ সঞ্চয়পত্রে টাকা খাটিয়ে সুদ পাওয়া যাচ্ছে ১১ দশমিক শূন্য ৪ থেকে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ পর্যন্ত। এর ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি ব্যাপক হারে বেড়ে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি হয়েছে ৪২ হাজার ৯৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, তলবি আমানত সাধারণত কখনো নেতিবাচক হয় না। কারণ, ব্যবসায়ীরা সব সময় ব্যাংকে লেনদেন করেন; কিন্তু তলবি আমানত নেতিবাচক হওয়ার অর্থ হলো ব্যবসাবাণিজ্যের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, এক দিকে শিল্পকারখানায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না সরকার; কিন্তু পাশাপাশি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে। এতে ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে গেছে। ব্যবসা ব্যয় যখন বেড়ে যায় তখন ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। লোকসান হয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে। তখন ব্যবসায়ীদের টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়ে। এ কারণে ব্যাংকে লেনদেন কমে যায়।
অপর দিকে, ব্যাংকিং খাতের চেয়ে ব্যাংকবহির্ভূত খাতে অধিক মুনাফা পেলে তখন ব্যাংকে আর কেউ টাকা রাখে না। অন্যত্র সরিয়ে ফেলে। এ কারণেও তলবি আমানত কমতে পারে বলে তিনি মনে করেন। মেয়াদি আমানত কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে সাবেক এ গভর্নর জানান, মূল্যস্ফীতির কারণে যখন জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায় তখন সাধারণ মানুষ সঞ্চয় করতে পারেন না। উপরন্তু সংসারের ঘাটতি মেটাতে ভবিষ্যতের জন্য জমানো সঞ্চয়ে হাত দেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, ব্যাংক থেকে বেশি মাত্রায় আমানত উত্তোলন হলে ব্যাংকিং খাতে নগদ অর্থের সঙ্কট দেখা দেবে। এটা সমন্বয় করতে না পারলে ভবিষ্যতে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগযোগ্য তহবিলের সঙ্কট দেখা দেবে, যাতে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*